ও। তা আপনি তো বেশ পাংচুয়াল দেখছি।
পটলবাবু মৃদু হাসলেন।
ন বছর হাডসন কিম্বার্লিতে চাকরি করেছি; লেট হইনি একদিনও। নট এ সিঙ্গল ডে।
বেশ, বেশ। আপনি এক কাজ করুন। ওই ছায়াটায় গিয়ে একটু ওয়েট করুন। আমরা এদিকে একটু কাজ এগিয়ে নিই।
তেপায়া যন্ত্রটার পাশ থেকে একজন বলে উঠল, নরেশ!
সার?
উনি কি আমাদের লোক?
হ্যাঁ স্যার। ইনিই..মানে, ওই ধাক্কার ব্যাপারটা…
ও। ঠিক আছে। এখন জায়গাটা ক্লিয়ার করো তো; শট নেব।
পটলবাবু আপিসের পাশেই একটা পানের দোকানের ছাউনির তলায় গিয়ে দাঁড়ালেন। বায়স্কোপ তোলা তিনি এর আগে কখনও দেখেননি। তাঁর কাছে সবই নতুন। থিয়েটারের সঙ্গে কোনও মিলই তো নেই। আর কী পরিশ্রম করে লোকগুলো। ওই ভারী যন্ত্রটাকে পিঠে করে নিয়ে এখান থেকে ওখানে রাখছে একটি একুশ-বাইশ বছরের ছোঁকরা। বিশ-পঁচিশ সের ওজন তো হবেই যন্ত্রটার।
কিন্তু তাঁর ডায়ালগ কই? আর তো সময় নেই বেশি। অথচ এখনও তাঁকে যে কী কথা বলতে হবে তাই জানেন না পটলবাবু।
হঠাৎ যেন একটু নার্ভাস বোধ করলেন পটলবাবু। এগিয়ে যাবেন নাকি? ওই তো নরেশবাবু; একবার তাঁকে গিয়ে বলা উচিত নয় কি? পার্ট ছোটই হোক আর বড়ই হোক, ভাল করে করতে হলে তাঁকে তো তৈরি করতে হবে সে পার্ট! না হলে এতগুলো লোকের সামনে তাঁকে যদি কথা গুলিয়ে ফেলে অপদস্থ হতে হয়? আজ প্রায় বিশ বচ্ছর অভিনয় করা হয়নি যে!
পটলবাবু এগিয়ে যেতে গিয়ে একটা চিৎকার শুনে থমকে গেলেন।
সাইলেন্স!
তারপর নরেশবাবুর গলা পাওয়া গেল–এবার শট নেওয়া হবে! আপনারা দয়া করে একটু চুপ করুন। কথাবার্তা বলবেন না, জায়গা ছেড়ে নড়বেন না, ক্যামেরার দিকে এগিয়ে আসবেন না!
তারপর আবার সেই প্রথম গলায় চিৎকার এল-সাইলেন্স! টেকিং। এবার পটলবাবু লোকটিকে দেখতে পেলেন। মাঝারি গোছের মোটাসোটা ভদ্রলোকটি তেপায়া যন্ত্রটার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন; গলায় একটা চেন থেকে দুরবিনের মতো একটা জিনিস ঝুলছে। ইনিই কি পরিচালক নাকি? কী আশ্চর্য, পরিচালকের নামটাও যে তাঁর জেনে নেওয়া হয়নি।
এবারে পর পর আরও কতগুলো চিৎকার পটলবাবুর কানে এল–স্টার্ট সাউন্ড! রানিং! অ্যাকশন!
অ্যাকশন কথাটার সঙ্গে সঙ্গেই পটলবাবু দেখলেন চৌমাথার কাছ থেকে একটা গাড়ি এসে আপিসের সামনে থামল, আর তার থেকে একটি মুখে-গোলাপি-রঙ-মাখা স্যুট-পরা যুবক দরজা খুলে প্রায় হুমড়ি খেয়ে নেমে হনহনিয়ে আপিসের গেট পর্যন্ত গিয়ে থেমে গেল। পরক্ষণেই পটলবাবু চিৎকার শুনলেন কাট, আর অমনই সাইলেন্স ভেঙে গিয়ে জনতার গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল।
পটলবাবুর পাশেই এক ভদ্রলোক তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করলেন, ছোঁকরাটিকে চিনলেন তো?
