মধুসূদন বারান্দায় বেতের টেবিলে চা রেখে চলে যাবার সময় লক্ষ করলুম তাকে যেন বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। বললুম, কী হল মধুসুদন? শরীর খারাপ নাকি? না রাত্রে ঘুম হয়নি?
মধু বলল, না বাবু, আমার কিছুই হয়নি। হয়েছে আমার বাছুরটার।
কী হল আবার?
কাল রাত্তিরে সাপের কামড় খেয়ে মরে গেছে।
সে কী। মরেই গেল?
আজ্ঞে, তা আর মরবে না? এই সবে সাতদিনের বাছুর! গলার কাছটায় মেরেছে ছোবল, কী জানি গোখরো না কী।
মনটা কেমন জানি খচ করে উঠল। গলার কাছে? গলায় ছোবল? কালই যেন–
হঠাৎ মনে পড়ে গেল। ভ্যাম্পায়ার ব্যাট। জন্তু জানোয়ারের গলা থেকে রক্ত শুষে নেয় ভ্যাম্পায়ার। ব্যাট। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল সাপের ছোবলে বাছুর মরবে এতে আর আশ্চর্য কী? আর বাছুর যদি রাত্রে শুয়ে থাকে, তা হলে গলায় ছোবল লাগাটা তো কোনও অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। আমি মিছিমিছি দুটো জিনিসের মধ্যে একটা সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছি।
মধুসূদনকে সান্ত্বনা দেবার মতো দু-একটা কথা বলে কাজের তোড়জোড় করব বলে ঘরে ঢুকতেই দৃষ্টিটা যেন আপনা থেকেই কড়িকাঠের দিকে চলে গেল।
কালকের সেই বাদুড়টা আবার কখন জানি তার জায়গায় এসে আশ্রয় নিয়েছে।
ওই জানলাটা খোলাতেই এই কাণ্ডটা হয়েছে। ভুলটা আমারই। মনে মনে স্থির করলুম আজ রাত্রে যত গুমোটই হোক না কেন, দরজা জানলা সব বন্ধ করেই রেখে দেব।
.
সারাদিন মন্দির দেখে বেশ আনন্দেই কাটল। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর এই পোড়া ইটের মন্দিরের গায়ে কাজ দেখে সত্যিই স্তম্ভিত হতে হয়।
হেতমপুর থেকে বাসে করে ফিরে সিউড়ি এসে যখন পৌঁছলুম তখন সাড়ে চারটে।
বাড়ি ফেরার পথ ছিল গোরস্থানটার পাশ দিয়েই। সারাদিনের কাজের মধ্যে কালকের সেই ভদ্রলোকটির কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলুম, তাই গোরস্থানের বাইরে সজনেগাছটার নীচে হঠাৎ তাঁকে দেখে কেমন যেন চমকে উঠলুম। পরমুহূর্তেই মনে হল লোকটাকে না-দেখতে পাওয়ার ভান করে এড়িয়ে যেতে পারলে খুব সুবিধে হয়। কিন্তু সে আর হবার জো নেই। মাথা হেঁট করে হাঁটার স্পিড যেই বাড়িয়েছি, অমনই ভদ্রলোক লাফাতে লাফাতে এগিয়ে এসে আমার হাত ধরে ফেললেন।
রাত্তিরে ঘুম হয়েছিল ভাল?
