তা অবিশ্যি ঠিক।
কথাটা খুব জোরের সঙ্গে বললেন না অর্ধেন্দুবাবু। বুঝলাম তিনি সাহেবের প্রেতাত্মার সঙ্গে যোগস্থাপনের ব্যাপারে খুব একটা উৎসাহ বোধ করছেন না। আমি না হয় ভূতকে তোয়াক্কা করি না, কিন্তু সবাই তো সেরকম নয়।
দুটো দিন পেরিয়ে গেল।
তিনদিনের দিন আমি অর্ধেন্দুবাবুকে বললাম, এইভাবে হাত-পা গুটিয়ে বসে থেকে আপনার কী লাভ আছে? আসুন একটা কিছু করা যাক। না হয় বাংলোটায় একটা রাত কাটিয়ে আসা যাক।
অর্ধেন্দুবাবু একটু চুপ থেকে বললেন, এখানে বাঙালিদের একটা আচ্ছা আছে শশী ডাক্তারের বাড়ি। আমি কাল সেখানে গিয়েছিলাম। তারা বলল, নরিস সাহেবের বাংলোকে হানাবাড়ি বলা হলেও এখনও পর্যন্ত কেউ কোনও ভূতের সাক্ষাৎ পায়নি। তবে ওই আড্ডাতেই উৎপলবাবু বলে এক নিরীহ গোছের ভদ্রলোক ছিলেন, তিনি নাকি খুব ভাল মিডিয়ম। অর্থাৎ তাঁর মধ্যে দিয়ে ভূতের আবির্ভাব ঘটেছে নাকি অনেকবার। ভদ্রলোক একটা বিশেষ অবস্থায় এলে তাঁর গলা থেকে নাকি ভূতের গলায় কথা বেরোয়, আর তখন নাকি ভূতের সঙ্গে কথাবার্তা বলা চলে। অন্ধকার ঘরে তেপায়া টেবিলের উপর হাত রেখে নাকি ব্যাপারটা করতে হয়। কিঞ্চিৎ সময়সাপেক্ষ।
আমি বললাম, দেখুন কীরকম যোগাযোগ। এই মিডিয়ম পাওয়া কিন্তু সহজ ব্যাপার নয়। আপনি এই উৎপলবাবুকে বলুন আমরা কালই রাত্রে বসছি। তেপায়া টেবিল জোগাড় করতে পারবেন?
আমার হোটেলের ঘরেই একটা আছে।
তা হলে তো কথাই নেই। আসুন লেগে পড়া যাক।
অর্ধেন্দুবাবু শশী ডাক্তারের আড্ডায় নিয়ে গিয়ে আমার সঙ্গে উৎপলবাবুর আলাপ করিয়ে দিলেন। সকলের সামনে আর ভূতের প্রসঙ্গটা তুললাম না, কারণ প্ল্যানচেটে আমাদের তিনজনের বেশি কেউ থাকে এটা আমি চাইছিলাম না। আড্ডার পরে বাইরে বেরিয়ে এসে উৎপলবাবুকে প্রস্তাবটা দেওয়া হল। ভদ্রলোক এককথায় রাজি। বললেন, নরিস সাহেবের বাংলোয় প্ল্যানচেট করার ওঁর অনেকদিনের শখ, কিন্তু এতদিন কাউকে সঙ্গী পাননি বলে হয়ে ওঠেনি। তা হলে পরশু বুধবার বসা যাক, বললেন উৎপলবাবু। পরশু অমাবস্যা, সেই কারণে কাজটা সহজে হবার সম্ভাবনা। কী কী জিনিস লাগবে জিজ্ঞেস করাতে ভদ্রলোক বললেন, তিনটে চেয়ার, একটা তেপায়া টেবিল আর একটা মোমবাতি। মোমবাতিটা লাগবে কাজ শেষ হয়ে যাবার পর।
