আমি আর কথা বাড়ালাম না, কেবল বাদুড়টার কথা সকালে বলা হয়নি, সেটা বলে বললাম, অবিশ্যি দোষটা আমারই। জানলাটা খুলে দিয়েছিলাম। ওটার যে মাঝের গরাদটা নেই, সেটা খেয়াল ছিল না।
মধু বলল, এক কাজ করব বাবু। কাল ওই ফাঁকটা বন্ধ করে দেব। আজকের রাতটা বরং জানলাটা ভেজানোই থাক।
সারাদিন মন্দির নিয়ে যেসব কাজ করেছি, রাত্রে খাতা খুলে সেইগুলো সম্বন্ধে একপ্রস্থ লিখে ফেললাম। ক্যামেরায় আর ফিল্ম ছিল না। বাক্স খুলে আগামীকালের জন্য নতুন ফিল্ম ভরলাম। জানলার দিকে বাইরে তাকিয়ে দেখি গতকালের জমা মেঘ কেটে গিয়ে চাঁদের আলোয় বাইরেটা তকতক করছে।
লেখার কাজ শেষ করে বারান্দায় এসে বেতের চেয়ারটায় কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম। এগারোটার কাছাকাছি উঠে এক গেলাস ঠাণ্ডা জল খেয়ে বিছানায় এসে শুলাম। মনে মনে ভাবলাম, আজকালকার বৈজ্ঞানিক যুগে জগদীশবাবুর কথাগুলো সত্যিই হাস্যকর। স্থির করলাম, হাসপাতালে জগদীশবাবুর কী চিকিৎসা হয়েছিল এবং কোন ডাক্তার চিকিৎসা করেছিলেন সেটা একবার খোঁজ নিতে হবে।
মেঘ কেটে গিয়ে গুমোট ভাবটাও কেটে গিয়েছিল, তাই জানলা দরজা বন্ধ করাতেও কোনও অসুবিধা লাগছিল না। বরঞ্চ পাতলা চাদর যেটা এনেছিলাম সেটা আজ গায়ে দিতে হল। চোখ বোজার অল্পক্ষণের মধ্যেই বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
কটার সময় যে ঘুমটা ভাঙল জানি না আর ভাঙার কিছুক্ষণ পরে পর্যন্ত কেন যে ভাঙল সেটা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। তারপর হঠাৎ পুবদিকের দেয়ালে একটা চতুষ্কোণ চাঁদের আলো দেখেই বুকের ভিতরটা ধড়াস করে উঠল।
জানলাটা কখন জানি খুলে গেছে, সেই জানলা দিয়ে চাঁদের আলো এসে দেয়ালে পড়েছে।
তারপর দেখলাম, চতুষ্কোণ আলোটার উপর দিয়ে কীসের একটা জানি ছায়া বারবার ঘুরে ঘুরে যাচ্ছে।
নিশ্বাস প্রায় বন্ধ করে ঘাড়টা ফিরিয়ে উপর দিকে চাইতেই বাদুড়টাকে দেখতে পেলাম।
আমার খাটের ঠিক উপরেই বাদুড়টা বনবন করে চরকি পাক ঘুরছে এবং ঘুরতে ঘুরতে ক্রমশ নীচে আমার দিকে নামছে।
আমি প্রাণপণ চেষ্টা করে যতটা সাহস সঞ্চয় করা যায় করলাম। এ অবস্থায় দুর্বল হলে অনিবার্য বিপদ। বাদুড়টার দিক থেকে দৃষ্টি না ফিরিয়ে আমার ডানহাতটা খাটের পাশের টেবিলের দিকে বাড়িয়ে টেবিলের উপর থেকে আমার শক্ত বাঁধাই খাতাটা তুলে নিলাম।
তিন-চার হাতের মধ্যে বাদুড়টা যেই আমার কণ্ঠনালীর দিকে তাক করে একটা ঝাঁপ দিয়েছে–আমিও সঙ্গে সঙ্গে খাতাটা দিয়ে তার মাথায় প্রচণ্ড একটা আঘাত করলাম।
বাদুড়টা ছিটকে গিয়ে জানলার গরাদের সঙ্গে একটা ধাক্কা খেয়ে একেবারে ঘরের বাইরে মাঠে গিয়ে পড়ল। পরমুহূর্তেই একটা খচমচ শব্দে মনে হল কে যেন ঘাসের উপর দিয়ে দৌড়ে পালাল।
জানলার কাছে গিয়ে ফাঁক দিয়ে গলা বাড়িয়ে দেখলাম–কোথাও কিছু নেই, বাদুড়টারও চিহ্নমাত্র নেই।
বাকি রাতটা আর ঘুমোতে পারলাম না।
সকালে রোদ উঠতেই রাত্রের বিভীষিকা মন থেকে অনেকটা কেটে গেল। এ বাদুড় যে ভ্যাম্পায়ার, এখনও পর্যন্ত তার সঠিক কোনও প্রমাণ নেই। আমার দিকে বাদুড়টা নেমে আসছিল মানেই যে আমার রক্ত খেতে আসছিল, তারও সত্যি কোনও প্রমাণ নেই। ওই বিদঘুঁটে লোকটি ভ্যাম্পায়ারের প্রসঙ্গ না তুললে কি আর আমার কথা মনেও আসত? কলকাতায় যেমন বাদুড় ঘরে ঢোকে, এ বাদুড়কেও তারই সমগ্রোত্রীয় বলে মনে হত।
যাই হোক, হেতমপুরের কাজ বাকি আছে। চা-পান সেরে সাড়ে ছটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম।
গোরস্থানের কাছাকাছি আসতে একটা আশ্চর্য দৃশ্য দেখলাম। স্থানীয় কয়েকটি লোক জগদীশবাবুকে ধরাধরি করে নিয়ে আসছে। দেখে মনে হল জগদীশবাবু অজ্ঞান, আর তাঁর কপালে যেন চাপ বাঁধা রক্তের দাগ। কী হয়েছে জিজ্ঞেস করাতে সামনের লোকটি হেসে বললে, বোধ হয় গাছ থেকে পড়ে গিয়ে মাথাটি ফাটিয়ে অজ্ঞান।
বললাম, সে কী–গাছ থেকে পড়বেন কেন?