আমি সংক্ষেপে হ্যাঁ বলে এগোতে আরম্ভ করলুম, কিন্তু দেখলুম আজও ভদ্রলোক আমার সঙ্গ ছাড়বেন না। আমার দ্রুত পদক্ষেপের সঙ্গে পা মিলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, আমার আবার কী বাতিক জানেন? রাত্রে আমি একদম ঘুমোত পারি না। দিনের বেলাটা কষে ঘুমিয়ে নিই, আর সন্ধে থেকে সারা রাতটা এদিক ওদিকে বেড়িয়ে বেড়াই। এই ঘোরায় যে কী আনন্দ তা আপনাকে কী করে বোঝাব? এই গোরস্থানের ভিতরে এবং আশেপাশে যে কত দেখবার ও শোনবার জিনিস আছে তা আপনি জানেন? এই যে এরা সব মাটির তলায় কাঠের বাক্সের মধ্যে বছরের পর বছর বন্দি অবস্থায় কাটিয়ে দিচ্ছে, এদের অতৃপ্ত বাসনার কথা কি আপনি জানেন? এরা কি কেউ এইভাবে বন্দি থাকতে চায়? কেউ চায় না। সকলেই মনে মনে ভাবে–একবারটি যদি বেরিয়ে আসতে পারি। কিন্তু মুশকিল হল কী জানেন?–এই বেরোনোর রহস্যটি সকলের জানা নেই। সেই শোকে তারা কেউ কাঁদে, কেউ গোঙায়, কেউ বা ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মাঝ রাত্তিরে যখন চারিদিক নিস্তব্ধ হয়ে যায়, শেয়াল যখন ঘুমিয়ে পড়ে, ঝিঁঝিপোকা যখন ডেকে ডেকে ক্লান্ত হয়ে যায়, তখন যাদের শ্রবণশক্তি খুব তীক্ষ্ণ–এই যেমন আমার–তারা এইসব মাটির নীচে কাঠের বাক্সে বন্দি প্রাণীদের শোকোচ্ছ্বাস শুনতে পায়। অবিশ্যি–ওই যা বললাম কান খুব ভাল হওয়া চাই। আমার চোখ কান দুটোই খুব ভাল। ঠিক বাদুড়ের মতো…
মনে মনে ভাবলুম, মধুসূদনকে এই লোকটির কথা জিজ্ঞেস করতে হবে। এঁকে জিজ্ঞেস করে সঠিক উত্তর পাওয়া যাবে বলে ভরসা হয় না। কদ্দিনের বাসিন্দা ইনি? কী করেন ভদ্রলোক? কোথায় এঁর বাড়ি?
আমার পিছনে হাঁটতে হাঁটতে ভদ্রলোক বলে চললেন, আমি সকলের সঙ্গে বিশেষ একটা এগিয়ে এসে আলাপ করি না, কিন্তু আপনার সঙ্গে করলাম। আশা করি যে কটা দিন আছেন, আপনার সঙ্গ থেকে আমাকে বঞ্চিত করবেন না।
আমি এবার আর রাগ সামলাতে পারলাম না। হাঁটা থামিয়ে লোকটির দিকে ঘুরে বললুম, দেখুন মশাই, আমি সাতদিনের জন্য এসেছি এখানে। বিস্তর কাজ রয়েছে আমার। আপনাকে সঙ্গ দেওয়ার সুযোগ হবে বলে মনে হয় না।
ভদ্রলোক যেন প্রথমটা আমার কথা শুনে একটু মুষড়ে পড়লেন। তারপর মৃদু অথচ বেশ দৃঢ় কণ্ঠে ঈষৎ হাসি মাখিয়ে বললেন, আপনি আমাকে সঙ্গ না দিলেও আমি তো আপনাকে দিতে পারি। আর আপনি যে সময়টা কাজ করেন–অর্থাৎ দিনের বেলা–আমি সে সময়টার কথা বলছিলাম না।
আর বৃথা সময় নষ্ট করে লাভ নেই। সংক্ষেপে নমস্কার বলে আমি বাড়ির দিকে পা চালালুম।
রাত্রে খাবার সময় মধুসূদনকে লোকটির কথা জিজ্ঞেস করলুম। মধু মাথা চুলকে বললে, আজ্ঞে জগদীশ মুখুজ্জে বলে কাউকে–তারপর একটু ভেবে বললে, ও, হ্যাঁ দাঁড়ান। বেঁটেখাটো মানুষ? কোট-প্যান্টলুন পরেন? গায়ের রঙ ময়লা?
হ্যাঁ, হ্যাঁ।
ও–আরে, তার তো বাবু মাথা খারাপ। সে তো হাসপাতালে ছিল এই কিছুদিন আগে অবধি। তবে এখন শুনছি তার ব্যামো সেরেছে। তাকে চিনলেন কী করে বাবু? তাকে তো অনেকদিন দেখিনি! ওর বাপনীলমণি মুখুজ্জে ছিলেন পাদ্রী সাহেব। খুব ভাল লোক। তবে তিনিও শুনেছিলুম মাথার ব্যামোতেই। মারা গিয়েছিলেন।