আমি আর অর্ধেন্দুবাবু দিন থাকতে দুটো সাইকেল রিকশায় করে চেয়ার টেবিল পাঠিয়ে দিয়েছিলাম বাংলোতে। সেই ফাঁকে বাড়িটা একটু ঘুরে দেখে নিলাম। বহুঁকাল কেউ থাকে না, তাই ঘরগুলোর। অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। আমরা স্থানীয় লোক লাগিয়ে একটা ঘর বেছে নিয়ে সেটাকে ঝাড়পোঁছ করিয়ে একটু ভদ্রস্থ করে নিলাম। এটাই বোধহয় ছিল বৈঠকখানা। বাড়িটা পাহারা দেবার জন্যও একটি লোককে জোগাড় করা হয়েছিল, সে প্রথমে সাহেবের ভূত সাহেবের ভূত করে একটু আপত্তি তুলেছিল, তারপর হাতে একটা দশ টাকার নোট গুঁজে দিতেই চুপ মেরে গেল।
রাত দশটার একটু আগেই আমরা তিনজন বাড়িটার সামনে জমায়েত হলাম। কথা হল ভূত এলে প্রশ্ন করবেন অর্ধেন্দুবাবু, আর উত্তর তো উৎপলবাবুর মুখ দিয়ে সাহেবের ভাষাতেই বেরোবে–অবিশ্যি সব যদি ঠিকমতো হয়। অর্ধেন্দুবাবু ইংরেজিটা মোটামুটি ভালই বলেন। সেদিক দিয়ে সুবিধে আছে। উৎপলবাবুকে দেখলাম সঙ্গে করে একটা কৌটো এনেছেন। জিজ্ঞেস করতে বললেন, ওতে কপূর আছে। প্ল্যানচেটের ব্যাপারে খুব সাহায্য করে।
মোমবাতির আলোয় সব তোড়জোড় হল। তিনজনে তেপায়া টেবিলের তিনদিকে বসে টেবিলের উপর হাত উপুড় করে রাখলাম। তারপর বাতি নিভিয়ে চোখ বন্ধ করে সাহেবের চিন্তায় মগ্ন হলাম।
গাছপালায় ঘেরা বাংলো, বাইরে বাতাস দিচ্ছে তার ফলে মাঝে মাঝে পাতার শোঁ শোঁ শব্দ পাচ্ছি। কিছুক্ষণ পরে বোধহয় বাতাস থেমে যাওয়ায় আর কোনও শব্দ পাওয়া গেল না। অমাবস্যার রাত, তার উপরে আকাশে মেঘ; রাস্তায় আলোও নেই যে জানলা দিয়ে ঢুকবে। তাই ঘরের ভিতর দুর্ভেদ্য অন্ধকার।
কতক্ষণ এইভাবে ছিলাম জানি না। হঠাৎ অনুভব করলাম টেবিলটা মৃদু মৃদু নড়ছে। সেটা একটু বেড়ে যাওয়ায় খটখট শব্দ শুরু হল। আমি জানি এ ধরনের প্ল্যানচেটে সেটা ভূত নামার লক্ষণ।
আমরা টেবিলের উপর থেকে হাত সরাচ্ছি না, কিন্তু বেশ বুঝতে পারছি হাত আর অনড় নেই, টেবিলের সঙ্গে সঙ্গে উঠছে নামছে।
আঁ—-
শব্দটা উৎপলবাবুর গলা থেকে বেরোলো। আগে থেকেই অর্ধেন্দুবাবুকে বলা ছিল। উনি কাঁপা গলায় প্রশ্ন করলেন,
ইজ এনিওয়ান হিয়ার?
উৎপলবাবুর মুখ থেকে সম্পূর্ণ সাহেবি গলায় উত্তর এল—
ইয়েস।
হু ইজ ইট?
মাই নেম ইজ নরিস।
বাকি কথাও ইংরেজিতেই হল, এবং নরিস সাহেবের ইংরেজি যাকে বলে বেশ চোস্ত ইংরেজি। আমি কথোপকথনটা মোটামুটি বাংলাতেই বলছি।
অর্ধেন্দুবাবু বললেন, এই বাংলো কি তোমার বাসস্থান ছিল?
ইয়েস।
তুমি কী করতে হাজারিবাগে?
আমার অভ্রের খনি ছিল।
শহরে আরও সাহেব ছিল?
ইয়েস। অভ্রের খনির মালিকদের একটা ক্লাব ছিল, ভিক্টোরিয়া ক্লাব! আমি সে ক্লাবের সভ্য ছিলাম।
এই বাড়িতে তোমার আগে হালদার বলে একজন ছিলেন?
হ্যাঁ, ছিলেন!
তিনি কি এই বাড়ি তোমাকে দিয়ে যান?
হ্যাঁ।
তারপর তিনি কোথায় যান?
কলকাতায়। সেখানেই মৃত্যু হয়।
