যাদের উপর ঈশ্বরের সুনজর পড়ে তারা কেমন মানুষ হয়? তার একটা উদারণ নিতাই দিতে পারে এখনই! দুদিন হল কলকাতায় একটি সাধুবাবা এসেছেন–জীবানন্দ মহারাজ–যাঁর শিষ্য-শিষ্যার নাকি ইয়ত্তা নেই, যিনি বাগ্মী, যিনি সুকণ্ঠ, যাঁর গীতার ব্যাখ্যা শুনে লোকে মোহিত হয়ে যায়, যাঁর চরণস্পর্শ করতে পারলে লোকে কৃতার্থ বোধ করে। ঈশ্বরের এক ধাপ নীচেই তাঁর স্থান। জীবানন্দ মহারাজ। হ্যারিংটন স্ট্রিটের এক ভক্তের বাড়িতে এসে উঠেছেন কেষ্টনগর থেকে, শহরে তাঁকে নিয়ে হইচই পড়ে গেছে, কাগজের প্রথম পাতায় তাঁর ছবি, এমন জাঁদরেল মহাপুরুষ নাকি বহুঁকাল দেখা যায়নি।
নিতাই আর তার স্ত্রী দুজনেরই ইচ্ছা এঁর দর্শন পেতে, কিন্তু যা শোনা যাচ্ছে, ভিড়ের চোটে সাধারণ লোকের পক্ষে এঁর নাগাল পাওয়া দুষ্কর ব্যাপার। যে বাড়িতে এসে তিনি উঠেছেন, সে বাড়ির মাঠে শামিয়া খাটানো হয়েছে। বাবাজি সকাল-সন্ধ্যা গিয়ে বেদিতে বসেন, ভক্তসমাগম হয়, বাবাজি নানারকম আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে জ্ঞানী জ্ঞানী কথা বলেন। ভক্তদের মধ্যে যাঁরা খুব ভাগ্যবান তাঁরা সামনের দিকে বসেন, বাবার মর্জি হলে তাঁদের আলাদা করে ডেকে এনে কথা বলেন, তাতে ভক্তদের ভক্তি বেড়ে যায় দ্বিগুণ।
নিতাই যে কোনওদিন এ আসরে প্রবেশ করতে পারবে, আর প্রথম সারিতে বসবার সুযোগ পাবে, সেটা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত সে সুযোগ এসে গেল রসিলালের কল্যাণে। রসিকলাল বোস নিতাইয়ের ভায়রা ভাই। সে বড় কোম্পানিতে বড় চাকরি করে, তবে তার জন্য তার কোনও দম্ভ নেই। সে নিতাইয়ের বাড়িতে মাসে অন্তত তিনবার করে আসে, এবং ভোলা মনে নানারকম গালগল্প করে। সাধু সন্ন্যাসী সম্পর্কে তার একটা আগ্রহ আগে থেকেই ছিল, এবং সে প্রথম সুযোগেই জীবানন্দ বাবাজির শিষ্যত্ব গ্রহণ করে তাঁর প্রথম শ্রেণীর চেলাদের মধ্যে একজন হয়ে গেছে। রসিকলালই এক শনিবার নিতাইয়ের বাড়িতে এসে বলল, একজন খাঁটি মহাপুরুষ দেখতে চাও তো চলে এসো আমার সঙ্গে।
কার কথা বলছ? নিতাই প্রশ্ন করল।
কার কথা আবার?–একজনই তো আছেন। হ্যারিংটন স্ট্রিটে ডেরা বেঁধেছেন। চোখের জ্যোতি দেখে বোঝা যায় পৌরাণিক যুগে সাধু সন্ন্যাসীরা কেমন ছিলেন। তাঁর দর্শন না পাওয়াটা জীবনে একটা খুব বড় লস্।
কিন্তু তাঁর একশো হাতের মধ্যে তো যাওয়াই যায় না বলে শুনেছি।
সবাই পারে না যেতে, কিন্তু আমি কী কপাল করে এসেছি জানি না–আমার স্থান একেবারে প্রথম সারিতে। আমার উপর বাবার একটা টান পড়ে গেছে। কথা যখন বলেন তখন বেশিরভাগটাই আমার দিকে চেয়ে বলেন। শুনে গায়ে কাঁটা দেয় বারবার। যাবে তো বলো।
সে আর বলতে! এমন সুযোগ আসবে সে তো ভাবতেই পারিনি।
হিমালয়ে পঁচিশ বছর তপস্যা করেছেন গঙ্গোত্রীর ধারে। দেখলে আর বলে দিতে হয় না যে ইনি একজন খাঁটি সিদ্ধপুরুষ।
দিন ঠিক হয়ে গেল। আগামী মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ছটায় রসিকলাল আসবে নিতাই আর তার স্ত্রীকে নিয়ে যেতে।
সামনে বসতে পারব তো?
