কলকাতায় আমার ঘরে চামচিকে এতবার ঢুকেছে যে, আমার তো এক-এক সময় মনে হয়েছে আমার উপর বুঝি জানোয়ারটার একটা পক্ষপাতিত্ব রয়েছে! কিন্তু তাই বলে এটা ভাবতে পারিনি যে, সিউড়িতে এসে আমার বাসস্থানটিতে ঢুকে ঘরের কড়িকাঠের দিকে চেয়েই দেখব সেখানেও একটি বাদুড় ঝোলায়মান। এ যে রীতিমতো বাড়াবাড়ি। ওটিকে বিদেয় না করতে পারলে তো আমার এ ঘরে থাকা চলবে না!
এই বাড়িটার খোঁজ পাই আমার বাবার বন্ধু তিনকড়িকাকার কাছ থেকে। এককালে ইনি সিউড়িতে ডাক্তারি করতেন। এখন রিটায়ার করে কলকাতায় আছেন। বলা বাহুল্য, সিউড়িতে এর অনেক জানাশোনা আছে। তাই আমার যখন দিন সাতেকের জন্য সিউড়িতে যাবার প্রয়োজন হল, আমি তিনকড়িকাকার কাছেই গেলাম। তিনি শুনে বললেন, সিউড়ি? কেন? সিউড়ি কেন? কী করা হবে সেখানে?
আমি বললাম যে, বাংলাদেশের প্রাচীন পোড়া ইটের মন্দিরগুলো সম্বন্ধে আমি গবেষণা করছি। একটা বই লেখার ইচ্ছে আছে। এমন সুন্দর সব মন্দির চারিদিকে ছড়িয়ে আছে, অথচ সেই নিয়ে কেউ আজ অবধি একটা প্রামাণ্য বই লেখেনি।
ওহো, তুমি তো আবার আর্টিস্ট। তোমার বুঝি ওইদিকে শখ? তা বেশ বেশ। কিন্তু শুধু সিউড়ি কেন? ওরকম মন্দির তো বীরভূমে অনেক রয়েছে। সুরুল, হেতমপুর, দুবরাজপুর, ফুলবেরা, বীরসিংপুর–এসব জায়গাতেই তো ভাল ভাল মন্দির আছে। তবে সেসব কি এতই ভাল যে, তাই নিয়ে বই লেখা যায়?
যাই হোক–তিনকড়িকাকা একটা বাড়ির সন্ধান দিয়ে দিলেন আমায়।
পুরনো বাড়িতে থাকতে তোমার আপত্তি নেই তো? আমার পেশেন্ট থাকত ও বাড়িতে। এখন কলকাতায় চলে এসেছে। তবে যতদূর জানি, দরোয়ান-গোছের লোক একটি থাকে সেখানে দেখাশোনা করবার। বেশ বড় বাড়ি৷ তোমার কোনও অসুবিধা হবে না। পয়সাকড়িও লাগবে না কারণ পেশেন্টটিকে আমি একেবারে যমের হাত থেকে ছিনিয়ে এনেছিলাম, তিন-তিনবার। দিন সাতেকের জন্য তার বাড়ির একটা ঘরে একজন গেস্ট থাকবে, আমি এমন অনুরোধ করলে সে খুশি হয়েই রাজি হবে।
হলও তাই। কিন্তু সাইকেল রিকশা করে স্টেশন থেকে মালপত্র নিয়ে বাড়িটায় পৌঁছে ঘরে ঢুকেই দেখি বাদুড়।
বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক বৃদ্ধ দরোয়ান-গোছের লোকটিকে হাঁক দিলাম:
কী নাম হে তোমার?
আজ্ঞে, মধুসূদন।
বেশ, তা মধুসূদন–ওই বাদুড়বাবাজি কি বরাবরই এই ঘরে বসবাস করেন, না আজ আমাকে অভ্যর্থনা করতে এসেছেন?
মধুসূদন কড়িকাঠের দিকে চেয়ে মাথা চুলকিয়ে বলল, আজ্ঞে তা তো খেয়াল করিনি বাবু। এ ঘরটা তো বন্ধই থাকে; আজ আপনি আসবেন বলে ভোলা হয়েছে।
কিন্তু ইনি থাকলে তো আবার আমার থাকা মুশকিল।
ও আপনি কিছু ভাববেন না বাবু। ও সন্ধে হলে আপনিই চলে যাবে।
তা না হয় গেল। কিন্তু কাল যেন আবার ফিরে না আসে তার একটা ব্যবস্থা হবে কি?
