শশাঙ্ক চোখ কপালে তুলে বলল, বলেন কী দাদু? এ কি কম হল নাকি? এ তো রেগুলার স্পিকিং পার্ট! বরেন মল্লিকের ছবিতে স্পিকিং পার্ট–আপনি বলছেন কী? আপনি তো ভাগ্যবান লোক মশাই! জানেন, আমাদের এই ছবিতে আজ অবধি প্রায় দেড়শো লোক পার্ট করে গেছে যারা কোনও কথাই বলেনি। শুধু ক্যামেরার সামনে দিয়ে হেঁটে গেছে। অনেকে আবার হাঁটেওনি, স্রেফ দাঁড়িয়ে থেকেছে। কারুর কারুর মুখ পর্যন্ত দেখা যায়নি। আজকেও দেখুন না–এই যে ওঁরা সব দাঁড়িয়ে আছেন, ল্যাম্পপোস্টের পাশে; ওঁরা সবাই আছেন আজকের সিনে, কিন্তু একজনেরও একটিও কথা নেই। এমনকী আমাদের যে নায়ক চঞ্চলকুমারতারও আজ কোনও ডায়ালগ নেই। কেবলমাত্র আপনার কথা, বুঝেছেন?
এবার জ্যোতি বলে ছেলেটি এগিয়ে এসে পটলবাবুর কাঁধে হাত রেখে বলল, শুনুন দাদু ব্যাপারটা বুঝে নিন। চঞ্চলকুমার হলেন এই আপিসের বড় চাকুরে। সিনটায় আমরা দেখাচ্ছি যে আপিসে একটা ক্যাশ ভাঙার খবর পেয়ে উনি হন্তদন্ত হয়ে এসে দৌড়ে আপিসে ঢুকছেন। ঠিক সেই সময় সামনে পড়ে গেছেন আপনি একজন পেডেস্ট্রিয়ানবুঝেছেন? লাগছে ধাক্কা-বুঝেছেন? আপনি ধাক্কা খেয়ে বলছেন আঃ, আর চঞ্চল আপনার দিকে দৃকপাত না করে ঢুকে যাচ্ছে আপিসে। আপনাকে অগ্রাহ্য করাতে তার মানসিক অবস্থাটা ফুটে বেরুচ্ছে বুঝেছেন? ব্যাপারটা কত ইম্পর্ট্যান্ট ভেবে দেখুন!
এবার শশাঙ্ক এগিয়ে এসে বলল, শুনলেন তো? যান, এবার একটু ওদিকটায় যান দিকি! এদিকটায় ভিড় করলে কাজের অসুবিধা হবে। আরেকটা শট আছে, তারপর আপনার ডাক পড়বে।
পটলবাবু আস্তে আস্তে আবার পানের দোকানটার দিকে সরে গেলেন। ছাউনির তলায় পৌঁছে হাতের কাগজটার দিকে আড়দৃষ্টিতে দেখে, আশেপাশের কেউ তাঁর দিকে দেখছে কি না দেখে কাগজটা কুণ্ডলী পাকিয়ে নর্দমার দিকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন।
আঃ!
একটা বিরাট দীর্ঘশ্বাস পটলবাবুর বুকের ভিতর থেকে উপরে উঠে এল।
শুধু একটিমাত্র কথাকথাও না, শব্দ–আঃ!
গরম অসহ্য হয়ে আসছে। গায়ের কোটটার মনে হয় যেন মনখানেক ওজন। আর দাঁড়িয়ে থাকা চলে; পা অবশ হয়ে গেছে।
পটলবাবু এগিয়ে গিয়ে পানের দোকানের ওদিকের আপিসটার দরজার সিঁড়ির উপর বসে পড়লেন। সাড়েনটা বাজে। করালীবাবুর বাড়িতে শ্যামাসংগীত হয় রবিবার সকালে; পটলবাবু নিয়মিত গিয়ে শোনেন। বেশ লাগে। সেইখানেই যাবেন নাকি চলে? পেলে ক্ষতিটা কী? এইসব বাজে, খেলো লোকের সংসর্গে রবিবারের সকালটা মাটি করে লাভ আছে কিছু? আর অপমানের বোঝাটাও যে বইতে হবে সেইসঙ্গে।
সাইলেন্স!
