নটায় রায়গড় পেরোনোর পর থেকেই একটা ঘুমের আমেজ অনুভব করলেন রঞ্জনবাবু। বিলাসপুরে লোক এসেছিল ডিনারের অর্ডার নিতে। রঞ্জনবাবু স্বভাবতই তাকে না করে দিয়েছেন। এবারে টিফিন ক্যারিয়ার খুলে খাওয়াটা সেরে নীল লাইট ছাড়া আর সবকটা আলো নিভিয়ে দিয়ে রঞ্জনবাবু বেঞ্চিতে গা এলিয়ে দিলেন। দেওয়ামাত্র মনে পড়ল রাউরকেল্লায় যাত্রী ঢুকবে ঘরে। আজকাল করিডর ট্রেনে ফাস্ট ক্লাসে কোনও যাত্রী উঠলে কন্ডাক্টর গার্ডই তার ব্যবস্থা করে দেয়। এই পুরনো গাড়িতে তাঁকেই উঠে দরজা খুলতে হবে। তা হলে কি দরজাটা লক্ করবেন না? যদি ঘুম না ভাঙে? ক্ষতি কী লক্ না করলে? যিনি আসবেন তিনিই না হয় ল লাগিয়ে নেবেন। আর এমন কিছু মাঝরাত্তির নয় তো, রাউরকেল্লা আসে বোধহয় সাড়ে দশটা নাগাদ। চিন্তার কোনও কারণ নেই।
বেদম বেগে ছুটে চলেছে বোম্বাই মেলা কামরার দোলানিতে কারুর কারুর ভাল ঘুম হয় না, কিন্তু রঞ্জনবাবুর হয়। কোথায় যেন পড়েছিলেন যে, মা শিশুকে কোলে দোল দিয়ে ঘুম পাড়ানোর স্মৃতি শিশু বড় হলেও তার মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকে, তাই ট্রেনের দোলানিতে ঘুম পাওয়াটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। ছেলেবেলায় ফার্স্ট ক্লাসে কোরের চিকেন কারি অ্যান্ড রাইস আর কাস্টার্ড পুডিং-এর মধুর
স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে রঞ্জনবাবু নিদ্রাসাগরে তলিয়ে গেলেন।
গরম চায়? চায় গরম?
ঘুমটা ভাঙল খোলা জানলার বাইরে থেকে ফেরিওয়ালার ডাক শুনে। স্টেশন। প্ল্যাটফর্মের ল্যাম্পপোস্ট থেকে আলোর রশ্মি টেরচা ভাবে কামরায় ঢুকে তাঁর নিজের শরীর ও মেঝের খানিকটা অংশে পড়েছে।
হিন্দু চায়! হিন্দু চায়!!
কী আশ্চর্য অপরিবর্তশীল এই স্টেশনের ফেরিওয়ালার ডাক। মনে হয় একই লোক ভারতবর্ষের প্রত্যেকটি স্টেশনে ঠিক একই ভাবে ডেকে চলেছে আবহমানকাল থেকে।
জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে স্টেশনের নাম দেখতে পেলেন না রঞ্জনবাবু। রাউরকেল্লা নয় তো?
নামটা মনে পড়তেই রঞ্জনবাবুর চোখ গেল বেঞ্চির বিপরীত দিকে। একটা টুং টুং আওয়াজ কানে এসেছিল ঘুমটা ভাঙামাত্র। এবার আবছা নীল আলোয় দেখলেন একটি লোক বসে আছে বেঞ্চিতে। তার সামনে দুটো বোতল ও একটি গেলাস। গেলাসে পানীয় ঢাললেন ভদ্রলোক এইমাত্র। এবার সেই পানীয় চলে গেল তার মুখের দিকে।
মদ খাচ্ছেন নাকি সহযাত্রী? উনিই কি রাউরকেল্লায় উঠেছেন? এটা কি তা হলে চক্রধরপুর? বড় স্টেশন বলেই তো মনে হচ্ছে।
রঞ্জনবাবু আগন্তুকের দিকে চেয়ে দেখলেন। মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না, তবে একটা বেশ তাগড়াই গোঁফ রয়েছে ভদ্রলোকের, সেটা বোঝা যায়। পরনে শার্ট ও প্যান্ট, তবে নীল আলোতে তাদের রঙ বোঝা মুশকিল।
রঞ্জনবাবুকে নড়াচড়া করতে দেখেই বোধহয় আগন্তুক তাঁর সম্বন্ধে হঠাৎ সচেতন হয়ে উঠলেন। মদের গন্ধ পাচ্ছেন রঞ্জনবাবু, তাঁর নিজের ওসব বদ অভ্যাস নেই, কিন্তু চেনাশোনার মধ্যে অনেকেই ড্রিংক করে। পার্টি-টার্টিতেও যেতে হয় তাঁকে। কাজেই কোন্ পানীয়ের কী গন্ধ, সেটা মোটামুটি জানা আছে। ইনি খাচ্ছেন হুইস্কি।
ইউ দেয়ার।
সোজা রঞ্জনবাবুর দিকে মুখ করে ঘড়ঘড়ে গলায় হাঁক দিয়ে উঠলেন ভদ্রলোক।
গলা এবং উচ্চারণ শুনে রঞ্জনবাবুর বুঝতে বাকি রইল না যে যিনি উঠেছেন তিনি হচ্ছেন সাহেব। এ গলার দানাই আলাদা।
ইউ দেয়ার! আবার হাঁক দিয়ে উঠলেন অন্ধকারে বসা সাহেবটি। নেশা হয়ে গেছে এর মধ্যেই, নইলে আর এত মেজাজের কী কারণ থাকতে পারে?
