গেটটা খোলাই ছিল। ভিতরে ঢুকে ফলকের উপর অস্পষ্ট লেখাগুলো পড়তে চেষ্টা করলাম। একটায় দেখলাম সন ১৭৯৩। আরেকটায় ১৭৮৮। সবই সাহেবদের কবর, ইংরেজ রাজত্বে গোড়ার যুগে ভারতবর্ষে এসে নানা মহামারীর প্রকোপে অধিকাংশেরই অল্প বয়সেই মৃত্যু হয়েছে। একটা ফলকে লেখাটা একটু স্পষ্ট আছে দেখে আমার টর্চ জ্বালিয়ে ঝুঁকে সেটা পড়তে যাব, এমন সময় আমার পিছনেই যেন একটা পায়ের শব্দ পেলাম। ঘুরে দেখি একটি মাঝবয়সি বেঁটে-গগাছের লোক হাত দশেক দুরে দাঁড়িয়ে আমারই দিকে হাসি হাসি মুখ করে চেয়ে আছে। লোকটার পরনে একটা কালো আলপাকার কোট, একটা ছাইরঙের পেন্টুলুন আর হাতে একটা তালি-দেওয়া ছাতা।
আপনি বাদুড় জিনিসটাকে বিশেষ পছন্দ করেন না–তাই না? ভদ্রলোকের কথায় চমকে উঠলাম। এটা সে জানল কী করে? আমার বিস্ময় দেখে ভদ্রলোক হেসে বললেন, ভাবছেন, কী করে জানলুম? খুবই সোজা। আপনি যখন আপনার বাড়ির দরোয়ানটিকে আপনার ঘরের বাদুড়টাকে তাড়িয়ে দেবার কথা বলছিলেন, তখন আমি কাছাকাছিই ছিলুম।
ওঃ, তাই বলুন।
ভদ্রলোক এইবার আমাকে নমস্কার করলেন।
আমার নাম জগদীশ পার্সিভ্যাল মুখার্জি। আমাদের চার পুরুষের বাস এই সিউড়িতে। খ্রিস্টান তো–তাই সন্ধের দিকটা গির্জা-গোরস্থানের আশপাশটায় ঘুরতে বেশ ভাল লাগে।
অন্ধকার বাড়ছে দেখে আস্তে আস্তে বাড়ির দিকে পা ফেরালুম। ভদ্রলোক আমার সঙ্গ নিলেন। কেমন যেন লাগছিল লোকটিকে। এমনিতে নিরীহ বলেই মনে হয়–কিন্তু গলার স্বরটা যেন কেমন কেমন–মিহি, অথচ রীতিমতো কর্কশ। আর গায়ে পড়ে যেসব লোক আলাপ করে তাদের আমার এমনিতেই ভাল লাগে না।
টর্চের বোম টিপে দেখি সেটা জ্বলছে না। মনে পড়ল হাওড়া স্টেশনে একজোড়া ব্যাটারি কিনে নেব ভেবেছিলাম সেটা আর হয়নি। কী মুশকিল। রাস্তায় সাপখোপ থাকলে তো দেখতেও পাব না।
ভদ্রলোক বললেন, আপনি টর্চের জন্য চিন্তা করবেন না। অন্ধকারে চলাফেরার অভ্যাস আছে আমার। বেশ ভালই দেখতে পাই। সাবধান–একটা গর্ত আছে কিন্তু সামনে।
ভদ্রলোক আমার হাতটা ধরে একটা টান দিয়ে বাঁ দিকে সরিয়ে দিলেন। তারপর বললেন, ভ্যাম্পায়ার কাকে বলে জানেন?
সংক্ষেপে বললুম, জানি। ভ্যাম্পায়ার কে না জানে? রক্তচোষা বাদুড়কে বলে ভ্যাম্পায়ার ব্যাট। ঘোড়া গোরু ছাগল ইত্যাদির গলা থেকে রক্ত চুষে খায়। আমাদের দেশে এ বাদুড় আছে কিনা জানি না, তবে বিদেশি বইয়ে ভ্যাম্পায়ার ব্যাটের কথা পড়েছি। শুধু বাদুড় কেন বিদেশি ভুতুড়ে গল্পের বইয়ে পড়েছি, মাঝ রাত্তিরে কোনও কোনও কবর থেকে মৃতদেহ বেরিয়ে এসে জ্যান্ত ঘুমন্ত মানুষের গলা থেকে রক্ত চুষে খায়। তাদেরও বলে ভ্যাম্পায়ার। কাউন্ট ড্রাকুলার রোমহর্ষক কাহিনী তো ইস্কুলে থাকতেই পড়েছি।
আমার বিরক্ত লাগল এই ভেবে যে, বাদুড়ের প্রতি আমার বিরূপ মনোভাবের কথা জেনেও ভদ্রলোক আবার গায়ে পড়ে বাদুড়ের প্রসঙ্গ তুলছেন কেন!
