রঞ্জনবাবুর বিস্ময়ের ভাবটা কেটে গেছে। তবে এখনও ধৈর্যচ্যুতি হয়নি। মাতালের ব্যাপারে ধৈর্যহারা হলে চলে না। সুস্থ অবস্থায় এ সাহেব কখনওই এ ধরনের কথাবার্তা বলতে পারত না।
রঞ্জনবাবু সংযতভাবে বললেন, তুমি যেভাবে কথা বলছে, সেরকম কিন্তু আজকাল আর কোনও সাহেব বলে না। ভারতবর্ষ আজ বছর পঁচিশেক হল স্বাধীন হয়েছে সেটা বোধহয় তুমি জানো।
হোয়াট?
কথাটা বলেই সাহেব রঞ্জনবাবুকে চমকে দিয়ে ট্রেনের শব্দ ছাপিয়ে হো হো করে অট্টহাস্য করে উঠলেন।
কী বললে তুমি? ভারত স্বাধীন হয়েছে? কবে?
নাইনটিন ফর্টি সেভন। অগাস্ট দ্য ফিফটিন্থ।
কথাটা বলতে গিয়ে রঞ্জনবাবুর হাসি পাচ্ছিল। স্বাধীনতার এতদিন পরে নিজের দেশে বসে কাউকে তারিখ সমেত খবরটা দিতে হচ্ছে, এটা একটা কমিক ব্যাপার বইকী!
ইউ মাস্ট বি ম্যাড!
আমি ম্যাড নই সাহেব, বললেন রঞ্জনবাবু। আমার মনে হয় তোমার নেশাটা একটু বেশি হয়েছে?
বটে?
সাহেব হঠাৎ তাঁর ডান দিকে বেঞ্চির উপর থেকে একটা জিনিস তুলে নিলেন।
রঞ্জনবাবু সভয়ে দেখলেন সেটা একটা রিভলভার, আর সেটা সটান তাঁরই দিকে তাগ করা।
সি দিস? বললেন সাহেব। আমি আর্মির লোক। আমার নাম মেজর ড্যাভেনপোর্ট। সেকেন্ড পাঞ্জাব রেজিমেন্ট। আমার মতো অব্যর্থ নিশানা আর কারুর নেই আমার রেজিমেন্টে। আমার হাত কাঁপছে কি? তোমার শার্টের তৃতীয় বোতামের ডান দিকে আমার লক্ষ্য। ঘোড়া টিপলে সেইখান দিয়ে গুলি ঢুকে সোজা জানলা দিয়ে বেরিয়ে যাবে। তোমার আর কোনও অস্তিত্ব থাকবে না। ভাল চাও তো বেরিয়ে পড়ো। একে তো নিগার। তার উপরে উন্মাদ, এটা কত সাল জানো? নাইনটিন থার্টিটু। আমাদের অনেক উত্ত্যক্ত করেছে তোমাদের ওই নেংটি পরা নেতা। স্বাধীনতার স্বপ্ন তোমরা দেখতে পারো, কিন্তু সেটা বাস্তবে পরিণত হবে না কখনওই।
এবার সত্যিই প্রলাপ বকছেন সাহেব। উনিশশো সত্তর হয়ে গেল নাইনটিন থার্টিটু? নেংটি পরা নেতা গান্ধিজি মারা গেছেন তাও হয়ে গেছে তেইশ বছর।
কাম অন নাউ, গেট আপ।
সাহেব উঠে দাঁড়িয়েছেন। রঞ্জনবাবু লক্ষ করলেন তাঁর পা টলছে না। সবে শুরু করলেন কি তা হলে মদ খেতে? কিন্তু এত উলটোপালটা বকছেন কেন? উনিই কি তা হলে উন্মাদ?
আপ! আপ!
রঞ্জনবাবুর গলা শুকিয়ে গেছে। তিনি সিট ছেড়ে মেঝেতে নামতে বাধ্য হলেন। সেই সঙ্গে প্রায় তাঁর অজান্তেই তাঁর হাত দুটো উপরের দিকে উঠে গেল।
নাউ টার্ন রাউন্ড অ্যান্ড গো টু দ্য ডোর।
সাহেব বলে কী? কমপক্ষে ষাট মাইল বেগে চলেছে মেল ট্রেন। তিনি কি চলন্ত অবস্থায় তাঁকে গাড়ি থেমে নামিয়ে দিতে চান?
