চুনি বলল, আটান্ন? আটান্নই তো হবে। না কি ঊনষাট?
রাঁচি যাওয়াটা নিয়ে তোমার কোনও সন্দেহ নেই?
চুনি এবার রীতিমতো অবাক হয়ে গেল।
তোমার কি যাবার ব্যাপারটা নিয়েই সন্দেহ হচ্ছে?
আমি গিয়েছিলাম? তোমার ঠিক মনে আছে?
চুনি সোফা থেকে উঠেছিল, সেটাতেই আবার বসে পড়ল। তারপর সে বিপিন চৌধুরীর দিকে কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে বলল, বিপিন, তুমি কি নেশাটেশা ধরেছ নাকি আজকাল? এদিকে তো তোমার কোনও বদনাম ছিল না! তুমি কড়া মেজাজের লোক, পুরনো বন্ধুদের প্রতি তোমার সহানুভূতি নেই–এ সবই তো জানতুম! কিন্তু তোমার তো মাথাটা পরিষ্কার ছিল; অন্তত কিছুদিন আগে অবধি ছিল।
বিপিনবাবু কম্পিতস্বরে বললেন, তোমার মনে আছে আমার যাবার কথা?
চুনি এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে একটা পালটা প্রশ্ন করে বসল। সে বলল—
আমার শেষ চাকরি কী ছিল মনে আছে তোমার?
বিলক্ষণ। তুমি হাওড়া স্টেশনে বুকিং ক্লার্ক ছিলে।
তোমার সেটা মনে আছে, আর আমিই যে তোমার রাঁচির বুকিং করে দিলাম সেটা মনে নেই? তোমার যাবার দিন তোমার কামরায় গিয়ে দেখা করলাম, ডাইনিং কারে বলে তোমার খাবারের ব্যবস্থা করে দিলাম, তোমার কামরায় পাখা চলছিল না–সেটা লোক ডেকে চালু করে দিলাম–এসব তুমি ভুলে গেছ? তোমার হয়েছে কী?
বিপিনবাবু একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধপ করে সোফায় বসে পড়লেন।
চুনি বলল, তোমার কি অসুখ করেছে? তোমার চেহারাটা তো ভাল দেখছি না।
বিপিনবাবু বললেন, তাই মনে হচ্ছে। কদিন কাজের চাপটা একটু বেশি পড়েছিল। দেখি একটা স্পেশালিস্ট-টেশালিস্ট…
বিপিনবাবুর অবস্থা দেখেই বোধহয় চুনি আর চাকরির উল্লেখ না করে আস্তে আস্তে বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে গেল।
পরেশ চন্দ্রকে ইয়াং ডাক্তার বলা চলে, চল্লিশের নীচে বয়স, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। বিপিনবাবুর ব্যাপার শুনে তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন। বিপিনবাবু তাঁকে মরিয়া হয়ে বললেন, দেখুন ডক্টর চন্দ্র, আমার এ ব্যারাম আপনাকে সারিয়ে দিতেই হবে। আপিস কামাই করার ফলে যে কী ক্ষতি হচ্ছে আমার ব্যবসার তা আমি বোঝাতে পারব না। আজকাল তো অনেক ওষুধ বেরিয়েছে। আমার এ ব্যারামের জন্য কি কিছুই নেই? আমি যত টাকা লাগে দেব। যদি বিদেশ থেকে আনাবার দরকার হয় তারও ব্যবস্থা করব। কিন্তু এ রোগ আপনাকে সারাতেই হবে।
ডাক্তার একটু ভেবেচিন্তে মাথা নেড়ে বললেন, ব্যাপারটা কী জানেন মিস্টার চৌধুরী? আমার কাছে এ রোগ একেবারে নতুন জিনিস; আমার অভিজ্ঞতার একেবারে বাইরে। তবে একটামাত্র উপায় আমি বলতে পারি। ফল হবে কিনা জানি না, কিন্তু চেষ্টা করে দেখতে পারেন। ক্ষতির কোনও আশঙ্কা নেই।