আরে মশাই-এ লোক বদ্ধ পাগল। মাঝে একটু সুস্থ হয়েছিল–তার আগে সন্ধেবেলা এ-গাছে। সে-গাছে উঠে মাথা নিচু করে ঝুলে থাকত –ঠিক বাদুড়ের মত।
সন্দেশ, মাঘ ১৩৭০
বারীন ভৌমিকের ব্যারাম
কন্ডাকটরের নির্দেশমতো ডি কামরায় ঢুকে বারীন ভৌমিক তাঁর সুটকেসটা সিটের নীচে ঢুকিয়ে দিলেন। ওটা পথে খোলার দরকার হবে না। ছোট ব্যাগটা হাতের কাছে রাখা দরকার। চিরুনি, বুরুশ, টুথব্রাশ, দাড়ি কামানোর সরঞ্জাম, ট্রেনে পড়ার জন্য হ্যাডলি চেজের বই–সবই রয়েছে ওই ব্যাগে আর আছে থ্রোট পিলস। ঠাণ্ডা ঘরে ঠাণ্ডা লেগে গলা বসে গেলে কাল গান খুলবে না। চট করে একটা বড়ি মুখে পুরে দিয়ে বারীন ভৌমিক ব্যাগটাকে জানলার সামনে টেবিলটার উপর রেখে দিলেন।
দিল্লিগামী ভেস্টিবিউল ট্রেন, ছাড়তে আর মাত্র সাত মিনিট বাকি, অথচ তাঁর কামরায় আর প্যাসেঞ্জার নেই কেন? এতখানি পথ কি তিনি একা যাবেন? এতটা সৌভাগ্য কি তাঁর হবে? এ যে একেবারে আয়েশের পরাকাষ্ঠা! অবস্থাটা কল্পনা করে বারীন ভৌমিকের গলা থেকে আপনিই একটা গানের কলি বেরিয়ে পড়ল বাগিচায় বুলবুল তুই ফুলশাখাতে দিনে আজি দোল!
বারীন ভৌমিক জানলা দিয়ে বাইরে হাওড়া স্টেশন প্ল্যাটফর্মের জনস্রোতের দিকে চাইলেন। দুটি ছোঁকরা তাঁর দিকে চেয়ে পরস্পরে কী যেন বলাবলি করছে। বারীনকে চিনেছে তারা। অনেকেই চেনে। অন্তত কলকাতা শহরের, এবং অনেক বড় বড় মফস্বল শহরের অনেকেই শুধু তাঁর কণ্ঠস্বর নয়, তাঁর চেহারার সঙ্গেও পরিচিত। প্রতি মাসেই পাঁচ-সাতটা ফাংশনে তাঁর ডাক পড়ে। বারীন ভৌমিক গাইবেন নজরুলগীতি ও আধুনিক। খ্যাতি ও অর্থ–দুই-ই এখন বারীন ভৌমিকের হাতের মুঠোয়। অবিশ্যি এটা হয়েছে বছর পাঁচেক হল। তার আগে কয়েকটা বছর তাঁকে বেশ, যাকে বলে, স্ট্রাগলই করতে হয়েছে। গানের জন্য নয়। গাইবার ক্ষমতাটা তাঁর সহজাত। কিন্তু শুধু গাইলেই তো আর হয় না। তার সঙ্গে চাই কপালজোর, আর চাই ব্যাকিং। উনিশশো সাতষট্টি সালে উনিশ পল্লীর পুজো প্যান্ডেলে ভোলাদা–ভোলা বাঁড়ুজ্যে–তাঁকে দিয়ে যদি না জোর করে বসিয়া বিজনে গানখানা গাওয়াতেন…।