এর পরে দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ।
আমবাগানটা পাশ কাটিয়ে বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছতে ভদ্রলোক হঠাৎ বললেন, আপনার সঙ্গে আলাপ করে বিশেষ আনন্দিত হলুম। আছেন তো কদিন?
বললুম, দিন সাতেক।
বেশ বেশ–তা হলে তো দেখা হবেই। তারপর গোরস্থানের দিকটায় আঙুল দেখিয়ে বললেন, সন্ধের দিকটায় ওদিক পানে এলেই আমার দেখা পাবেন। আমার বাপ-পিতামহর কবরও ওখানেই আছে। কাল আসবেন, দেখিয়ে দেব।
মনে মনে বললাম, তোমার সঙ্গে যত কম দেখা হয় ততই ভাল। বাদুড়ের উৎপাত যেমন অসহ্য, বাদুড় সম্পর্কে আলোচনাও তেমনই অতৃপ্তিকর। অনেক অন্য বিষয়ে চিন্তা করার আছে।
বারান্দার সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় পিছন ফিরে দেখলুম ভদ্রলোক অন্ধকার আমবনটার ভিতরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। বনের পিছনের ধানখেতের দিক থেকে তখন শেয়ালের কোরাস আরম্ভ হয়ে গেছে।
আশ্বিন মাস–তাও যেন কেমন গুমোট করে রয়েছে। খাওয়া-দাওয়া করে বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে ভাবলুম বাদুড়ের ভয়ে জানলা-দরজাগুলো বন্ধ করে দিয়েছিলুম–সেগুলো খুলে দিলে বোধহয় কিছুটা আরাম হতে পারে।
কিন্তু দরজাটা খুলতে ভরসা হল না। বাদুড়ের জন্য নয়। দরোয়ান বাবাজির ঘুম যদি হালকা হয়, চোরের উপদ্রব থেকেও বোধহয় রক্ষা পাওয়া যাবে। কিন্তু এইসব মফস্বল শহরে মাঝে মাঝে দেখা যায়–দরজা খোলা রাখলে রাস্তার কুকুর ঘরে ঢুকে চটিজুতোর দফারফা করে দিয়ে যায়। এ অভিজ্ঞতা আমার আগে অনেকবার হয়েছে। তাই অনেক ভেবে দরজা দুটো না খুলে পশ্চিম দিকের জানলাটা খুলে দিলুম। দেখলুম বেশ ঝিরঝির করে হাওয়া আসছে।
ক্লান্ত থাকায় ঘুম আসতে বেশি সময় লাগল না।
ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলুম জানলার গরাদে মুখ লাগিয়ে সন্ধেবেলার সেই ভদ্রলোকটি আমার দিকে চেয়ে হাসছেন। তাঁর চোখ দুটো জ্বলজ্বলে সবুজ, আর দাঁতগুলো কেমন যেন সরু সরু আর ধারালো। তারপর দেখলুম ভদ্রলোক দুপা পিছিয়ে গিয়ে হাতদুটোকে উঁচু করে এক লাফ দিয়ে গরাদ ভেদ করে ঘরের মধ্যে এসে পড়লেন। ভদ্রলোকের পায়ের শব্দেই যেন আমার ঘুমটা ভেঙে গেল।
চোখ মেলে দেখি ভোর হয়ে গেছে। কী বিদঘুঁটে স্বপ্ন রে বাবা! বিছানা ছেড়ে উঠে মধুসূদনকে একটা হাঁক দিয়ে বললুম চা দিয়ে যেতে। সকাল সকাল খেয়ে বেরিয়ে না পড়লে কাজের অসুবিধে হবে।