বিপিনবাবু উদগ্রীব হয়ে কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠে বসলেন। ডাক্তার বললেন, আমার যতদূর মনে হচ্ছে এবং আমার বিশ্বাস আপনারও এখন তাই ধারণা যে, আপনি সত্যিই রাঁচি গিয়েছিলেন, কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক, এই যাবার ব্যাপারটা আপনি বেমালুম ভুলে গেছেন। আমি সাজেস্ট করছি যে আপনি আরেকবার রাঁচি যান। তা হলে হয়তো জায়গাটা দেখে আপনার আগের ট্রিপ-এর কথাটা মনে পড়ে যাবে। এটা অসম্ভব নয়। আজ এই মুহূর্তে তো বেশি কিছু করা সম্ভব নয়। আমি আপনাকে একটি বড়ি লিখে দিচ্ছি–সেটা খেলে হয়তো ঘুমটা হবে। ঘুমটা দরকার, তা না হলে আপনার অশান্তি এবং তার সঙ্গে সঙ্গে আপনার অসুখও বেড়ে যাবে। আপনি একটা কাগজ দিন, আমি ওষুধটা লিখে দিচ্ছি।
বড়ির জন্যই হোক, বা ডাক্তারের পরামর্শের জন্যই হোক, বিপিনবাবু পরদিন সকালে অপেক্ষাকৃত সুস্থ বোধ করলেন।
প্রাতঃকালীন জলযোগ সেরে আপিসে টেলিফোন করে কিছু ইনস্ট্রাকশন দিয়ে সেইদিনই রাত্রের জন্য রাঁচির টিকিট কিনলেন।
পরদিন রাঁচি স্টেশনে নেমেই তিনি বুঝলেন এ জায়গায় তিনি কস্মিনকালেও আসেননি।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটা গাড়ি করে এদিক ওদিক খানিকটা ঘুরে বুঝলেন যে এখানের রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, প্রাকৃতিক দৃশ্য, মোরাবাদি পাহাড়, হোটেল, বাংলো, কোনওটার সঙ্গেই তাঁর বিন্দুমাত্র পরিচয় নেই। হুড্র ফল কি তিনি চিনতে পারবেন? জলপ্রপাতের দৃশ্য দেখলেই কি তাঁর পুরনো কথা সব মনে যাবে?
নিজে সেকথা বিশ্বাস না করলেও, পাছে কলকাতায় ফিরে অনুতাপ হয় তাই একটি গাড়ির ব্যবস্থা করে দুপুরের দিকে হুডুর দিকে রওনা দিলেন।
সেইদিনই বিকেল পাঁচটার সময় হুড্রতে একটি পিকনিকের দলের দুটি গুজরাটি ভদ্রলোক বিপিনবাবুকে অজ্ঞান অবস্থায় একটি পাথরের ঢিপির পাশে আবিষ্কার করল। এই দুই ভদ্রলোকের শুশ্রূষার ফলে জ্ঞান ফিরে পেতেই বিপিনবাবু প্রথম কথা বললেন–আমি রাঁচি আসিনি। আমার সব গেল! আর কোনও আশা নেই…
এদিন সকালে বিপিন চৌধুরী কলকাতায় ফিরে এলেন। তিনি বুঝেছিলেন যে, যদি না তিনি এই রহস্যের উদঘাটন করতে পারেন, তবে তাঁর আর সত্যই কোনও আশা নেই। তাঁর কর্মক্ষমতা, তাঁর আত্মবিশ্বাস, তাঁর উৎসাহ বুদ্ধি বিবেচনা সবই তিনি ক্রমে ক্রমে হারাবেন। শেষে কি তা হলে তাঁকে সেই রাঁচির…?
এর পরে আর বিপিনবাবু ভাবতে পারেন না, ভাবতে চান না।…
বাড়ি ফিরে কোনওরকমে স্নান করে মাথায় বরফের থলি চাপা দিয়ে বিপিন চৌধুরী শয্যা নিলেন। চাকরকে বললেন ডাক্তার চন্দ্রকে ডেকে নিয়ে আসতে। চাকর যাবার আগে তাঁর হাতে একটি চিঠি দিয়ে বলল, কে জানি ডাকবাক্সে ফেলে দিয়ে গেছে। বুজ খাম, তার উপর লাল কালিতে লেখা–শ্রীবিপিনবিহারী চৌধুরী। জরুরি, একান্ত ব্যক্তিগত।
