বঙ্কুবাবুর গা একটু ছমছম করে থাকলেও, একটা অদম্য কৌতূহলবশে তিনি এগিয়ে চললেন।
ডোবার থেকে ত্রিশ হাত দূরে বড় বাঁশঝাড়টা পেরোতেই তিনি জিনিসটা দেখতে পেলেন। একটা অতিকায় উপুড় করা কাঁচের বাটির মতো জিনিস সমস্ত ডোবাটাকে আচ্ছাদন করে পড়ে আছে এবং তার প্রায়-স্বচ্ছ ছাউনির ভিতর থেকে একটা তীব্র অথচ স্নিগ্ধ গোলাপি আলো বিচ্ছুরিত হয়ে চতুর্দিকের বনকে আলো করে দিয়েছে।
এমন অদ্ভুত দৃশ্য বঙ্কুবাবু স্বপ্নেও কখনও দেখেননি।
অবাক বিস্ময়ে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকার পর বঙ্কুবাবু লক্ষ করলেন যে, জিনিসটা স্থির হলেও যেন নির্জীব নয়। অল্প অল্প স্পন্দনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। নিশ্বাস-প্রশ্বাসে মানুষের বুক যেমন ওঠে-নামে, কাঁচের টিবিটা তেমনই উঠছে-নামছে।
বঙ্কুবাবু ভাল করে দেখবার জন্য আর হাত চারেক এগিয়ে যেতেই হঠাৎ যেন তাঁর শরীরে বিদ্যুৎপ্রবাহ খেলে গেল। আর তার পরমুহূর্তেই তিনি অনুভব করলেন যে, তাঁর হাত-পা যেন কোনও অদৃশ্য বন্ধনে বেঁধে ফেলা হয়েছে। তাঁর শরীরে আর শক্তি নেই। তিনি না পারেন এগোতে, না পারেন পিছোতে।
কিছুক্ষণ এইভাবে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে বঙ্কুবাবু দেখলেন যে, জিনিসটার স্পন্দন আস্তে আস্তে থেমে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে গেল সেই অদ্ভুত কানে-তালালাগার শব্দটা। তারপর হঠাৎ রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে, কতকটা মানুষের মতো কিন্তু অত্যন্ত মিহি গলায় চিৎকার এল–মিলিপিপ্পিং খ্রুক, মিলিপিপ্পিং খ্রুক!
বঙ্কুবাবু চমকে গিয়ে থ’। এ আবার কী ভাষা রে বাবা! আর যে বলছে সেই বা কোথায়?
দ্বিতীয় চিৎকার শুনে বঙ্কুবাবুর বুকটা ধড়াস করে উঠল।
‘হু আর ইউ? হু আর ইউ?’
এ যে ইংরিজি! হয়তো তাঁকেই জিজ্ঞেস করা হচ্ছে প্রশ্নটা।
বঙ্কুবাবু ঢোক গিলে বলে উঠলেন, “আই অ্যাম বঙ্কুবিহারী দত্ত স্যার–বঙ্কুবিহারী দত্ত।
প্রশ্ন এল, ‘আর ইউ ইংলিশ? আর ইউ ইংলিশ?’
বঙ্কুবাবু চেঁচিয়ে বললেন, ‘নো স্যার। বেঙ্গলি কায়স্থ স্যার।
একটুক্ষণ চুপচাপের পর পরিষ্কার উচ্চারণে কথা এল, নমস্কার।
বঙ্কুবাবু হাঁফ ছেড়ে বললেন, নমস্কার। বলার সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ করলেন যে, তাঁর হাত-পায়ের অদৃশ্য বাঁধনগুলো যেন আপনা থেকেই আলগা হয়ে গেল। তিনি ইচ্ছা করলেই পালাতে পারেন, কিন্তু পালালেন না। কারণ তিনি দেখলেন, সেই অতিকায় কাঁচের ঢিবির একটা অংশ আস্তে আস্তে দরজার মতো খুলে যাচ্ছে।
সেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল প্রথমে একটা মসৃণ বলের মতো মাথা, তারপর একটা অদ্ভুত প্রাণীর সমস্ত শরীরটা।
লিকলিকে শরীরের মাথা বাদে সমস্তটাই একটা চকচকে গোলাপি পোশাকে ঢাকা।
মুখের মধ্যে কান ও নাকের জায়গায় দুটো করে এবং ঠোঁটের জায়গায় একটা ফুটো। লোম বা চুলের লেশমাত্র নেই। হলদে গোলগাল চোখদুটো এমনই উজ্জ্বল যে, দেখলে মনে হয় আলো জ্বলছে।
লোকটা আস্তে আস্তে বন্ধুবাবুর দিকে এগিয়ে এসে তাঁর তিন হাত দুরে থেকে তাঁকে একদৃষ্টে দেখতে লাগল। বন্ধুবাবুর হাতদুটো আপনা থেকেই জোড় হয়ে এল।
প্রায় এক মিনিট দেখার পর লোকটা সেইরকম বাঁশির মতো মিহি গলায় বলল, তুমি মানুষ?
