বঙ্কুবাবু এবার সত্যিই অবাক হতে শুরু করেছেন।
অ্যাং বলল, ‘এমন কোনও জায়গা বা দৃশ্য আছে যা তোমার দেখতে ইচ্ছে করে, কিন্তু হয়ে ওঠে না?’
বঙ্কুবাবু ভাবলেন, সারা পৃথিবীটাই তো দেখা বাকি। ভূগোল পড়ান, অথচ বাংলাদেশের গুটিকতক এম ও শহর ছাড়া আর কী দেখেছেন তিনি? বাংলাদেশেরই কী দেখেছেন? হিমালয়ের বরফ দেখেননি, দিঘার সমুদ্র দেখেননি, সুন্দরবনের জঙ্গল দেখেননি, এমনকী শিবপুরের বাগানের সেই বটগাছটা পর্যন্ত দেখেননি।
মুখে বললেন, অনেক কিছুই তো দেখিনি। ধরুন গরম দেশের মানুষ, তাই নর্থ পোলটা দেখতে খুব ইচ্ছে করে।
অ্যাং একটা ছোট কাচ-লাগানো নল বার করে বন্ধুবাবুর মুখের সামনে ধরে বলল, ‘এইটেয় চোখ লাগাও।’
চোখ লাগাতেই বঙ্কুবাবুর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। এও কী সম্ভব? তাঁর চোখের সামনে ধু-ধু করছে অন্তহীন বরফের মরুভূমি, তার মাঝে মাঝে মাথা উঁচিয়ে আছে পাহাড়ের মতো এক-একটা বরফের চাই। উপরে গাঢ় নীল আকাশে রামধনুর রঙে রঙিন বিচিত্র নকশা সব ক্ষণে ক্ষণে রূপ পালটাচ্ছে–অরোরা বোরিয়ালিস। ওটা কী? ইগলু! ওই পোলার বেয়ারের সারি। ওই পেঙ্গুইনের দল। ওটা কোন বীভৎস জানোয়ার? ভাল করে দেখে বঙ্কু চিনলেন–সিন্ধুঘোটক। একটা নয়, দুটো–প্রচণ্ড লড়াই সলছে। মুলোর মতো জোড়া দাঁত একটা আর-একটার গায়ে বসিয়ে দিল। শুভ্র বরফের গায়ে লাল রক্তের স্রোত!…
পৌষ মাসের শীতে বরফের দৃশ্য দেখে বঙ্কুবাবুর ঘাম ঝরতে শুরু করল।
অ্যাং বলল, ‘ব্রেজিলে যেতে ইচ্ছে করে না?’
বঙ্কুবাবুর মনে পড়ে গেল–সেই মাংসখেকো পিরানহা মাছ। আশ্চর্য। লোকটা তাঁর মনের কথা টের পায় কী করে?
বঙ্কুবাবু আবার চোখ লাগালেন।
গভীর জঙ্গল। দুর্ভেদ্য অন্ধকারে লতাপাতার ফাঁক দিয়ে গলে আসা ইতস্তত রোদের ছিটেফোঁটা, একপাশে একটা প্রকাণ্ড গাছ, তা থেকে ঝুলছে ওটা কী? সর্বনাশ! এতবড় সাপ বঙ্কুবাবু জীবনে কখনও কল্পনাও করতে পারেননি। হঠাৎ তাঁর মনে পড়ে গেল কোথায় যেন পড়েছেন ব্রেজিলের অ্যানাকোন্ডা। অজগরের বাবা। কিন্তু মাছ কই? ওই যে একটা খাল। দু’পাশে ডাঙায় কুমির রোদ পোয়াচ্ছে। সার সার কুমির–তার একটা নড়ে ওঠে। জলে নামবে। ওই নেমে গেল সড়াত বন্ধুবাবু যেন শব্দটাও শুনতে। পেলেন। কিন্তু এ কী ব্যাপার? কুমিরটা এমন বিদ্যুদ্বেগে জল ছেড়ে উঠে এল! কেন? কিন্তু এ কি সেই একই কুমির? বঙ্কুবাবু বিস্ফারিত চোখে দেখলেন যে, কুমিরটার তলার অংশটায় মাংস বলে প্রায় কিছুই নেই, খালি হাড়। আর শরীরের বাকি অংশটা গোগ্রাসে গিলে চলেছে পাঁচটি দাঁতালো রাক্ষুসে মাছ। পিরানহা মাছ।
বঙ্কুবাবু আর দেখতে পারলেন না। তাঁর হাত-পা কাঁপছে, মাথা ভোঁ ভোঁ করছে।
অ্যাং বলল, ‘এখন বিশ্বাস হয় আমরা শ্রেষ্ঠ?’
