আর উনিশশো বত্রিশ সাল, নেংটি পরা নেতা, টাটানগর নেই–এসবেরই বা মানে কী?
মানে কি তা হলে একটাই যে, সাহেব আসলে জ্যান্ত সাহেব নন, তিনি ভূত?
মেজর ড্যাভেনপোর্ট নামটা কি চেনা চেনা লাগছে?
হঠাৎ ধাঁ করে রঞ্জনবাবুর একটা কথা মনে পড়ে গেল।
বছর পাঁচেক আগে ব্যারিস্টার বন্ধু নিখিল সেনের বাড়িতে আড্ডায় কথা হচ্ছিল। বিষয়টা সাহেব প্রীতি এবং সাহেব বিদ্বেষ। কে বলেছিল ঠিক মনে নেই, কিন্তু বোম্বে মেলেই একবার এক বাঙালিকে ফার্স্ট ক্লাস কামরা থেকে নামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল এক গোরা সৈনিক। নামটা মেজর ড্যাভেনপার্টই বটে! কাগজে বেরিয়েছিল খবরটা। সালটা জানা নেই, তবে থার্টিটু হওয়া আশ্চর্য না। সাহেবের হিসেবে একটু ভুল হয়েছিল। সেই বাঙালি ছিলেন অসীম সাহস ও দৈহিক শক্তির অধিকারী। অপমান হজম করতে না পেরে সাহেবকে মারেন এক বিরাশি সিক্কা ওজনের ঘূষি। সাহেব উলটে পড়েন এবং বেঞ্চির হাতলে মাথায় চোট লেগে তৎক্ষণাৎ মারা যান।
রঞ্জনবাবু অনুভব করলেন তাঁর হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। কিন্তু এই অবস্থাতেও সামনের লোকটার দিকে আর একবার না চেয়ে থাকতে পারলেন না তিনি।
মেজর ড্যাভেনপোর্ট হাতে গেলাস নিয়ে বসে আছেন। নাইট লাইটের আলো এমনিতেই উজ্জ্বল নয়; আলোর শেডও অপরিষ্কার, বালবের পাওয়ারও বেশি নয়। তার উপর গাড়ির ঝাঁকুনি। সব মিলিয়ে সাহেবের দেহটাকে অস্পষ্ট দেখাচ্ছে। হয়তো এই কামরাতেই সাহেবের মৃত্যু হয়েছিল–১৯৩২ সালে। আর তখন থেকেই এই পুরনো আমলের ফার্স্ট ক্লাস কামরায় রোজ রাত্তিরে…
রঞ্জনবাবু আর ভাবতে পারলেন না। সাহেব আর তাঁর দিকে দৃকপাত করছেন না; তিনি মদ নিয়ে মশগুল হয়ে বসে আছেন।
চেয়ে থাকতে থাকতে রঞ্জনবাবু অনুভব করলেন যে, তাঁর চোখের পাতা আবার ভারী হয়ে আসছে। ভূতের সামনে মানুষের ঘুম পেতে পারে এটা তিনি প্রথম আবিষ্কার করলেন। মেজর ড্যাভেনপোর্ট একবার নেই, একবার আছেন। অর্থাৎ চোখের পাতা বন্ধ হলে নেই, আবার খুললেই আছেন। একবার যেন সাহেব তাঁর দিকে চাইলেন। তারপর যেন বহুদূর থেকে ভেসে আসা একটা কথা বারকয়েক এল তাঁর কানে–ডার্টি নিগার…ডার্টি নিগার…
তারপর রঞ্জনবাবুর আর কিছু মনে নেই।
.
রঞ্জনবাবুর যখন ঘুম ভাঙল তখন জানলার বাইরে ভোরের আলো। সামনের বেঞ্চে কেউ নেই। রাত্রের বিভীষিকার কথা ভেবে তিনি একবার শিউরে উঠলেন, কিন্তু পরক্ষণেই ফাঁড়া কেটে গেছে বুঝতে পেরে হাঁফ ছাড়লেন। এ গল্প কাউকে বলা যাবে না। প্রথমত, কেউ বিশ্বাস করবে না; দ্বিতীয়ত, তিনি যে সাহেব ভূতের হাতে লাঞ্ছনা ভোগ করেছেন এটা খুব জাহির করে বলার ঘটনা নয়। ডার্টি নিগার। কথাটা তাঁর আঁতে লেগেছিল বিশেষ ভাবে, কারণ তাঁর নিজের রঙ রীতিমতো ফরসা। অনেক রোদে পোড়া সাহেবের চেয়ে বেশি ফরসা। এই রঙের জন্য লন্ডনে অনেকে তাঁকে ভারতীয় বলে বিশ্বাস করেনি। আর তাঁকেই কিনা বলে ডার্টি নিগার!