রসিকলালের কথায় যেন পুরোপুরি ভরসা হচ্ছিল না নিতাইয়ের।
না পারলে আমার নাম নেই, জোরের সঙ্গে বলল রসিকলাল। ভাল কথা, একটু আতর মেখে যেও! বাবাজি আতরের খুব ভক্ত।
আশ্বিন মাস, তাই ছটা থেকেই অন্ধকার হয়ে গেছে। হ্যারিংটন স্ট্রিটে ব্যারিস্টার যতীশ সেনগুপ্তের বাড়ির মাঠে শামিয়ানার নীচে ফুয়োরেসেন্ট লাইটের ব্যবস্থা, তাই বাবাকে দেখতে কারুর অসুবিধা হয় না। সুবেশী নারীপুরুষের ভিড় দেখে প্রথমে নিতাই হকচকিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু রসিকলাল তাদের সটান নিয়ে গেল একেবারে সামনের সারিতে। রসিকলাল পৌঁছিয়েই প্রথমে সাড়ম্বরে বাবাজির পদধুলি নিল, আর তার দেখাদেখি নিতাই আর তার স্ত্রীকেও নিতে হল। তারপর মাটিতে বসে নিতাই প্রথম বাবাজির দিকে ভাল করে চাইল।
সৌম্য চেহারা তাতে সন্দেহ নেই। আবক্ষ দাড়ি, মাথায় কাঁচা-পাকা মেশানো ঢেউ খেলানো চুল কাঁধ অবধি নেমে এসেছে, পরনে গেরুয়া সিল্কের আলখাল্লা, গলায় তিনটে বড় বড় রুদ্রাক্ষের মালা। বাবার দুপাশে বেলফুলের মালা তৃপ করে রাখা রয়েছে, বোঝাই যায় সুগন্ধের জন্য ভক্তরা সেগুলো বাবাকে দিয়েছেন। নিতাই নিজে কোনও গন্ধদ্রব্য ব্যবহার করেনি, কারণ ও জিনিসটা তার বাড়িতেই নেই। কিন্তু আতর ও অন্যান্য সেন্টের গন্ধ সে চারদিক থেকেই পাচ্ছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ধূপের গন্ধ। সব মিলিয়ে বেশ একটা নেশাধরানো ভাব।
বাবা এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন, এবার মুখ খুলে গীতার একটি শ্লোক আউড়িয়ে তার ব্যাখ্যা শুরু করলেন।
নিতাইয়ের দৃষ্টি সম্পূর্ণ বাবার উপরে নিবদ্ধ। তার একটা কারণ আছে। একটা নয়, দুটো। এক হল বাবার চোখ। তিনি হলেন যাকে বলে লক্ষ্মীট্যারা। আর দুই হল বাবার বাঁ গালে চোখের নীচে একটা বেশ বড় আঁচিল।
এই দুইয়ে মিলে নিতাইকে হঠাৎ যেন কেমন অন্যমনস্ক করে দিল। ওই আঁচিল আর ওই লক্ষ্মীট্যারা চোখ।
এবারে আরও ভাল করে খুঁটিয়ে বাবার মুখের দিকে চেয়ে দেখল নিতাই, আর একাগ্রভাবে শুনতে। লাগল বাবার কথা। দিব্যি গড়গড় করে ব্যাখ্যা করে চলেছেন। সুললিত কণ্ঠস্বর, মনে হয় ইনি গানও ভাল করবেন। তার সাক্ষ্য দিচ্ছে বাবারই একপাশে রাখা হারমোনিয়াম আর খোল।
