চেয়ার ছেড়ে উঠে দরজার দিকে গেলাম। দরজা খুলে বাইরে।
সামনের মাঠে চাঁদের আলো।
বাংলোর বারান্দা থেকে হাত বিশেক দূরে ছাই রঙের একটা প্রকাণ্ড গ্রে হাউন্ড ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে আছে। আমি বাইরে আসামাত্র আমার দিকে ফিরে লেজ নাড়তে লাগল।
রেক্স।
সেই গম্ভীর ইংরেজ কণ্ঠস্বর। দূরে বাঁশবন ও নীলের ফ্যাক্টরির দিক থেকে ডাকটা প্রতিধ্বনিত হয়ে এল-রেক্স!…রেক্স…
রেক্স এগিয়ে এল–তার লেজ নড়ছে।
ঘাস থেকে বারান্দায় ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আমার ডান হাত কোমরের কাছে উঠে এল–পিস্তলের মুখ কুকুরের দিকে। রেক্স যেন থমকে গেল। তার জ্বলন্ত চোখে একটা অবাক ভাব।
আমার ডান তর্জনী পিস্তলের ঘোড়া টিপে দিল।
বিস্ফোরণের সঙ্গে একটা চোখ ঝলসানো আলো, একটা ধোঁয়া আর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়া বারুদের গন্ধ।
রেক্সের দেহের সামনের অংশ বারান্দার উপর ও পিছনটা ঘাসের উপর এলিয়ে পড়েছে।
পিস্তলের শব্দ শুনে কাক ডেকে উঠেছে দূরের গাছপালা থেকে। ফ্যাক্টরির দিক থেকে কিছু লোক যেন ছুটে আসছে বাংলোর দিকে।
ঘরে ফিরে এসে দরজায় হুড়কো লাগিয়ে খাটের উপর এসে বসলাম। বাইরে লোকের গোলমাল এগিয়ে আসছে।
পিস্তলের নলটা আমার কানের পাশে ঠেকাতে বুঝলাম সেটা বেশ গরম।
তারপর আর কিছু জানি না।
.
দরজা ধাক্কানিতে ঘুম ভেঙে গেল।
চা লিয়ায়া বাবুজি।
ঘরে দিনের আলো। চিরকালের অভ্যাসমতো দৃষ্টি আপনা থেকেই বাঁ হাতের কবজির দিকে চলে গেল।
ছটা বেজে তেরো মিনিট। ঘড়ি চোখের আরও কাছে আনলাম–কারণ তারিখটাও দেখা যায় এতে।
আটাশে এপ্রিল।
বাইরে থেকে সুখনরাম বলছে, আপকা গাড়ি ঠিক হো গিয়া বাবুজি।
বীরভূমের নীলকর সাহেবের মৃত্যুশত বার্ষিকীতে আমার অভিজ্ঞতার কথা কি কেউ বিশ্বাস করবে?
সন্দেশ, শারদীয়া ১৩৭৫
পটলবাবু ফিল্মস্টার
পটলবাবু সবে বাজারের থলিটা কাঁধে ঝুলিয়েছেন এমন সময় বাইরে থেকে নিশিকান্তবাবু হাঁক দিলেন, পটল আছ নাকি হে?
আজ্ঞে হ্যাঁ। দাঁড়ান, আসছি।
নিশিকান্ত ঘোষ মশাই নেপাল ভট্টচাজ্যি লেনে পটলবাবুর তিনখানা বাড়ির পরেই থাকেন। বেশ আমুদে লোক।
পটলবাবু থলে নিয়ে বেরিয়ে এসে বললেন, কী ব্যাপার? সক্কাল সক্কাল?
শোনো, তুমি ফিরছ কতক্ষণে?
এই ঘণ্টাখানেক। কেন?
তারপর আর বেরোনোর ব্যাপার নেই তো? আজ তো ট্যাগোরস বার্থডে। আমার ছোট শালার সঙ্গে কাল নেতাজি ফার্মেসিতে দেখা হল। সে ফিল্মে কাজ করে–লোকজন জোগাড় করে দেয়। বললে কী জানি একটা ছবির একটা সিনের জন্য একজন লোক দরকার। যেরকম চাইছে, বুঝেছ বছর পঞ্চাশ বয়স, বেঁটেখাটো, মাথায় টাক–আমার টক করে তোমার কথা মনে পড়ে গেল। তাই তোমার হদিস দিয়ে দিলুম। বলেছি সোজা তোমার সঙ্গে এসে কথা বলতে। আজ সকাল দশটা নাগাদ আসবে বলেছে। তোমার আপত্তি নেই তো? ওদের রেট হিসেবে কিছু পেমেন্টও দেবে অবিশ্যি…
সক্কালবেলা ঠিক এই ধরনের একটা খবর পটলবাবু আশাই করেননি। বাহান্ন বছর বয়সে ফিল্মে অভিনয় করার প্রস্তাব আসতে পারে এটা তাঁর মতো নগণ্য লোকের পক্ষে অনুমান করা কঠিন বইকী! এ যে একেবারে অভাবনীয় ব্যাপার!