সঙ্কল্প অনুযায়ী তাঁর ট্রেনের অভিজ্ঞতাটা রঞ্জনবাবু কাউকেই বলেননি। তবে তাঁর মধ্যে উগ্র সাহেবপ্রীতির ভাবটা যে অনেকটা কমেছে সেটা তাঁর কাছের লোকেরা অনেকেই লক্ষ করেছিল।
ঘটনার দশ বছর পরে একদিন সন্ধ্যায় তাঁর নিজের বাড়িতে বন্ধু পুলকেশের সঙ্গে বসে কফি খেতে খেতে রঞ্জনবাবু ব্যাপারটা উল্লেখ না করে পারলেন না।
সেভেনটিতে রায়পুর থেকে ফেরার সেই দিনটার কথা মনে পড়ে?
বিলক্ষণ।
তোমাকে বলি বলি করেও বলিনি, এক সাহেব ভূতের পাল্লায় পড়ে কী নাজেহাল হয়েছিলাম জানো না!
মেজর ড্যাভেনপোর্টের ভূত কী?
রঞ্জনবাবুর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।
সে কী? তুমি জানলে কী করে?
পুলকেশবাবু তাঁর ডান হাতটা বন্ধুর দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
মিট দ্য গোস্ট অফ মেজর ড্যাভেনপোর্ট।
রঞ্জনবাবুর মাথা ঝিমঝিম করছে।
তুমি! তা তুমি অ্যাদ্দিন–?
বলে ফেললে তো সমস্ত ব্যাপারটাই ব্যর্থ হত ভাই। আমার উদ্দেশ্য ছিল তোমার মধ্যে থেকে সাহেবপ্রীতির ভূতটা তাড়ানো। ঘটনাটা যদি তুমি বিশ্বাস না করো, তা হলে কাজটা হবে কী করে? আমি নিগার বলছি, আর সাহেব নিগার বলছে–দুটোর মধ্যে তফাত নেই?
কিন্তু কীভাবে–?
ভেরি ইজি, বললেন পুলকেশ সরকার। তোমার কামরাটা দেখেই ফন্দিটা আমার মাথায় আসে। গাড়ি ছাড়ার পর তোমার পাশের ফার্স্ট ক্লাস বগিটাতে উঠে পড়ি। আমার ফার্স্ট এড বক্স থেকে তুলে নিয়ে গোঁফ করেছিলাম। তা ছাড়া নো মেক আপ। আমারই কামরায় একটি গুজরাটি বাচ্চার হাতে দেখলাম একটা খেলার রিভলভার। এক রাতের জন্য ধার চাইতে খুশি হয়ে দিয়ে দিল। তার বাপের সঙ্গে হুইস্কি ছিল। সেটাও চেয়ে নিলাম। অবিশ্যি কেন নিচ্ছি। সেটাও বলতে হল। আমি নিজে খেয়েছি শুধু জল। হুইস্কির বোতলটা খোলা রেখেছিলাম যাতে তুমি গন্ধ পাও। ব্যস্। বাকি কাজ করেছিল তোমার কামরার নীল আলো, আর তোমার কল্পনা।… আশা করি কিছু মনে করোনি ভাই।
রঞ্জনবাবু বন্ধুর হাতটা দুহাতে চেপে ধরলেন বটে, কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারলেন না।
তাঁর বিস্ময় ভাবটা কাটতে লাগবে আরও দশ বছর।
সন্দেশ, পৌষ ১৩৮৮
ফ্রিৎস
জয়ন্তর দিকে মিনিটখানেক তাকিয়ে থেকে তাকে প্রশ্নটা না করে পারলাম না।
তোকে আজ যেন কেমন মনমরা মনে হচ্ছে? শরীর-টরীর খারাপ নয় তো?