আর আসবে না। আর কি আসে? এ তো আর বাসা বাঁধেনি যে, আসবে। রাত্তিরে কোন সময় ফস করে ঢুকে পড়েছে। দিনের বেলা তো চোখে দেখতে পায় না, তাই বেরুতে পারেনি।
চা-টা খেয়ে বাড়ির সামনের বারান্দাটায় একটা পুরনো বেতের চেয়ারে এসে বসলাম।
বাড়িটা শহরের এক প্রান্তে। সামনে উত্তর দিকে কার যেন মস্ত আমবাগান। গুঁড়ির ফাঁক দিয়ে দুরে দিগন্তবিস্তৃত ধানখেত দেখা যায়। পশ্চিম দিকে একটা বাঁশঝাড়ের উপর দিয়ে একটা গির্জার চুড়ো দেখা যায়। সিউড়ির এটি একটি বিখ্যাত প্রাচীন গির্জা। রোদটা পড়লে একটু ওদিকটায় ঘুরে আসব বলে স্থির করলাম। কাল থেকে আবার কাজ শুরু করব। খোঁজ নিয়ে জেনেছি সিউড়ি এবং তার আশপাশে বিশ-পঁচিশ মাইলের মধ্যে অন্তত খান ত্রিশেক পোড়া ইটের মন্দির আছে। আমার সঙ্গে ক্যামেরা আছে, এবং অপর্যাপ্ত ফিল্ম। এইসব মন্দিরের গায়ের প্রতিটি কারুকার্যের ছবি তুলে ফেলতে হবে। ইটের আয়ু আর কতদিন? এসব নষ্ট হয়ে গেলে বাংলাদেশ তার এক অমূল্য সম্পদ হারাবে।
আমার রিস্টওয়াচের দিকে চেয়ে দেখি সাড়ে পাঁচটা। গির্জার মাথার পিছনে সূর্য অদৃশ্য হল। আমি আড় ভেঙে চেয়ার ছেড়ে উঠে সবে বারান্দার সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়েছি এমন সময় আমার কান ঘেঁষে শনশন শব্দ করে কী যেন একটা উড়ে আমবনের দিকটায় চলে গেল।
শোয়ার ঘরে ঢুকে কড়িকাঠের দিকে চেয়ে দেখি–বাদুড়টা আর নেই।
যাক-বাঁচা গেল। সন্ধেটা অদ্ভুত নির্বিঘ্নে কাটবে। হয়তো বা আমার লেখার কাজও কিছুটা এগিয়ে যেতে পারে। বর্ধমান, বাঁকুড়া আর চব্বিশ পরগনার মন্দিরগুলো এর আগেই দেখা হয়ে গিয়েছিল। সেগুলো সম্পর্কে লেখার কাজটা সিউড়িতে থাকতে থাকতেই আরম্ভ করব ভেবেছিলাম।
রোদটা পড়তে আমার টর্চটা হাতে নিয়ে গির্জার দিকটায় বেরিয়ে পড়লাম। বীরভূমের লাল মাটি, অসমতল জমি, তাল আর খেজুর গাছের সারি–এ সবই আমার বড় ভাল লাগে। তবে সিউড়িতে আমার এই প্রথম আসা। প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করার উদ্দেশ্যে যদিও আসিনি তবুও এই সন্ধেটায় লাল গির্জার আশপাশটা ভারী মনোরম লাগল। হাঁটতে হাঁটতে গির্জা ছাড়িয়ে পশ্চিমদিকে আরও খানিকটা পথ এগিয়ে গেলাম। সামনে দেখলাম খানিকটা জায়গা রেলিং দিয়ে ঘেরা। দূর থেকে কারও বাগান বলে মনে হয়। একটা লোহার গেটও রয়েছে বলে মনে হয়।
আরও খানিকটা এগিয়ে গিয়ে বুঝলামবাগান নয়, গোরস্থান। খান ত্রিশেক খ্রিস্টানদের কবর রয়েছে গোরস্থানটায়। কোনওটির উপর কারুকার্য করা পাথর বা ইটের স্তম্ভ। আবার কোনওটিতে মাটিতে শোয়ানো পাথরের ফলক। এগুলো যে খুবই পুরনো তাতে কোনও সন্দেহ নেই। স্তম্ভগুলিতে ফাটল ধরেছে। আবার ফাটলের মধ্যে এক-একটাতে অশ্বথের চারা গজিয়েছে।
