অসুস্থতা সত্ত্বেও বিপিনবাবুর কেন জানি মনে হল যে, চিঠিটা তাঁর পড়া দরকার। খাম খুলে দেখেন এই চিঠি–
প্রিয় বিপিন,
হঠাৎ বড়লোক হবার কুফল যে তোমার মধ্যে এভাবে দেখতে পাব তা আশা করিনি। একজন দুস্থ বাল্যবন্ধুর জন্য একটা উপায় করে দেওয়া কি সত্যিই তোমার পক্ষে এত অসম্ভব ছিল? আমার টাকা নেই, তাই ক্ষমতা সামান্যই। যে জিনিসটা আছে আমার, সেটা হল কল্পনাশক্তি। তারই সামান্য কিছুটা খরচ করে তোমার উপর সামান্য প্রতিশোধ নিলাম। নিউ মার্কেটের সেই ভদ্রলোকটি আমার প্রতিবেশী; বেশ ভাল অভিনেতা। দীনেশ মুখুজ্যে তোমার প্রতি সদয় নন, তাই তাকে হাত করতে কোনও অসুবিধা হয়নি। হাঁটুর দাগটার কথা নিশ্চয়ই মনে আছে–সেই চাঁদপাল ঘাটে আছাড় খাওয়া উনিশ শো ছত্রিশ সনে?..
আর কী? এবার সেরে উঠবে। আমার একটি উপন্যাস এক প্রকাশকের পছন্দ হয়েছে। কয়েকটা মাস তাতেই কোনওরকমে চালিয়ে নেব। ইতি–
তোমার বন্ধু চুনিলাল।
ডাক্তার চন্দ্র আসতেই বিপিনবাবু বললেন, ভাল আছি। রাঁচি স্টেশনে নেমেই সব মনে পড়ে গেল।
ডাক্তার বললেন, ভেরি স্ট্রেঞ্জ! আপনার কেসটা একটা ডাক্তারি জার্নালে ছাপিয়ে দেব ভাবছি।
বিপিনবাবু বললেন, আপনাকে যেজন্য ডাকা–দেখুন তো, আমার কোমরের হাড়টাড় ভাঙল কিনা। রাঁচিতে হোঁচট খেয়েছিলাম। টনটন করছে।
সন্দেশ, শারদীয়া ১৩৭০
বিষফুল
ওদিকে যাবেন না বাবু!
জগন্ময়বাবু চমকে উঠলেন। কাছাকাছির মধ্যে যে আর কোনও লোক আছে সেটা উনি টের পাননি; তার ফলেই এই চমকানি। এবার দেখলেন তাঁর ডাইনে হাত দশেক দূরে দাঁড়িয়ে আছে একটি তেরো-চোদ্দো বছরের ছেলে, তার পরনে একটা ডোরা কাটা নীল হাফপ্যান্ট, আর গায়ে জড়ানো একটা সবুজ রঙের দোলাই। ছেলেটির রং কালো, মাথার চুল গ্রাম্য কায়দায় পরিপাটি করে আঁচড়ানো, চোখ দুটিতে শান্ত অথচ বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি। গ্রাম্য হলেও নির্ঘাত ইস্কুলে পড়ে। অকাট মূর্খ হলে অমন চাহনি হয় না।
কোনদিকে যাব না? জগন্ময়বাবু প্রশ্ন করলেন।
ওই দিকে।
অর্থাৎ জগন্ময়বাবু তাঁর হাঁটার পথে একবারটি থেমে যেদিকে দৃষ্টি দিয়েছিলেন, সেইদিকে।
কেন, যাব না কেন? কী হবে গেলে?
বিষ আছে।
বিষ? কীসে?
ওই গাছে।
সত্যি বলতে কী গাছটা দেখেই জগন্ময়বাবু থেমেছিলেন। ফুলগাছ। বুনো ফুল সম্ভবত। রাস্তা থেকে হাত বিশেক দূরে একটা ঢিপি, তার উপরে ওই একটি মাত্র গাছ। কাছাকাছির মধ্যেও যাকে গাছ বলে তা আর নেই। এ গাছটা কোমর অবধি উঁচু। তেকোনা ছোট ছোট পাতা, আর পাতার ফাঁকে ফাঁকে ভারী সুন্দর হলদে কমলা আর বেগুনি রঙের ফুল। জগন্ময়বাবুর অবাক লাগছিল এই কারণেই যে গত তিন দিন ঠিক এই রাস্তা দিয়েই হাঁটা সত্ত্বেও ওই টিবি আর ওই গাছ ওঁর চোখে পড়েনি। অবিশ্যি হাঁটার সময় অর্ধেক দৃষ্টি পথে রেখেই চলতে হয়, বিশেষ করে সে-পথ যদি কাঁচা আর অজানা হয়। কাজেই না-দেখাটা আশ্চর্য নয়।
ছেলেটি এখনও সেই ভাবেই দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে দেখছে।
কী নাম তোর? জগন্ময়বাবু জিজ্ঞেস করলেন।
ভগওয়ান।
ওরেব্বাবা!–বাংলা শিখলি কোথায়?