এই অবস্থাতেও কোনওমতে একটি কথা উচ্চারণ করতে সমর্থ হলেন রঞ্জনবাবু।
শুনুন মেজর ড্যাভেনপোর্ট–এর পরেই টাটানগর, গাড়ি থামলে আমি যাব অন্য কামরায়–কথা দিচ্ছি। চলন্ত গাড়ি থেকে নামিয়ে আমাকে মেরে ফেলে আপনার কী লাভ?
টাটানগর? ও নামে কোনও স্টেশন নেই। তুমি আবার আবোল তাবোল বকচ্ছ।
রঞ্জনবাবু বুঝলেন যে, এটা উনিশশো বত্রিশ সাল সেটা যদি সাহেব বিশ্বাস করে বসে থাকেন তা হলে অবিশ্যি টাটানগর বলে কোনও স্টেশন থাকার কথা নয়। এখানে প্রতিবাদ করাটা খুব বুদ্ধিমানের কাজ হবে না বলে বললেন, ঠিক আছে, মেজর ড্যাভেনপোর্ট, আমারই ভুল। তবে এর পর অন্য যে কোনও স্টেশনে গাড়ি থামুক, আমি নেমে যাব। ঘণ্টাখানেকের বেশি তোমার নিগারের সঙ্গ বরদাস্ত করতে হবে না, কথা দিচ্ছি।
সাহেব যেন একটু নরম হয়ে বললেন, মনে থাকে যেন, কথার নড়চড় হলে তোমার লাশ পড়ে থাকবে লাইনের ধারে, এটা বলে দিলাম।
সাহেব গিয়ে তাঁর জায়গায় বসে হাত থেকে রিভলভার নামিয়ে রাখলেন বেঞ্চির এক পাশে। রঞ্জনবাবু এ যাত্রা প্রাণে মরেননি এটা ভেবে খানিকটা ভরসা পেয়ে নিজের জায়গায় গিয়ে বসলেন। সাহেব যাই বলুন, এর পরের স্টেশন যে টাটানগর সেটা রঞ্জনবাবু জানেন। আসতে আরও এক ঘণ্টা দেরি। এই সময়টুকু তিনি এই কামরাতেই আছেন। তারপর কপালে কী আছে জানা নেই। অন্য ফাস্ট ক্লাস কামরায় জায়গা পাবেন কী? সেটা জানা নেই। জানার উপায়ও নেই।
ড্যাভেনপোর্ট সাহেব আবার মদ্যপান শুরু করেছেন। সাময়িকভাবে তাঁর সামনের বেঞ্চের যাত্রীর কথাটা তিনি যেন ভুলেই গেছেন। রঞ্জনবাবু আধ বোজা চোখে চেয়ে রয়েছেন তাঁর দিকে। এমন এক বিভীষিকাময় ঘটনার মধ্যে তাঁকে পড়তে হবে কে জানত? পুলকেশ থাকলে এ জিনিস ঘটত কী? না, তা ঘটত না। তবে এর চেয়েও সাংঘাতিক কিছু ঘটতে পারত। পুলকেশ রগচটা মানুষ। তা ছাড়া শারীরিক শক্তি রাখে যথেষ্ট। তার দেশাত্মবোধ প্রবল। কোনও সাদা চামড়ার কাছ থেকে অপমান হজম করার লোক সে নয়। হয়তো ধাঁ করে একটা ঘুষিই লাগিয়ে দিত। কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় এক গোরাকে ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে দেওয়ার গল্প সে এখনও করে।
ট্রেন চলেছে রাতের অন্ধকার ভেদ করে। মিনিটদশেক পরে রঞ্জনবাবু অনুভব করলেন যে, এই বিপদের মধ্যেও গাড়ির দোলানিতে তাঁর মাঝে মাঝে একটা তন্দ্রার ভাব আসছে।
এই অবস্থাতেই একটা নতুন চিন্তা তাঁকে হঠাৎ সম্পূর্ণ সজাগ করে দিল।
সাহেবের কোনও মালপত্র নেই। ব্যাপারটা অদ্ভুত নয় কী? একটা সামান্য হাত-বাক্সও কি থাকবে না? শুধু মদ, সোডার বোতল, গেলাস আর রিভলভার নিয়ে কি কেউ ট্রেনে ওঠে?