বঙ্কুবাবু বললেন, হুঁ।
লোকটা বলল, ‘এটা পৃথিবী?’
বঙ্কুবাবু বললেন, হুঁ।
‘ঠিক ধরেছি–যন্ত্রপাতিগুলো গোলমাল করছে। যাবার কথা ছিল প্লুটোয়। একটা সন্দেহ ছিল মনে, তাই তোমাকে প্রথমে প্লটোর ভাষায় প্রশ্ন করলাম। যখন দেখলাম তুমি উত্তর দিলে না তখন বুঝতে পারলাম যে, পৃথিবীতেই এসে পড়েছি। পণ্ডশ্রম হল। ছি-ছি-ছি, এতদূরে এসে। আরেকবার এরকম হয়েছিল। বুধ যেতে বৃহস্পতি গিয়ে পড়েছিলাম। একদিনের তফাত আর কি, হেঃ হেঃ হেঃ।’
বন্ধুবাবু কী বলবেন বুঝতে পারলেন না। তা ছাড়া ওঁর এমনিতেই অসোয়াস্তি লাগছিল। কারণ লোকটা সরু সরু আঙুল দিয়ে ওঁর হাত-পা টিপে টিপে দেখতে আরম্ভ করেছে।
টেপা শেষ করে লোকটা বলল, ‘আমি ক্রেনিয়াস গ্রহের অ্যাং। মানুষের চেয়ে অনেক উচ্চস্তরের প্রাণী।’
এই লিকলিকে চার ফুট লোকটা মানুষের চেয়ে উচ্চস্তরের প্রাণী? বললেই হল? বঙ্কুবাবুর হাসি পেল।
লোকটা কিন্তু আশ্চর্যভাবে বন্ধুবাবুর মনের কথা বুঝে ফেলল। সে বলল, ‘অবিশ্বাস করার কিছু নেই। প্রমাণ আছে।…তুমি ক’টা ভাষা জানো?
বন্ধুবাবু মাথা চুলকিয়ে বললেন, বাংলা, ইংরিজি, আর ইয়ে…হিন্দিটা…মানে…’
‘মানে আড়াইটে।’
‘হ্যাঁ…’
‘আমি জানি চোদ্দো হাজার। তোমাদের সৌরজগতে এমন ভায়া নেই যা আমি জানি না। তা ছাড়া আরও একত্রিশটি বাইরের গ্রহের ভাষা আমার জানা আছে। এর পঁচিশটি গ্রহে আমি নিজে গিয়েছি। তোমার বয়স কত?
‘পঞ্চাশ।’
‘আমার আটশো তেত্রিশ। তুমি জানোয়ার খাও?’
বঙ্কুবাবু এই সেদিন কালীপুজোয় পাঁঠার মাংস খেয়েছেন–না বলেন কী করে।
অ্যাং বলল, ‘আমরা খাই না। বেশ কয়েকশো বছর হল ছেড়ে দিয়েছি। আগে খেতাম। হয়তো তোমাকেও খেতাম।’
বঙ্কুবাবু ঢোক গিললেন।
‘এই জিনিসটা দেখছ?’
অ্যাং একটা নুড়িপাথরের মতো ছোট জিনিস বঙ্কুবাবুর হাতে দিল। সেটা হাতে ঠেকতেই বন্ধুবাবুর ধ্বাঙ্গে আবার এমন একটা শিহরণ খেলে গেল যে, তিনি তৎক্ষণাৎ ভয়ে পাথরটা ফেরত দিয়ে এলেন।
অ্যাং হেসে বলল, ‘এটা আমার হাতে ছিল বলে তুমি তখন এগোতে পারোনি। কেউ পারে না। শত্রুকে জখম না করে অক্ষম করার মতো এমন জিনিস আর নেই।’