ইস্কুলে।
আমার পিছন পিছন আসছিলি কেন?
আমার বাড়ি ওই তো।
জগন্ময়বাবু দেখলেন যেদিকে ঢিবি সেইদিকেই আরও সিকি মাইলটাক দূরে বাঁশবনের লাগোয়া খার ছাউনি দেওয়া কুটির।
জগন্ময়বাবু আবার চাইলেন ছেলেটির দিকে। আরও দু-একটা প্রশ্ন করতে হয়। সে ফস্ করে যেচে তাঁকে এভাবে নিষেধ করবে কেন?
গাছের কী নাম?
জানি না। বিষ আছে জানলি কী করে?
মরে যায় যে।
কী মরে যায়?
সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর…পাখি…
কী করে মরে যায়? গাছে বসলে? না ফুল খেলে?
কাছে গেলে।
কাছে মানে? কত কাছে?
চার হাত। পাঁচ হাত।
তুই তো খুব গোপপে দেখছি! নাকি গাঁজা ধরেছিস এই বয়সেই? তোর মাস্টারকে জিজ্ঞেস করিস ইস্কুলে। ফুলগাছে এরকম বিষ হয় না কখনও।
ছেলেটি চুপ করে চেয়ে আছে।
আমি এখানে নতুন লোক। চেঞ্জের জন্য এসেছি। আমার শরীর খারাপ, বুঝেচিস? ওরকম গুল-টুল মারিসনি। এদেশে ওরকম ফুলের কথা কেউ শোনেনি। ওরকম হয় না।
এদেশের না। সাহেব এনেছিল।
ছেলেটা দেখছি নাছোড়বান্দা। বিশ্বাস করাবার জন্য বদ্ধপরিকর।
কোন্ সাহেব?
আপনি যে বাড়িতে আছেন, সেই বাড়িতে ছিল।
কবে এসেছিল?
যেবার খরা হল তার আগের বার।
কী নাম?
নাম জানি না। লাল মুখ, কটা চুল।
সে এসে এই ঢিপির উপর পুঁতে দিয়ে গেছে গাছ?
জানি না।
তবে?
সাহেব যাবার পরেই গাছ হল, হোই যে বন, ওইখানে ঘুরত হাতে কাঁচ নিয়ে।
বটানিস্ট-টটানিস্ট হবে, জগন্ময়বাবু ভাবলেন। ভারী তাজ্জব কথাবার্তা বলছে ছেলেটি।
ওই দেখুন না।–ছেলেটি আবার আঙুল দেখাল। ওই ঢিবিটার পাশে। ওই যে পাথরটা, তার ঠিক ডান পাশে।
জগন্ময়বাবু দেখলেন। একটা সাদা সাদা কী যেন দেখা যাচ্ছে।
কী ওটা?
সাপ।
সাপ?
সাপ ছিল। এখন হাড়। মরে গেছে। চিতি সাপ। বিষের দম ছাড়ে ওই ফুল।
জগন্ময়বাবু বাইনোকুলারটা চোখে লাগালেন। হ্যাঁ, সাপই বটে। সাপের কঙ্কাল। ফুলটাও দেখলেন দূরবীনের ভিতর দিয়ে। যত সরল মনে হয়েছিল তত নয়। কোনও রংটাই সরল নয়। হলদের মধ্যে বেগুনির ছিটে, বেগুনির মধ্যে হলুদ, অরেঞ্জের মধ্যে সাদা আর কালো।
যন্ত্রটা চোখে লাগিয়ে আরও একটা মরা জিনিস দেখতে পেলেন জগন্ময়বাবু। এটাও সরীসৃপ, তবে এটার পা আছে চারটে। গিরগিটি বা বহুরূপী জাতীয় কিছু। এটা গত দুএকদিনের মধ্যে মরেছে।
