আর অভিনয়? সে তো যেন আর-এক জন্মের কথা! অজান্তে এক-একটা দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে আবছা আবছা মনে পড়ে যায়, এই আর কি! নেহাত পটলবাবুর স্মরণশক্তি ভাল, তাই কিছু ভাল ভাল পার্টের ভাল ভাল অংশ এখনও মনে আছে!–শুন পুনঃপুনঃ গাণ্ডীবঝঙ্কার, স্বপক্ষ আকুল মহারণে। জিনি শত পবন-হুঙ্কার, পর্বত-আকার গদা করিছে ঝঙ্কার বৃকোদর সঞ্চালনে!…ও! ভাবলে এখনও গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
নরেশ দত্ত এলেন ঠিক সাড়ে বারোটার সময়। পটলবাবু প্রায় আশা ছেড়ে দিয়ে নাইতে যাবার তোড়জোড় করছিলেন, এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল।
আসুন, আসুন! পটলবাবু দরজা খুলে আগন্তুককে প্রায় ঘরের ভিতর টেনে এনে তাঁর হাতল ভাঙা চেয়ারটি তাঁর দিকে এগিয়ে দিলেন–বসুন!
, না। বসব না। নিশিকান্তবাবু আপনাকে আমার কথা বলেছেন বোধহয়…
হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি অবিশ্যি খুবই অবাক হয়েছি। এতদিন বাদে…
আপনার আপত্তি নেই তো?
পটলবাবুর লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে গেল।
আমাকে দিয়ে…হেঁ হেঁ…মানে চলবে তো?
নরেশবাবু গম্ভীরভাবে একবার পটলবাবুর আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, বেশ চলবে। খুব চলবে। কাজটা কিন্তু কালই।
কাল? রবিবার?
হ্যাঁ…কোনও স্টুডিয়োতে নয় কিন্তু। জায়গাটা বলে দিচ্ছি আপনাকে। মিশন রো আর বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের মোড়ের ফ্যারাডে হাউসটা দেখেছেন তো? সাততলা বিল্ডিং একটা? সেইটের সামনে ঠিক সাড়ে-আটটায় পৌঁছে যাবেন। ওইখানেই কাজ। বারোটার মধ্যে ছুটি হয়ে যাবে আপনার।
নরেশবাবু উঠে পড়লেন। পটলবাবু ব্যস্ত হয়ে বললেন, কিন্তু পার্টটা কী বললেন না?
পার্ট হল গিয়ে আপনার…একজন পেডেস্ট্রিয়ানের, মানে পথচারী আর কি! একজন অন্যমনস্ক, বদমেজাজি পেডেস্ট্রিয়ান।…ভাল কথা, আপনার গলাবন্ধ কোট আছে কি?
তা আছে বোধহয়।
ওটাই পরে আসবেন। ডার্ক রঙ তো?
বাদামি গোছের। গরম কিন্তু।
তা হোক না। আর আমাদের সিনটাও শীতকালের, ভালই হবে…কাল সাড়ে আটটা, ফ্যারাডে হাউস।
পটলবাবুর ধাঁ করে আরেকটা জরুরি প্রশ্ন মাথায় এসে গেল।
পাটটায় ডায়ালগ আছে তো? কথা বলতে হবে তো?
আলবত। স্পিকিং পার্ট।…আপনি আগে অভিনয় করেছেন তো?
