তুমি কি আত্মহত্যা করেছিলে?
উত্তর আসতে একটু সময় লাগল।
হ্যাঁ।
কীভাবে?
রিভলভার দিয়ে মাথায় গুলি মেরে।
কেন?
আমার আর বাঁচার ইচ্ছে ছিল না।
বুঝেছি! কিন্তু এমন মনের ভাব হল কেন?
আজ এই পর্যন্তই থাক। বড় ক্লান্ত লাগছে।
বুঝতে পারলাম উৎপলবাবুরই আসলে ক্লান্ত লাগছে। আমি লাইটার দিয়ে মোমবাতিটা জ্বালিয়ে দিলাম। উৎপলবাবুর মাথা হেঁট হয়ে বুকের উপর নুইয়ে পড়েছে। কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিতে তাঁর স্তন আবার ফিরে এল। মাথাটা ঝাড়া দিয়ে হঠাৎ নিজের গলায় প্রশ্ন করলেন–
কেমন হল?
খুব ভাল, বললেন অর্ধেন্দুবাবু। বোঝাই যাচ্ছে মহেশ হালদার এখানকার পাট উঠিয়ে দিয়ে বাংলোটা নরিসকে বিক্রি করে কলকাতা চলে যান। আর সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। অর্থাৎ যতদূর মনে হল হালদার বংশের ওখানেই শেষ।…অনেক ধন্যবাদ, উৎপলবাবু।
আমার কিন্তু মনে একটা খটকা লেগেছে যেটা আমাকে ভাবিয়ে তুলল। নরিস সাহেবের মৃত্যুর কারণটা ঠিক পরিষ্কার হল না। আমার এখন হালদারের চেয়ে নরিসের উপরই ঝোঁকটা বেশি। অবিশ্যি উৎপলবাবুকে যা যা প্রশ্ন করা হয়েছে তার উত্তর তিনি ঠিক ভাবেই দিয়েছেন।
আমি রাত্তিরে অনেকক্ষণ ধরে এই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবলাম, তারপর সকালে উঠে অর্ধেন্দুবাবুর হোটেলে গিয়ে সোজাসুজি বললাম যে আমি আর একবার প্ল্যানচেট করতে চাই, এবং এবার প্রশ্নগুলি আমি করব। অর্ধেন্দুবাবু বললেন, আমার আপত্তি নেই, তবে আপনি হালদার বংশ সম্বন্ধে আর কী নতুন তথ্য জানার আশা করছেন তা জানি না।
আমি বললাম, সত্যি বলতে কি, আমি নরিস সম্বন্ধে আরও কিছু জানতে চাই। লোকটিকে বেশ ইন্টারেস্টিং বলে মনে হল।
উৎপলবাবু আমাদের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলেন।
আমরা আবার দশটার সময় সাহেবের বাংলোতে জমায়েত হলাম। আমি উৎপলবাবুকে ঠাট্টা করে বললাম, আজ তো অমাবস্যা নয়। প্ল্যানচেট ঠিকমতো হবে তো?
উৎপলবাবু বললেন, মনে তো হয়। এ ভদ্রলোকের আত্মা বেশ সহজেই ধরা দেয়।
অর্ধেন্দুবাবু বললেন, আমি সবই বরদাস্ত করতে পারি, কিন্তু আপনার গলা দিয়ে যখন অন্য লোকের স্বর বেরোয় তখন মেরুদণ্ডটা কেমন যেন শিরশির করে।
আমরা সোয়া দশটার মধ্যে তৈরি হয়ে নিলাম। পনেরো মিনিটের মধ্যেই টেবিল নড়া আর উৎপলবাবুর গলা থেকে আঁ শব্দ শুনে বুঝলাম যে প্রেতাত্মা হাজির।
এবার আমি প্রশ্ন করলাম–ইজ এনিবডি হিয়ার?
নরিসের কণ্ঠস্বরে উত্তর এল—
ইয়েস।
আর ইউ মিস্টার নরিস?
ইয়েস।
মিস্টার নরিস, তোমাকে দুবার বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চাইছি; কিন্তু কাল একটা প্রশ্নের ঠিক জবাব মেলেনি, তাই আবার তোমাকে ডাকলাম।
কী প্রশ্ন?
তোমার জীবনের উপর এতটা বিতৃষ্ণা এল কেন যে, আত্মহত্যা করলে?
একটুক্ষণ কোনও কথা নেই। তারপর ইংরিজিতে উত্তর এল—
আমাকে প্রচণ্ডভাবে অপমান করা হয়েছিল।
কে করেছিল অপমান?
মেজর টমসন।
ঘটনাটা কোথায় হয়?
আমাদের ক্লাবে।
কিন্তু অপমানের কারণটা কী?
