রামকানাই-এর বয়সটা কম। সে বলল, আমার না হোক, মানুষের তো। সবার উপরে মানুষ সত্য।
চণ্ডীবাবু বললেন, ‘রাখো রাখো। যতসব…মানুষ না তো কি বাঁদরে বানাবে স্যাটিলাইট? মানুষ ছাড়া আর আছে কী?’
নিধু মোক্তার বললেন, আচ্ছা বেশ। স্যাটিলাইটের কথা ছেড়েই দিলাম। তাতে না-হয় লোকটোক নেই, কেবল একটা যন্ত্র পাক খাচ্ছে। তা সে তো লাট্টও পাক খায়। সুইচ টিপলে পাখাও ঘোরে। যাকগে। কিন্তু রকেট? রকেটের ব্যাপারটা তো নেহাত ফেলনা নয় ভায়া!
চণ্ডীবাবু নাক সিটকে বললেন, ‘রকেট! রকেট ধুয়ে কোন জলটা খাবে শুনি? রকেট! তাও বুঝতাম যদি হ্যাঁ, এই আমাদের দেশেই তৈরি হল, গড়ের মাঠ থেকে ছাড়লে সেটা চাঁদে-টাঁদে তাগ করে, আমরা গিয়ে টিকিট কিনে দেখে এলুম, তাও একটা মানে হয়।‘
রামকানাই বলল, ‘ঠিক বলেছেন। আমাদের কাছে রকেটও যা, ঘোড়ার ডিমও তাই।’
ভৈরব চক্কোত্তি বললেন, ধরো যদি অন্য গ্রহ-ট্রহ থেকে একটা কিছু পৃথিবীতে এল…’
‘এলেই বা কী? তুমি-আমি তো আর সেটাকে দেখতে পার না।‘
‘তা বটে!’
আড্ডার সবাই চায়ের পেয়ালায় মুখ দিলেন। এর পর তো আর কথা চলে না।
এই অবসরে বন্ধুবাবু খুক করে একটু কেশে নিয়ে মৃদুস্বরে বললেন, ‘ধরুন যদি এইখানেই আসে। নিধুবাবু অবাক হবার ভান করে বললেন, বাঁকা আবার কী বলছে হে, অ্যাঁ? কে আসবে এইখানে? কোত্থেকে আসবে?
বঙ্কুবাবু আবার মৃদুস্বরে বললেন, ‘অন্য গ্রহ থেকে কোনও লোক-টোক…’
ভৈরব চক্কোত্তি তাঁর অভ্যাসমতো বঙ্কুবাবুর পিঠে একটা অভদ্র চাপড় মেরে দাঁত বার করে বললেন, ‘বাঃ বঙ্কুবিহারী, বাঃ! অন্য গ্রহ থেকে লোক আসবে এইখানে? এই গণ্ডগ্রামে? লন্ডন নয়, মস্কো নয়, নিউ ইয়র্ক নয়, মায় কলকেতাও নয়–একেবারে এই কাঁকুড়গাছি? তোমার তো শখ কম নয়!’
বন্ধুবাবু চুপ করে গেলেন। কিন্তু তাঁর মন বলতে লাগল, সেটা আর এমন অসম্ভব কী? বাইরে থেকে যারা আসবে, তাদের তো পৃথিবীতে আসা নিয়ে কথা। অত যদি হিসেব করে নাই আসে? কাঁকুড়গাছিতে না-আসা যেমন সম্ভব, আসাও তো ঠিক তেমনই সম্ভব।
শ্রীপতিবাবু এতক্ষণ কিছু বলেননি। এবার তিনি নড়েচড়ে বসতেই সকলে তাঁর মুখের দিকে চাইল। তিনি চায়ের পেয়ালাটা নামিয়ে রেখে বিজ্ঞের মতো ভারী গলায় বললেন, ‘দেখো, বাইরের গ্রহ থেকে যদি লোক আসেই, তবে এটা জেনে রেখো যে তারা এই পোড়া দেশে আসবে না। তাদের তো খেয়েদেয়ে কাজ নেই। আর অত নোকা তারা নয়। আমার বিশ্বাস তারা সাহেব, এবং এসে নামবে ওই সাহেবদেরই দেশে পশ্চিমে। বুঝেছ?’