হ্যাঁ…তা, একটু-আধটু…।
তবে শুধু হেঁটে যাবার জন্য আপনার কাছে আসব কেন? সে তো রাস্তা থেকে যে-কোনও একটা পেডেস্ট্রিয়ান ধরে নিলেই হল।..ডায়ালগ আছে বইকী এবং সেটা কাল ওখানে গেলেই পেয়ে যাবেন। আসি…
নরেশ দত্ত চলে যাবার পর পটলবাবু তাঁর গিন্নির কাছে গিয়ে ব্যাপারটা খুলে বললেন।
যা বুঝছি বুঝলে গিন্নি-এ পার্টটা হয়তো তেমন একটা বড় কিছু নয়; অর্থপ্রাপ্তি অবিশ্যি আছে। সামান্য, কিন্তু সেটাও বড় কথা নয়। আসল কথা হচ্ছে, থিয়েটারে আমার প্রথম পার্ট কী ছিল মনে আছে তো? মৃত সৈনিকের পাট। স্রেফ হাঁ করে চোখ বুজে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে থাকা; আর তার থেকেই আস্তে আস্তে কোথায় উঠেছিলাম মনে আছে তো? ওয়াটস সাহেবের হ্যান্ডশেক মনে আছে? আর আমাদের মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান চারু বিশ্বাসের দেওয়া সেই মডেল? আঁ? এ তো সবে সিঁড়ির প্রথম ধাপাকী বলো অ্যাঁ? মান যশ প্রতিপত্তি খ্যাতি, যদি বেঁচে থাকি ভবে, হে মোর গৃহিণী, এ সবই লভিৰ আমি।…
পটলবাবু বাহান্ন বছর বয়সে হঠাৎ তিড়িং করে একটা লাফ দিয়ে উঠলেন। গিন্নি বললেন, করো কী?
কিচ্ছু ভেবো না গিন্নি। শিশির ভাদুড়ি সত্তর বছর বয়সে চাণক্যের পার্টে কী লাফখানা দিতেন মনে আছে? আজ যে পুনর্যৌবন লাভ করেছি।
গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল! সাধে কি তোমার কোনওদিন কিচ্ছু হয় না?
হবে হবে! সব হবে! ভাল কথা–আজ বিকেলে একটু চা খাব, বুঝেছ? আর সঙ্গে একটু আদার রস, নইলে গলাটা ঠিক..
.
পরদিন সকালে মেট্রোপলিটান কোম্পানির ঘড়িতে যখন আটটা বেজে সাত মিনিট তখন পটলবাবু এসপ্ল্যানেডে এসে পৌঁছলেন। সেখান থেকে বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট ও মিশন রো-এর ফ্যারাডে হাউসে পৌঁছতে লাগল আর মিনিট দশেক।
বিরাট তোড়জোড় চলেছে আপিসের গেটের সামনে। তিন-চারখানা গাড়ি, তার একটা বেশ বড় প্রায় বাস-এর মতো–তার মাথায় আবার সব জিনিসপত্তর। রাস্তার ঠিক ধারটায় ফুটপাথের উপর একটা তেপায়া কালো যন্ত্রের মতো জিনিস; তার পাশে কয়েকজন লোক ব্যস্তসমস্ত হয়ে ঘোরাফেরা করছে। গেটের ঠিক মুখটাতে একটা তেপায়া লোহার ডাণ্ডার মাথায় আরেকটা লোহার ডাণ্ডা আড়াআড়িভাবে শোয়ানো রয়েছে, আর তার ডগা থেকে ঝুলছে একটা মৌমাছির চাকের মতো দেখতে জিনিস। এ ছাড়া ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে জনা ত্রিশেক লোক, যাদের মধ্যে অবাঙালিও লক্ষ করলেন পটলবাবু; কিন্তু এদের যে কী কাজ সেটা ঠাহর করতে পারলেন না।
কিন্তু নরেশবাবু কোথায়? একমাত্র তিনি ছাড়া তো পটলবাবুকে কেউই চেনেন না!
দুরুদুরু বুকে পটলবাবু এগিয়ে চললেন আপিসের গেটের দিকে।
বৈশাখ মাস; গলাবন্ধ খদ্দরের কোটটা গায়ে বেশ ভারী বোধ হচ্ছিল। গলার কলারের চারপাশ ঘিরে বিন্দু বিন্দু ঘাম অনুভব করলেন পটলবাবু।
এই যে অতুলবাবু–এদিকে!
অতুলবাবু? পটলবাবু ঘুরে দেখেন আপিসের বারান্দায় একটা থামের পাশে দাঁড়িয়ে নরেশবাবু তাঁকেই ডাকছেন। নামটা ভুল করেছেন ভদ্রলোক। অস্বাভাবিক নয়। একদিনের আলাপ তো! পটলবাবু এগিয়ে গিয়ে নমস্কার করে বললেন, আমার নামটা বোধহয় ঠিক নোট করা নেই আপনার। শ্রীশীতলাকান্ত রায়। অবিশ্যি পটলবাবু বলেই জানে সকলে। থিয়েটারেও ওই নামেই জানত।