তা হলে অনেক কথা বলতে হয়।
বলুন। আমরা শুনতেই এসেছি।
আমি এক বেয়ারাকে একদিন হিন্দিতে একটা কথা বলেছিলাম। সেটা মেজর টমসন শুনে ফেলেছিলেন।
তাতে কী হল?
তাতে তিনি বুঝে ফেলেছিলেন আমি সাহেব নই।
আপনি সাহেব নন?
না। তবে আমার চেহারায় সাহেবের সঙ্গে কোনও পার্থক্য ছিল না। আমার চুল ছিল কটা, চোখ নীল, আর গায়ের রঙ সাহেবের মতো ফরসা। আমি মিশনারি স্কুলে পাদ্রীদের কাছে ইংরিজি শিখেছিলাম। সেই ইংরিজি শুনে আমার চেহারা দেখে কারুর বোঝার সাধ্যি ছিল না যে আমি সাহেব নই। আমাদের ক্লাবে ভারতীয়দের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল, কিন্তু আমি নরিস নাম নিয়ে ক্লাবে ঢুকতে পেরেছিলাম। এই ক্লাবে আমি সাড়ে তিন বছর মেম্বার ছিলাম। তারপর টমসনের কাছে ধরা পড়ে গেলাম। সে সকলের সামনে আমাকে নেটিভ বলে ক্লাব থেকে লাথি মেরে বার করে দেয়।
আসলে তুমি কী ছিলে?
আমি ছিলাম বাঙালি। আমার নাম ছিল নরেশ। নরেশ থেকে নরিস।
আমি হঠাৎ যেন চোখের সামনে একটা আলো দেখতে পেলাম। বললাম,
তুমি কি মহেশ হালদারের কোনও আত্মীয় ছিলে?
আমি ছিলাম মহেশ হালদারের একমাত্র ছেলে। বাবা তাঁর অভ্রের খনির ভার আমার উপর দিয়ে কলকাতায় চলে যান। সেইখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। আমি বিয়ে করিনি। আমি হালদার বংশের শেষ প্রতিনিধি।
বাকি কথাটা নরেশ বাংলাতেই বললেন।
আজ তা হলে আমি আসি, কারণ এ ধরনের কথোপকথন আমার পক্ষে বড় ক্লান্তিকর।
আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।
আমারও অনেক হালকা লাগছে। অ্যাদ্দিন পরে বাংলা বলে আরাম পাচ্ছি, আর সাহেব সেজে কী যে ভুল করেছিলাম সেটা নতুন করে বুঝতে পেরেছি।
.
মোমবাতি জ্বালিয়ে দিলাম।
এখন আর আমার মনে কোনও খটকা রইল না, আর অর্ধেন্দুবাবুর হালদার বংশের ইতিহাসের শেষপর্ব শেষ হল।
তবে এটাও বুঝতে পারলাম যে, উৎপলবাবুকে না পেলে মিঃ নরিসের রহস্য রহস্যই থেকে যেত!
সন্দেশ, বৈশাখ ১৩৯৪
নিতাই ও মহাপুরুষ
কোনও এক জ্ঞানী ব্যক্তি বলে গেছেন যে মানুষের মধ্যে বেশিরভাগই মাঝারি দলে পড়ে। কথাটা হয়তো সত্যি, কিন্তু নিতাইকে মাঝারিও বলা চলে না। অনেক ব্যাপারেই সে অত্যন্ত খাটো। দেহের দিক দিয়ে যেমন, মনের দিক দিয়েও ছেলেবেলা থেকে সে খাটোই রয়ে গেছে। তার বয়স সবে আটত্রিশ পেরোল। সে ব্যাঙ্কে যে কেরানির চাকরিটা করে সেটাও অবশ্যই খাটো। মাসে যা আয় হয় তাতে বউ আর একটি তেরো বছরের ছেলে নিয়ে কোনওমতে টেনেটুনে সংসার চলে। তাও ভাগ্যি যে মেয়ে নেই; থাকলে তার বিয়ে দিতে নিতাই ফতুর হয়ে যেত। বউ-এর গঞ্জনা তাকে সইতে হয় সর্বক্ষণই সেটা বলাই বাহুল্য, কারণ সৌদামিনী বেশ দজ্জাল মহিলা। তাই বাড়িতে যেমন নিতাই সদা তটস্থ, আপিসেও বড়বাবু, মেজোবাবু সেজোবাবু সকলের চোখরাঙানি তাকে সহ্য করতে হয়। জীবনে এমন কোনও কাজ যদি সে করত যাতে তার গর্ব হয়, যাতে পাঁচজনে তার সুখ্যাতি করে, তা হলে কী ভালই না হত! কিন্তু তেমন কপাল করে নিতাই আসেনি। তার ধারণা, সে ঈশ্বরের দায়সারা সৃষ্টির মধ্যে একজন! তাকে গড়ার সময় বিধাতা ছিলেন অন্যমনস্ক, তাই সে জীবনে কিছু করতে পারল না।