আপনি কিছু বলতে চাইছেন কী? ইংরিজিতে প্রশ্ন করলেন রঞ্জনবাবু। মনে মনে বললেন পুরনো ফার্স্ট ক্লাসের সঙ্গে মানানসই বটে এই সাহেব সহযাত্রী!
ইয়েস বললেন সাহেব। গেট আউট অ্যান্ড লিভ মি অ্যালোন।
অর্থাৎ ভাগো হিঁয়াসে। আমি একা থাকতে চাই।
এবার রঞ্জনবাবু বুঝলেন যে, সাহেবের নেশাটা বেশ ভালমতোই হয়েছে। কিন্তু কথাটার তো একটা উত্তর দিতে হয়। যথাসাধ্য শান্তভাবে বললেন, আমারও রিজার্ভেশন রয়েছে এই কামরায়। আমরা দুজনেই থাকব এখানে–তাতে ক্ষতিটা কী?
গার্ডের হুইলের সঙ্গে সঙ্গে ট্রেনের ভোঁ শোনা গেল, আর পরমুহূর্তেই একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বোম্বে মেল আবার রওনা দিল। রঞ্জনবাবু আড়চোখে স্টেশনের নামটা দেখে নিলেন। চক্রধরপুরই বটে!
এখন ঘরে নীল নাইট লাইট ছাড়া আর কোনও আলো নেই। রঞ্জনবাবু সাহেবটিকে একটু ভাল করে দেখার জন্য এবং মনে আর একটু সোয়াস্তি আনার জন্য অন্য বাতি জ্বালানোর উদ্দেশ্যে সুইচের দিকে হাত বাড়িয়েছিলেন, কিন্তু সাহেবের ডোন্ট! হুঙ্কার তাঁকে নিরস্ত করল। যাই হোক এতক্ষণে রঞ্জনবাবুর চোখ অন্ধকারে সয়ে গেছে। এখন সাহেবের মুখ অপেক্ষাকৃত স্পষ্ট। গোঁফজোড়াটাই সবচেয়ে আগে চোখে পড়ে। চোখ দুটো কোটরে বসা। নীল আলোতে গায়ের রঙ ভারী ফ্যাকাসে মনে হচ্ছে। মাথার চুল সোনালি না সাদা সেটা বোঝার উপায় নেই।
আমি নিগারের সঙ্গে এক কামরায় থাকতে রাজি নই। তোমায় বলছি তুমি নেমে পড়ো।
নিগার! উনিশশো সত্তর সালে ভারতবর্ষে বসে কোনও ভারতীয়কে নিগার বলার সাহস কোনও সাহেবের হতে পারে এটা রঞ্জনবাবু ভাবতে পারেননি। ব্রিটিশ আমলে এ জিনিস ঘটেছে, এ গল্প রঞ্জনবাবু শুনেছেন। সবসময় যে বিশ্বাস হয়েছে তা নয়। সাহেবদের সম্বন্ধে অনেক মিথ্যে অপবাদ রটিয়েছে বাঙালিরা। আর যদি সত্যি হয়ে থাকে, সেসব সাহেব নিশ্চয়ই খুব নিম্নস্তরের। ভদ্র সাহেব, সভ্য সাহেব যারা, তারা ভারতীয়দের সঙ্গে এ ধরনের ব্যবহার কখনওই করতে পারে না।
