বাড়ি এসে ঠাণ্ডা ঘরে ঠাণ্ডা শরবত খেয়ে বিপিনবাবুর উদ্বেগটা অনেক কম বলে মনে হল। যতসব বাউন্ডুলের দল। নিজেদের কাজকর্ম নেই, তাই কাজের লোকদের ধরে ধরে বিব্রত করা।
রাত্রে খাওয়াদাওয়া সেরে বিছানায় শুয়ে নতুন বইটা পড়তে পড়তে বিপিনবাবু নিউ মার্কেটের ভদ্রলোকটির কথা ভুলেই গেলেন।
.
পরদিন আপিসে কাজ করতে করতে বিপিনবাবু লক্ষ করলেন যে, যতই সময় যাচ্ছে ততই যেন গতকালের ঘটনাটা তাঁর স্মৃতিতে আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে আসছে। সেই গোলগাল মুখ, সেই ঢুলুঢুলু অমায়িক চাহনি, আর সেই হাসি। তাঁর এঙ ভিতরের খবরই যদি লোঞ্চটা নির্ভুল জেনে থাকে, তবে যাঁচির ব্যাপারটায় সে এত ভুল করল কী করে?
লাঞ্চের ঠিক আগে–অর্থাৎ একটা বাজতে পাঁচ মিনিটের সময়-বিপিনবাবু আর থাকতে না পেরে টেলিফোনের ডিরেক্টরিটা খুলে বসলেন। দীনেশ মুখুজ্যেকে ফোন করতে হবে একটা। ফোনই ভাল। অপ্রস্তুত হবার সম্ভাবনাটা কম।
টু-থ্রি-ফাইভ-সিক্স-ওয়ান-সিক্স।
বিপিনবাবু ডায়াল করলেন।
হ্যালো।
কে, দীনেশ? আমি বিপিন কথা বলছি।
কী খবর?
ইয়ে ফিফটি এইটের একটা ঘটনা তোমার মনে আছে কিনা জানবার জন্য ফোন করছি।
ফিফটি এইট? কী ঘটনা?
সে বছরটা কি তুমি কলকাতাতেই ছিলে? আগে সেইটে আমার জানা দরকার।
দাঁড়াও দাঁড়াও। ফিফটি এইট-আটান্ন…দাঁড়াও, আমার ডায়েরি দেখি। একটু ধরো।
একটুক্ষণ চুপচাপ। বিপিনবাবু তাঁর বুকের ভিতরে একটা দুরুদুরু কাঁপুনি অনুভব করলেন। প্রায় এক মিনিট পরে আবার দীনেশ মুখুজ্যের গলা পাওয়া গেল।
হ্যাঁ, পেয়েছি। আমি বাইরে গেসলাম–দুবার।
কোথায়?
একবার গেসলাম ফেব্রুয়ারিতে কাছে–কেষ্টনগর–আমার এক ভাগনের বিয়েতে। আরেকবারও, এটা তো তুমি জানোই। সেই রাঁচি। সেই যে যেবার তুমিও গেলে। ব্যস। কিন্তু কেন বলো তো?
না। একটা দরকার ছিল। ঠিক আছে। থ্যাঙ্ক ইউ…
বিপিনবাবু টেলিফোনটা রেখে দিয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। তাঁর কান ভোঁ ভোঁ করছে, হাত পা যেন সব কেমন ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। সঙ্গে টিফিনের বাক্সে স্যান্ডউইচ ছিল, সেটা আর তিনি খেলেন না। খাবার কোনও ইচ্ছেই হল না। তাঁর খিদে চলে গেছে।
লাঞ্চ টাইম শেষ হয়ে যাবার পর বিপিনবাবু বুঝতে পারলেন, এ অবস্থায় তাঁর পক্ষে আপিসে বসে কাজ করা অসম্ভব। তাঁর পঁচিশ বছরের কর্মজীবনে এর আগে এরকম কখনও হয়নি। নিরলস কর্মী বলে বিপিনবাবুর একটা খ্যাতি ছিল। কর্মচারীরা তাঁকে বাঘের মতো ভয় করত। যত বিপদই আসুক, যতবড় সমস্যারই সামনে পড়তে হোক, বিপিনবাবুর কোনওদিন মতিভ্রম হয়নি। মাথা ঠাণ্ডা করে কাজ করে সবসময়ে সব বিপদ কাটিয়ে উঠেছেন তিনি।
আজ কিন্তু তাঁর সমস্ত গোলমাল হয়ে গেছে!
