রঞ্জনবাবুর মতে এ সবই আসলে দেশ স্বাধীন হওয়ার ফল। সাহেবদের আমলে এমন মোটেই ছিল। কলকাতাকে তখন সত্যিই একটা সভ্য দেশের সভ্য শহর বলে মনে হত।
রঞ্জনবাবু বছর তিনেক আগে ছমাস কাটিয়ে এসেছেন লন্ডন শহরে। সাহেবরা বাঁচতে জানে, সুনিয়ন্ত্রিত জীবনের মূল্য জানে, সিভিক সেন্স কাকে বলে জানে। ঘড়ির কাঁটার মতো লন্ডন টিউবের গতিবিধি দেখলে স্তম্ভিত হতে হয়। আর যেমন মাটির নীচে, তেমনই মাটির উপরে। ওখানেও তো জনসংখ্যা নেহাত কম নয়, কিন্তু কই, বাসস্টপে তো ধাক্কাধাক্কি নেই, গলাবাজি নেই, কন্ডাক্টরের হুঙ্কার আর বাসের গায়ে চাপড় মারা নেই। ওদের বাস তো একদিকে কাত হয়ে চলে না যে, মনে হবে এই বুঝি উলটে পড়ল!
.
বন্ধুমহলে রঞ্জনবাবুর উগ্র সাহেবপ্রীতি একটা প্রধান আলোচনার বিষয়। ঠাট্টারও বটে, আর সেই কারণেই হয়তো রঞ্জনবাবুর বন্ধুসংখ্যা ক্রমে কমে এসেছে। শহরে যেখানে সাহেব প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে, সেখানে অনবরত সাহেব আর সাহেবি আমলের গুণকীর্তন কটা লোক বরদাস্ত করতে পারে? পুলকেশ সরকার ছেলেবেলার বন্ধু তাই তিনি এখনও টিকে আছেন, কিন্তু তিনিও সুযোগ পেলে বিদ্রূপ করতে ছাড়েন না। বলেন, তোমার এ দেশে জন্মানো ভুল হয়েছে। তোমার জাতীয় সংগীত হল গড সেভ দ্য কুইন, জনগণমন নয়। এই স্বাধীন নেটিভ দেশে তুমি আর বেশিদিন টিকতে পারবে না।
রঞ্জনবাবু উত্তর দিতে ছাড়েন না।–যাদের যেটা গুণ, সেটা অ্যাডমায়ার না করাটা অত্যন্ত সংকীর্ণ মনের পরিচয়। বাঙালিরা কলকাতা নিয়ে বড়াই করে–আরে বাবা, কলকাতা শহরের যেটা আসল। বিউটি, সেই ময়দানও তো সাহেবদেরই তৈরি। শহরের যা কিছু ভাল সে তো তারাই করে দিয়ে গেছে। শ্যামবাজার বাগবাজার ভবানীপুরকে তো তুমি সুন্দর বলতে পারো না। তবে এটাও ঠিক যে ভালগুলো আর ভাল থাকবে না বেশি দিন। আর তার জন্য দায়ী হবে এই নেটিভ বাঙালিরাই।
মধ্যপ্রদেশের রায়পুর শহরে দুই বন্ধুতে গিয়েছিল ছুটি কাটাতে। রঞ্জন কুণ্ডু একটা সাহেবি নামওয়ালা সওদাগরি অফিসের উচ্চপদস্থ কর্মচারী। পুলকেশ সরকার একটি বড় বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার। এবার পুজো ঈদ মিলিয়ে দুজনেরই দশদিনের ছুটে পড়ে গেল। রায়পুরে দুজনের কমন ফ্রেন্ড মোহিত বোসের সঙ্গে এক হপ্তা কাটিয়ে গাড়িতে করে বস্তারের অরণ্য অঞ্চল ঘুরে দেখে দুজনের একসঙ্গে কলকাতা ফেরার কথা ছিল। পুলকেশবাবু একবার বলেছিলেন ভিলাইতে তাঁর এক খুড়তুতো ভাইয়ের সঙ্গে দুদিন কাটিয়ে ফিরবেন, কিন্তু রঞ্জনবাবু রাজি হলেন না। বললেন, এসেছি একসঙ্গে, ফিরবও একসঙ্গে। একা ট্র্যাভেল করতে ভাল লাগে না ভাই।
