আমার কাজটা হতে আর কতক্ষণ দেরি ভায়া?
অত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন দাদু? একটু ধৈর্য ধরতে হয় এসব ব্যাপারে। আরও আধ ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করুন।
নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। অপেক্ষা করব বইকী! আমি এই কাছাকাছিই আছি।
দেখবেন, আবার সটকাবেন না যেন।
জ্যোতি চলে গেল।
স্টার্ট সাউন্ড।
পটলবাবু পা টিপে টিপে শব্দ না করে রাস্তা পেরিয়ে উলটো দিকের একটা নিরিবিলি গলিতে ঢুকে পড়লেন। ভালই হল। হাতে সময় পাওয়া গেছে কিছুটা! এরা যখন রিহার্সাল-টিহার্সালের বিশেষ ধার ধারছে না, তখন তিনি নিজেই নিজের অংশটা অভ্যাস করে নেবেন। গলিটা নির্জন। একে আপিসপাড়া বাসিন্দা এমনিতেই কম–তায় রবিবার। যে কজন লোক ছিল সবাই ফ্যারাডে হাউসের দিকে বায়স্কোপের তামাশা দেখতে চলে গেছে।
পটলবাবু গলা খাঁকরে নিয়ে আজকের এই বিশেষ দৃশ্যের বিশেষ আঃশব্দটি আয়ত্ত করতে আরম্ভ করলেন। আর সেইসঙ্গে আচমকা ধাক্কা খেলে মুখটা কীরকম বিকৃত হতে পারে, হাতদুটো কতখানি বেঁকে কীরকম ভাবে চিতিয়ে উঠতে পারে, আঙুলগুলো কতখানি ফাঁক হতে পারে, আর পায়ের অবস্থা কীরকম হতে পারে–এই সবই একটা কাঁচের জানলায় নিজের ছায়া দেখে ঠিক করে নিতে লাগলেন।
ঠিক আধঘণ্টা পরেই পটলবাবুর ডাক পড়ল; এখন আর তাঁর মনে কোনও নিরুৎসাহের ভাব নেই। উদ্বেগও কেটে গেছে তাঁর মন থেকে। রয়েছে কেবল একটা চাপা উত্তেজনা ও রোমাঞ্চ; পঁচিশ বছর আগে স্টেজে অভিনয় করার সময় একটা বড় দৃশ্যে নামবার আগে যে ভাবটা তিনি অনুভব করতেন, সেই ভাব।
পরিচালক বরেন মল্লিক পটলবাবুকে কাছে ডেকে বললেন, আপনি ব্যাপারটা বুঝে নিয়েছেন তো?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
বেশ। আমি প্রথম বলব স্টার্ট সাউন্ড। তার উত্তরে ভেতর থেকে সাউন্ড রেকর্ডিস্ট বলবে রানিং। বলামাত্র ক্যামেরা চলতে আরম্ভ করবে। তারপর আমি বলব অ্যাকশন! বললেই আপনি ওই থামের কাছটা থেকে এইদিকে হেঁটে আসতে শুরু করবেন, আর নায়ক এই গাড়ির দরজা থেকে যাবে ওই আপিসের গেটের দিকে। আন্দাজ করে নেবেন যাতে ফুটপাথের এইরকম জায়গাটায় কলিশনটা হয়। নায়ক আপনাকে অগ্রাহ্য করে ঢুকে যাবে আপিসে, আর আপনি বিরক্ত হয়ে আঃ বলে আবার হাঁটতে শুরু করবেন। কেমন?
পটলবাবু বললেন, একটা রিহার্সাল…?
না, বরেনবাবু বাধা দিলেন। মেঘ করে আসছে মশাই। রিহার্সালের টাইম নেই। রোদ থাকতে থাকতে নেওয়া দরকার শটটা।
কেবল একটা কথা…
আবার কী?
গলিতে রিহার্সাল দেবার সময় পটলবাবুর একটা আইডিয়া মাথায় এসেছিল, সেটা সাহস করে বলে ফেললেন।
আমি ভাবছিলাম–ইয়ে, আমার হাতে যদি একটা খবরের কাগজ থাকে, আর আমি যদি সেটা পড়তে পড়তে ধাক্কাটা খাই..মানে, অন্যমনস্কতার ভাবটা ফুটিয়ে তুলতে–
বরেন মল্লিক তাঁর কথাটা শেষ না হতেই বলে উঠলেন, বেশ তো…ও মশাই, আপনার যুগান্তরটা এই ভদ্রলোককে দিন তো…হ্যাঁ। এইবার এই থামের পাশে আপনার জায়গায় গিয়ে রেডি হয়ে যান। চঞ্চল, তুমি রেডি?