দুর! নিকুচি করেছে তোর সাইলেন্সের। যানা কাজ, তার বত্রিশ গুণ ফুটুনি আর ভড়ং। আর চেয়ে থিয়েটারের কাজ–
থিয়েটার…থিয়েটার…
অনেককাল আগের একটা ক্ষীণ স্মৃতি পটলবাবুর মনের মধ্যে জেগে উঠল। একটা গম্ভীর সংযত অথচ সুরেলা কণ্ঠস্বরে বলা কতগুলো অমূল্য উপদেশের কথা–একটা কথা মনে রেখো পটল। যত ছোট পার্টই তোমাকে দেওয়া হোক, তুমি জেনে রেখো তাতে কোনও অপমান নেই। শিল্পী হিসেবে তোমার কৃতিত্ব হবে সেই ছোট্ট পার্টটি থেকেও শেষ রসটুকু নিংড়ে বার করে তাকে সার্থক করে তোলা। থিয়েটারের কাজ হল পাঁচজনে মিলেমিশে কাজ। সকলের সাফল্য জড়িয়েই নাটকের সাফল্য।
পাকড়াশি মশাই দিয়েছিলেন এ উপদেশ পটলবাবুকে। গগন পাকড়াশি। পটলবাবুর নাট্যগুরু ছিলেন তিনি। আশ্চর্য অভিনেতা ছিলেন গগন পাকড়াশি, অথচ দম্ভের লেশমাত্র ছিল না তাঁর মনে। ঋষিতুল্য মানুষ আর শিল্পীর সেরা শিল্পী।
আরও একটা কথা বলতেন পাকড়াশি মশাই-নাটকের এক-একটি কথা হল এক-একটি গাছের ফল। সবাই নাগাল পায় না সে-ফলের। যারা পায় তারাও হয়তো তার খোসা ছাড়াতে জানে না। কাজটা আসলে হল তোমার–অভিনেতার। তোমাকে জানতে হবে কী করে সে ফল পেড়ে তার খোসা ছাড়িয়ে তার থেকে রস নিংড়ে বার করে সেটা লোকের কাছে পরিবেশন করতে হয়।
গগন পাকড়াশির কথা মনে হতে পটলবাবুর মাথা আপনা থেকেই নত হয়ে এল।
সত্যিই কি তাঁর আজকের পার্টটার মধ্যে কিছুই নেই? একমাত্র কথা তাঁকে বলতে হবে–আঃ। কিন্তু একটি কথা বলেই কি এককথায় তাকে উড়িয়ে দেওয়া যায়?
আঃ, আঃ, আঃ, আঃ, আঃ–পটলবাবু বারবার নানান সুরে কথাটাকে আওড়াতে লাগলেন। আওড়াতে আওড়াতে ক্রমে তিনি একটি আশ্চর্য জিনিস আবিষ্কার করলেন। ওই আঃ কথাটাই নানান সুরে নানান ভাবে বললে মানুষের মনের নানান অবস্থা প্রকাশ করছে। চিমটি খেলে মানুষে যেভাবে আঃ বলে, গরমে ঠাণ্ডা শরবত খেয়ে মোটেই সেভাবে আঃ বলে না। এ দুটো আঃ একেবারে আলাদা রকমের; আবার আচমকা কানে সুড়সুড়ি খেলে বেরোয় আরও আরেক রকম আঃ। এ ছাড়া আরও কতরকম আঃ রয়েছে–দীর্ঘশ্বাসের আঃ, তাচ্ছিল্যের আঃ, অভিমানের আঃ, ছোট করে বলা আঃ, লম্বা করে বলা আ, চেঁচিয়ে বলা আঃ, মৃদুস্বরে আঃ, চড়া গলায় আঃ, খাদে গলায় আঃ, আবার আ-টাকে খাদে শুরু করে বিসর্গটায় সুর চড়িয়ে আঃ–আশ্চর্য। পটলবাবুর মনে হল তিনি যেন ওই একটি কথা নিয়ে একটা আস্ত অভিধান লিখে ফেলতে পারেন।
এত নিরুৎসাহ হচ্ছিলেন কেন তিনি? এই একটা কথা যে একেবারে সোনার খনি। তেমন তেমন অভিনেতা তো এই একটা কথাতেই বাজিমাত করে দিতে পারে।
সাইলেন্স!
পরিচালক মশাই ওদিকে আবার হুঙ্কার দিয়ে উঠেছেন। পটলবাবু দেখলেন জ্যোতি ছোঁকরাটি তাঁর কাছেই ভিড় সরাচ্ছে। ছোঁকরাকে একটা কথা বলা দরকার। পটলবাবু দ্রুতপদে এগিয়ে গেলেন তার কাছে।