কী হে, হ্যাঁ কি না বলে ফেলল। তুমি তো অভিনয়-টভিনয় করেছ এককালে, তাই না?
হ্যাঁ, মানে না, বলার আর কী আছে? সে আসুক, কথাটথা বলে দেখি! কী নাম বললেন আপনার শালার?
নরেশ। নরেশ দত্ত। বছর ত্রিশেক বয়স, লম্বা দোহারা চেহারা। দশটা-সাড়ে দশটা নাগাদ আসবে বলেছে।
বাজার করতে গিয়ে আজ পটলবাবু গিন্নির ফরমাশ গুলিয়ে ফেলে কালোজিরের বদলে ধানিলঙ্কা কিনে ফেললেন। আর সৈন্ধব নুনের কথাটা তো বেমালুম ভুলেই গেলেন। এতে অবিশ্যি আশ্চর্য হবার কিছুই নেই। এককালে পটলবাবুর রীতিমতো অভিনয়ের শখ ছিল। শুধু শখ কেন–নেশাই বলা চলে। যাত্রায়, শখের থিয়েটারে, পুজোপার্বণে, পাড়ার ক্লাবের অনুষ্ঠানে তাঁর বাঁধা কাজ ছিল অভিনয় করা। হ্যান্ডবিলে কতবার নাম উঠেছে পটলবাবুর। একবার তো নীচের দিকে আলাদা করে বড় অক্ষরে নাম বেরুল–পরাশরের ভূমিকায় শ্রীশীতলাকান্ত রায় (পটলবাবু)। তাঁর নামে টিকিট বিক্রি হয়েছে। বেশি, এমনও সময় গেছে এককালে।
তখন অবিশ্যি তিনি থাকতেন কাঁচরাপাড়ায়। সেখানেই রেলের কারখানায় চাকরি ছিল তাঁর। উনিশশো চৌত্রিশ সনে কলকাতার হাডসন অ্যান্ড কিম্বার্লি কোম্পানিতে আরেকটু বেশি মাইনের একটা চাকরি, আর নেপাল ভটচাজ্যি লেনে এই বাড়িটা পেয়ে পটলবাবু সস্ত্রীক কলকাতায় চলে আসেন। কটা বছর কেটেছিল ভালই। আপিসের সাহেব বেশ স্নেহ করতেন পটলবাবুকে। তেতাল্লিশ সনে পটলবাবু সবে একটা পাড়ায় থিয়েটারের দল গড়ব-গড়ব করছেন এমন সময় যুদ্ধের ফলে আপিসে হল ছাঁটাই, আর পটলবাবুর ন বছরের সাধের চাকরিটি কপূরের মতো উবে গেল।
সেই থেকে আজ অবধি বাকি জীবনটা রোজগারের ধান্দায় কেটে গেছে পটলবাবুর। গোড়ায় একটা মনিহারি দোকান দিয়েছিলেন, সেটা বছর পাঁচেক চলে উঠে যায়। তারপর একটা বাঙালি আপিসে কেরানিগিরি করেছিলেন কিছুদিন, কিন্তু বড়কর্তা বাঙালি সাহেব মিস্টার মিটারের ঔদ্ধত্য আর অকারণ চোখ-রাঙানি সহ্য করতে না পারায় নিজেই ছেড়ে দেন সে চাকরি। তারপর এই দশটা বছর ইনসিওরেন্সের দালালি থেকে শুরু করে কী-না করেছেন পটলবাবু! কিন্তু যে-অভাব, যে-টানাটানি, সে আর দূর হয়নি কিছুতেই। সম্প্রতি তিনি একটা লোহালক্কড়ের দোকানে ঘোরাঘুরি করছেন; তাঁর এক খুড়তুতো ভাই বলেছে সেখানে একটা ব্যবস্থা করে দেবে।