গাড়ির পাশ থেকে নায়ক উত্তর দিলেন, ইয়েস স্যার।
গুড। সাইলেন্স।
বরেন মল্লিক হাত তুললেন, তারপর হঠাৎ তক্ষুনি হাত নামিয়ে নিয়ে বললেন, ওহো-হো, এক মিনিট। কেষ্ট, ভদ্রলোককে একটা গোঁফ দিয়ে দাও তো চট করে। ক্যারেক্টারটা পুরোপুরি আসছে না।
কীরকম গোঁফ স্যার? ঝুঁপো, না চাড়া-দেওয়া, না বাটারফ্লাই? রেডি আছে সবই।
বাটারফ্লাই, বাটারফ্লাই। চট করে দাও, দেরি কোরো না।
একটি কালো বেঁটে ব্যাকব্রাশ করা ছোঁকরা পটলবাবুর দিকে এগিয়ে গিয়ে হাতের একটা টিনের বাক্স থেকে একটা ছোট্ট চৌকো কালো গোঁফ বার করে আঠা লাগিয়ে পটলবাবুর নাকের নীচে সেঁটে দিল।
পটলবাবু বললেন, দেখো বাপু, ধাক্কাধাক্কিতে খুলে যাবে না তো?
ছোঁকরা হেসে বলল, ধাক্কা কেন? আপনি দারা সিং-এর সঙ্গে কুস্তি করুন না–তাও খুলবে না।
লোকটার হাতে আয়না ছিল, পটলবাবু টুক করে তাতে একবার নিজের চেহারাটা দেখে নিলেন। সত্যিই তো! বেশ মানিয়েছে তো! খাসা মানিয়েছে। পটলবাবু পরিচালকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিকে মনে মনে তারিফ না করে পারলেন না।
সাইলেন্স! সাইলেন্স!
পটলবাবুর গোঁফ পরা দেখে দর্শকদের মধ্যে থেকে একটা গুঞ্জন শুরু হয়েছিল, বরেন মল্লিকের হুঙ্কারে সেটা থেমে গেল।
পটলবাবু লক্ষ করলেন সমবেত জনতার বেশিরভাগ লোকই তাঁরই দিকে চেয়ে আছে।
স্টার্ট সাউন্ড!
পটলবাবু গলাটা খাঁকরিয়ে নিলেন। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ–পাঁচ পা আন্দাজ হাঁটলে পর পটলবাবু ধাক্কার জায়গায় পৌঁছবেন। আর চঞ্চলকুমারের হাঁটতে হবে বোধহয় চার পা। সুতরাং দুজনে যদি একসঙ্গে রওনা হন, তা হলে পটলবাবুকে একটু বেশি জোরে হাঁটতে হবে তা না হলে
রানিং।
পটলবাবু খবরের কাগজটা তুলে মুখের সামনে ধরলেন। দশ আনা বিরক্তির সঙ্গে ছআনা বিস্ময় মিশিয়ে আঃ-টা বললে পরেই–
অ্যাকশন!
জয় গুরু!
খচ খচ খচ খচ–খন্ন্ন্ন্। পটলবাবুহঠাৎ চোখে অন্ধকার দেখলেন। নায়কের মাথার সঙ্গে তাঁর কপালের ঠোকাঠুকি লেগেছে। একটা তীব্র যন্ত্রণা তাঁকে এক মুহূর্তের জন্য জ্ঞানশূন্য করে দিয়েছে।
কিন্তু পরমুহূর্তেই এক প্রচণ্ড শক্তি প্রয়োগ করে আশ্চর্যভাবে নিজেকে সামলে নিয়ে পটলবাবু দশ আনা বিরক্তির সঙ্গে তিন আনা বিস্ময় ও তিন আনা যন্ত্রণা মিশিয়ে আঃশব্দটা উচ্চারণ করে কাগজটা সামলে নিয়ে আবার চলতে আরম্ভ করলেন।