আড়াইটের সময় বাড়ি ফিরে, শোয়ার ঘরের সমস্ত দরজা জানলা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে মনটাকে প্রকৃতিস্থ করে, কী করা উচিত সেটা ভাবার চেষ্টা করলেন বিপিনবাবু। মানুষ মাথায় চোট খেয়ে বা অন্য কোনওরকম অ্যাকসিডেন্টের ফলে মাঝে মাঝে পূর্বস্মৃতি হারিয়ে ফেলে। কিন্তু আর সব মনে আছে, শুধু একটা বিশেষ ঘটনা মনে নেই–এর কোনও উদাহরণ তিনি আর কখনও পাননি। রাঁচি যাবার ইচ্ছে তাঁর অনেকদিন থেকেই ছিল। সেই রাঁচিই গেছে, অথচ গিয়ে ভুলে গেলেন, এ একেবারে অসম্ভব!
বাইরে কোথাও গেলে বিপিনবাবু তাঁর বেয়ারাকে সঙ্গে নিয়ে যান। কিন্তু এখন যে বেয়ারাটা আছে সে নতুন লোক। সাত বছর আগে তাঁর বেয়ারা ছিল রামস্বরূপ। তিনি রাঁচি গিয়ে থাকলে সেও নিশ্চয়ই যেত, কিন্তু এখন সে আর নেই, তিন বছর হল নেই।
সন্ধ্যা পর্যন্ত বিপিনবাবু একাই কাটালেন তাঁর ঘরে। মনে মনে স্থির করলেন আজ কেউ এলেও তাঁর সঙ্গে দেখা করবেন না।
সাতটা নাগাদ চাকর এসে খবর দিল তাঁর সঙ্গে ধনী ব্যবসায়ী শেঠ গিরিধারীপ্রসাদ দেখা করতে এসেছেন। জাঁদরেল লোক গিরিধারীপ্রসাদ। কিন্তু বিপিনবাবুর মানসিক অবস্থা তখন এমনই যে, তিনি বাধ্য হয়ে চাকরকে বলে দিলেন যে, তাঁর পক্ষে নীচে নামা সম্ভব নয়। চুলোয় যাক গিরিধারীপ্রসাদ!
সাড়ে সাতটায় আবার চাকরের আগমন। বিপিনবাবুর তখন সবে একটা তন্দ্রার ভাব এসেছে, একটা দুঃস্বপ্নের গোড়াটা শুরু হয়েছে, এমন সময় চাকরের ডাকে তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। আবার কে এল? চাকর বলল, চুনিবাবু। বলছে ভীষণ জরুরি দরকার।
দরকার যে কী তা বিপিনবাবু জানেন। চুনি তাঁর স্কুলের সহপাঠী। সম্প্রতি দুরবস্থায় পড়েছে, কদিন থেকেই তাঁর কাছে আসছে একটা কোনও চাকরির আশায়। বিপিনবাবুর পক্ষে তার জন্য কিছু করা সম্ভব নয়, তাই প্রতিবারই তিনি তাকে না বলে দিয়েছেন, আচ্ছা নাছোড়বান্দা লোক তুমি চুনি!
বিপিনবাবু অত্যন্ত বিরক্তভাবে চাকরটাকে দিয়ে বলে পাঠালেন যে, শুধু আজ নয়–বেশ কিছুদিন তাঁর পক্ষে চুনির সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হবে না।
চাকর ঘর থেকে চলে যেতেই বিপিনবাবুর খেয়াল হল যে, চুনির হয়তো আটান্নর ঘটনা কিছুটা মনে থাকতে পারে। তাকে একবার জিজ্ঞেস করাতে দোষ কী?
বিপিনবাবু তরতরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে বৈঠকখানায় হাজির হলেন। চুনি যাবার জন্য উঠে পড়েছিল, বিপিনবাবুকে নেমে আসতে দেখে সে যেন একটু আশান্বিত হয়েই ঘুরে দাঁড়াল।
বিপিনবাবু ভণিতা না করেই বললেন, শোনো চুনি, তোমার কাছে একটা–মানে, একটু বেখাপ্পা প্রশ্ন আছে। তোমার তো স্মরণশক্তি বেশ ভাল ছিল বলে জানি–আর আমার বাড়িতে তো তুমি অনেক। বছর ধরেই মাঝে মাঝে যাতায়াত করছ। ভেবে দেখো তো মনে পড়ে কিনা–আমি কি আটান্ন সালে রাঁচি গিয়েছিলাম?