এ-কথায় এক বন্ধুরাবু ছাড়া সকলেই একবাক্যে সায় দিলেন।
চণ্ডীবাবু নিধু মোক্তারের কোমরে খোঁচা মেরে ইশারায় বন্ধুবাবুকে দেখিয়ে ন্যাকা-ন্যাকা গলায় বললেন, আমার কিন্তু বাবা মনে হয় যে, বন্ধু ঠিকই বলেছেন। বঙ্কুবিহারীর মতো লোক যেখানে আছে সেখানে আসাই তো তাদের পক্ষে স্বাভাবিক। কী বলল নিধু? ধরো যদি একটা স্পেসিমেন নিয়ে যেতে হয়, তা হলে বন্ধুর মতো দ্বিতীয় মানুষ কোথায় পাচ্ছে শুনি?
নিধু মোক্তার সায় দিয়ে বললেন, ‘ঠিক ঠিক। বুদ্ধিবলো, চেহারা বলল, যাই বলো, ব্যাঁকা একেবারে আইডিয়াল।’
রামকানাই বলল, একেবারে জাদুঘরে রাখার মতো। কিংবা চিড়িয়াখানায়। বঙ্কুবাবু মনে মনে বললেন, স্পেসিমেন যদি বলতে হয় তো এঁরাই বা কী কম? ওই তো শ্রীপতিবাবু উটের মতো থুতনি। আর ওই ভৈরব চক্কোত্তিকচ্ছপের মতো চোখ, ওই নিধু মোক্তার ছুঁচো, রামকানাই ছাগল, চণ্ডীবাবু–চামচিকে। চিড়িয়াখানায় যদি রাখতে হয় তো…
বন্ধুবাবুর চোখে জল এল। তিনি উঠে পড়লেন। আজ অন্তত আড্ডাটা ভাল লাগবে ভেবেছিলেন। হল না। মনটা ভারী হয়ে গেছে। আর থাকা চলে না!
‘সে কী, উঠলে নাকি হে? শ্রীপতিবাবু যেন ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
‘হ্যাঁ, রাত হল।’
‘কই রাত? কাল তো ছুটি! বোসো, চা খাও।’
‘না। আজ আসি। পরীক্ষার খাতা আছে কিছু। নমস্কার।’
রামকানাই বলল, দেখবেন বন্ধুদা। আজ আবার অমাবস্যা। মঙ্গলবার। মানুষ কিন্তু ভূতেরও বাড়া।
.
বঙ্কুবাবু আলোটা দেখতে পেলেন পঞ্চা ঘোষের বাঁশবাগানের মাঝবরাবর এসে। তাঁর নিজের হাতে আলো ছিল না। শীতকাল, তাই সাপের ভয় নেই। তা ছাড়া পথও খুব ভাল ভাবেই চেনা। এ পথে এমনিতে বড় একটা কেউ আসে না, কিন্তু বন্ধুবাবুর শর্টকাট হয় বলেই তিনি এই পথে যান।
কিছুক্ষণ থেকেই তাঁর কেমন জানি খটকা লাগছিল। অন্যদিনের চেয়ে কী-জানি একটা অন্যরকম ভাব। কিন্তু সেটা যে কী, তা বুঝতে পারছিলেন না। হঠাৎ খেয়াল হল যে, বাঁশবনে আজ ঝিঁঝি ডাকছে না। একদম না। সেইটেই তফাত। অন্যদিন যতই বনের ভিতর ঢোকেন ততই ঝিঁঝির ডাক বাড়ে। আজ ঠিক তার উলটো। তাই এমন থমথমে ভাব। ব্যাপার কী? ঝিঁঝিগুলো সব ঘুমোচ্ছে নাকি?
ভাবতে ভাবতে হাত বিশেক গিয়ে পুব দিকে চোখ যেতেই আলোটা দেখতে পেলেন।
প্রথমে মনে হল বুঝি আগুন লেগেছে। বনের মধ্যিখানের ফাঁকটায় যেখানে ডোবাটা রয়েছে তার। চারপাশের বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে গাছের ডালে ও পাতায় একটা গোলাপি আভা। আর নীচে, ডোবার সমস্ত জায়গাটা জুড়ে উজ্জ্বল গোলাপি আলো। কিন্তু আগুন নয়, কারণ আলোটা স্থির।
বঙ্কুবাবু এগোতে লাগলেন। কানের মধ্যে একটা শব্দ আসছে। কিন্তু সেটা যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। হঠাৎ কানে তালা লাগলে যেমন শব্দ হয়–রী রী রী রী–এ যেন ঠিক সেইরকম।