শেষ পর্যন্ত স্টেশনে গিয়েও পুলকেশবাবুকে থেকেই যেতে হল। ভিলাই রায়পুর থেকে মাত্র মাইল দশেক। পুলকেশবাবু আসতে পারবেন না জেনে খুড়তুতো ভাই সশরীরে এসে হাজির হলেন দাদাকে বগলদাবা করে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ভিলাইয়ের বাঙালিরা বিসর্জন নাটক মঞ্চস্থ করবে পুজোয়, পুলকেশবাবুর থিয়েটারের নেশা, ভাইয়ের অনুরোধ, তিনি যদি গিয়ে নির্দেশনার ব্যাপারে একটু সাহায্য করেন! পুলকেশবাবু আর না করতে পারলেন না।
রঞ্জনবাবু হয়তো খুবই মুষড়ে পড়তেন, কিন্তু পুরনো ফাস্ট ক্লাস কামরাটি দেখে তিনি এতই বিস্মিত ও পুলকিত হলেন যে, বন্ধুর অভাবটা আর অত তীব্রভাবে অনুভব করলেন না। আশ্চর্য এই যে, সেকালের হলেও কামরার অবস্থা দিব্যি ছিমছাম। সবকটি আলোরই বাল্ব রয়েছে, পাখাগুলো চলে। সিটের চামড়া কোথাও ঘেঁড়া নেই, বাথরুমটিও পরিপাটি।
আরও বড় কথা হচ্ছে ফোর বার্থ কামরায় রঞ্জন কুণ্ডু আর পুলকেশ সরকার ছাড়া আপাতত আর কেউ যাত্রী নেই। পুলকেশবাবু খোঁজ নিয়ে জানালেন, তুমি রাউরকেল্লা পর্যন্ত একা যেতে পারবে। সেখানে একটি যাত্রী উঠবেন, তারপর আর কেউ নেই। দুটো আপার বার্থ সারা পথই খালি যাবে।
রঞ্জনবাবু বললেন, তোমাকে এই পুরনো কামরার আরামের কথা অনেকবার বলেছি, আফসোস এই যে, এতে ট্রাভেল করার সুযোগ পেয়েও নিতে পারলে না।
বন্ধু হেসে বললেন, হয়তো দেখবে কোরের লোক এসে তোমার ডিনারের অর্ডার নিয়ে গেল।
ওটা বলে আবার মন খারাপ করে দিও না,বললেন রঞ্জনবাবু। ট্রেনে খাওয়ার কথা ভাবতে গেলে এখন কান্না আসে। আমাদের ছেলেবেলায় কোরের লাঞ্চ আর ডিনারের জন্য আমরা মুখিয়ে থাকতাম।
রঞ্জনবাবু অবিশ্যি বন্ধুর বাড়ি থেকে লুচি তরকারি নিয়ে এসেছেন টিফিন ক্যারিয়ারে ভরে। রেলের থালিতে তাঁর আদৌ রুচি নেই।
যথাসময়ে বোম্বে মেল ছেড়ে দিল। কলকাতায় দেখা হবে ভাই, বললেন পুলকেশ সরকার। তোমার জার্নি আরামদায়ক হবে তাতে সন্দেহ নেই।
গাড়ি ছাড়ার পরে রঞ্জনবাবু মিনিটখানেক শুধু কামরার মধ্যে পায়চারি করলেন। এ সুখ বহুঁকাল পাননি তিনি। আজকালকার কামরায় ট্রেন ছাড়লে পরে সিটে বসে পড়া ছাড়া আর গতি নেই। বাইরে করিডর আছে বটে, কিন্তু তা এতই সংকীর্ণ সেখানে হাঁটা চলে না। এক স্টেশন এলে প্ল্যাটফর্মে নেমে পায়চারি করা যায়, তা ছাড়া সারা রাস্তা অনড় অবস্থা।
কিছুক্ষণ হাঁটার পর কোন সিটটা দখল করবেন এই নিয়ে একটু চিন্তা করে শেষে রায়পুরের প্ল্যাটফর্মের দিকের সিটটায় বসে সুটকেস থেকে একটা বালিশ ও একটা ডিটেকটিভ বই বার করে শুয়ে পড়লেন রঞ্জনবাবু। এখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা। অন্ধকার হয়ে যাবে একটুক্ষণের মধ্যেই। তবে বই পড়া বন্ধ করার প্রয়োজন নেই, কারণ মাথার পিছনে রিডিং লাইট আছে, এবং সেটা জ্বলে।