বঙ্কুবাবু জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে বললেন, ‘তা তো বটেই! নিশ্চয়ই। বিলক্ষণ। একশোবার।’
অ্যাং বলল, ‘বেশ। তোমায় দেখে এবং তোমার হাত-পা টিপে মনে হচ্ছে যে তুমি নিকৃষ্ট প্রাণী হলেও, মানুষ হিসেবে খারাপ নও। তবে তোমার দোষ হচ্ছে যে তুমি অতিরিক্ত নিরীহ, তাই তুমি জীবনে উন্নতি করোনি। অন্যায়ের প্রতিবাদ না করা বা নীরবে অপমান সহ্য করা এসব শুধু মানুষ কেন, কোনও প্রাণীরই শোভা পায় না। যাক, তোমার সঙ্গে আলাপ হবার কথা ছিল না, হয়ে ভালই লাগল। তবে পৃথিবীতে বেশি সময় নষ্ট করে লাভ নেই। আমি বরং আসি।’
বঙ্কুবাবু বললেন, আসুন অ্যাংবাবু। আমিও আপনার সঙ্গে আলাপ করে খুব
বঙ্কুবাবুর কথা আর শেষ হল না, চক্ষের পলকে কখন যে অ্যাং রকেটে উঠে পড়ল এবং কখন যে সেই রকেট পঞ্চা ঘোষের বাঁশবন ছেড়ে উপরে উঠে অদৃশ্য হয়ে গেল, তা যেন বঙ্কুবাবু টেরই পেলেন না। হঠাৎ তাঁর খেয়াল হল যে, আবার ঝিঁঝি ডাকতে শুরু করেছে। রাত হয়ে গেল অনেক।
বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করে বন্ধুবাবু তাঁর মনে একটা আশ্চর্য ভাব অনুভব করলেন। কতবড় একটা ঘটনা যে তাঁর জীবনে ঘটে গেল, এই কিছুক্ষণ আগেও তিনি সেটা ঠিক উপলব্ধি করতে পারেননি। কোথাকার কোন সৌরজগতের এক গ্রহ, তার নামও হয়তো কেউ শোনেনি, তারই একজন লোক–লোক তো নয়, অ্যাং–তাঁর সঙ্গে এসে আলাপ করে গেল। কী আশ্চর্য! কী অদ্ভুত! সারা পৃথিবীতে আর কারও সঙ্গে নয়, কেবল তাঁর সঙ্গে। তিনি, শ্রীবঙ্কুবিহারী দত্ত, কাঁকুড়গাছি প্রাইমারি ইস্কুলে ভূগোল ও বাংলার শিক্ষক। আজ, এই এখন থেকে অন্তত একটা অভিজ্ঞতায়, তিনি সারা পৃথিবীতে এক ও অদ্বিতীয়।
.
পরদিন রবিবার। শ্রীপতিবাবুর বাড়িতে জোর আড্ডা। কালকের আলোর খবর আজ কাগজে বেরিয়েছে, তবে নেহাতই নগণ্যের পর্যায়ে। বাংলাদেশের মাত্র দু-একটা জায়গা থেকে আলোটা দেখতে পাবার খবর এসেছে। তাই সেটাকে ফ্লাইং সসার বা উড়ন্ত পিরিচের মতো গুজবের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
আজ পঞ্চা ঘোষ আড্ডায় এসেছেন। তাঁর চল্লিশ বিঘের বাঁশবনের মধ্যে যে ডোবাটা আছে, তার চারপাশের দশটা বাঁশঝাড় নাকি রাতারাতি একেবারে নেড়া হয়ে গেছে। শীতকালে বাঁশের শুকনো পাতা ঝরে বটে, কিন্তু এইভাবে হঠাৎ নেড়া হয়ে যাওয়াটা খুবই অস্বাভাবিক, এই বিষয়েই কথা হচ্ছিল, এমন সময় ভৈরব চক্কোত্তি হঠাৎ বলে উঠলেন, আজ বন্ধুর দেরি কেন?
তাই তো, এতক্ষণ কারও খেয়াল হয়নি।