পটলবাবু বললেন, কই, না তো।
ভদ্রলোক বললেন, চঞ্চলকুমার। তরতরিয়ে উঠছে ছোঁকরা। একসঙ্গে চারখানা বইয়ে অভিনয় করছে।
পটলবাবু বায়স্কোপ খুবই কম দেখেন, কিন্তু এই চঞ্চলকুমারের নাম যেন শুনেছেন দু-একবার। কটিবাবু বোধহয় এই ছেলেটিরই প্রশংসা করছিলেন একদিন। বেশ মেক-আপ করেছে ছেলেটি! ওই বিলিতি স্যুটের বদলে ধুতি চাদর পরিয়ে ময়ুরের পিঠে চড়িয়ে দিলেই একেবারে কার্তিক ঠাকুর। কাঁচড়াপাড়ায় মনোতোষ ওরফে চিনুর চেহারা কতকটা ওইরকমই ছিল বটে; বেড়ে ফিমেল পার্ট করত চিনু!
পটলবাবু এবার পাশের ভদ্রলোকটির দিকে ঝুঁকে পড়ে ফিসফিস করে বললেন, আর পরিচালকটির নাম কী মশাই?
ভদ্রলোক অবাক হয়ে বললেন, সে কী, আপনি তাও জানেন না? উনি যে বরেন মল্লিক–তিনখানা ছবি পর পর হিট করেছে।
যাক। কতগুলো দরকারি জিনিস জানা হয়ে গেল। নইলে গিন্নি যদি জিজ্ঞেস করতেন কার ছবিতে কার সঙ্গে অভিনয় করে এলে, তা হলে মুশকিলেই পড়তেন পটলবাবু।
নরেশ একভাঁড় চা নিয়ে পটলবাবুর দিকে এগিয়ে এল।
আসুন স্যার, গলাটা একটু ভিজিয়ে আলগা করে নিন। আপনার ডাক পড়ল বলে!
পটলবাবু এবার আসল কথাটা না বলে পারলেন না।
আমায় ডায়ালগটা যদি এই বেলা দিতেন তো–
ডায়ালগ? আসুন আমার সঙ্গে।
নরেশ তেপায়া যন্ত্রটার দিকে এগিয়ে গেল, পিছনে পটলবাবু।
এই শশাঙ্ক।
একটি হাফশার্ট-পরা ছোঁকরা এগিয়ে এল নরেশের দিকে। নরেশ তাকে বলল, এই ভদ্রলোক ওঁর ডায়ালগ চাইছেন। একটা কাগজে লিখে দে তো। সেই ধাক্কার ব্যাপারটা…
শশাঙ্ক পটলবাবুর দিকে এগিয়ে এল।
আসুন দাদু…এই জ্যোতি, তোর কলমটা একটু দে তো! দাদুকে ডায়ালগটা দিয়ে দিই।
জ্যোতি ছেলেটি তার পকেট থেকে একটা লাল কলম বার করে শশাঙ্কর দিকে এগিয়ে দিল। শশাঙ্ক তার হাতের খাতা থেকে একটা সাদা পাতা ছিঁড়ে কলম দিয়ে তাতে কী জানি লিখে কাগজটা পটলবাবুকে দিল।
পটলবাবু কাগজটার দিকে চেয়ে দেখলেন তাতে লেখা রয়েছে–আঃ!
আঃ?
পটলবাবুর মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করে উঠল। কোটটা খুলে ফেলতে পারলে ভাল হয়। গরম হঠাৎ অসহ্য হয়ে উঠেছে।
শশাঙ্ক বলল, দাদু যে গুম মেরে গেলেন? কঠিন মনে হচ্ছে?
এরা কি তা হলে ঠাট্টা করছে? সমস্ত ব্যাপারটাই কি একটা বিরাট পরিহাস? তাঁর মতো নিরীহ নিৰ্বিাদী মানুষকে ডেকে এনে এতবড় শহরের এতবড় রাস্তার মাঝখানে ফেলে রঙতামাশা? এত নিষ্ঠুরও কি মানুষ হতে পারে?
পটলবাবু শুকনো গলায় বললেন, ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছি না।
কেন বলুন তো?
শুধু আঃ? আর কোনও কথা নেই?
