আমি তখন হাজারিবাগে। একটা হোটেলে আছি, নাম ডি লাক্স হোটেল, কিন্তু ব্যবস্থা চলনসইয়ের বেশি নয়। তাতে কিছু এসে যায় না, কারণ ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যটাকে আমি কখনও খুব উঁচুতে স্থান দিই না। নানান অবস্থার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াটাই আমার অভ্যেস। হাজারিবাগে কাউকে চিনি না, সেটা আরও ভাল লাগছে, কারণ মাঝে মাঝে একটা অবস্থা আসে যখন প্যাঁচাল পাড়তে একদম ভাল লাগে না। চুপচাপ একা একা বিছানায় শুয়ে কল্পনার স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। তবে এটাও ঠিক যে, ভারতবর্ষে এমন জায়গা নেই যেখানে বাঙালি নেই। বিশেষ করে হাজারিবাগে তো বিস্তর বাঙালি। তাদের মধ্যে এক-আধজনের সঙ্গে যে আলাপ হয়ে যাবে তাতে আর আশ্চর্য কী?
যাঁর সঙ্গে প্রথমে আলাপ হল তাঁর নাম অর্ধেন্দু বসু। ইনি ইতিহাসের লোক, পাবনার একটা জমিদার বংশ–হালদার বংশ–নিয়ে পড়াশুনা করছেন, ইচ্ছে আছে বই লেখার। এই বংশে নাকি অনেক বাঘা বাঘা চরিত্রের পরিচয় মেলে। এঁদেরই এক আদিপুরুষ, নাম রামগতি হালদার, রামমোহনের নাকি খুব কাছের লোক ছিলেন। তা ছাড়া এর পরেও বেশ কিছু সমাজ সংস্কারক নির্ভীক চরিত্রের পরিচয় নাকি এ বংশে মেলে। আমি ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম, এই পরিবার সম্বন্ধে লিখতে আপনার হাজারিবাগ আসতে হল কেন? ভদ্রলোক বললেন, উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এই পরিবারের একজন নাকি হাজারিবাগে একটা বাড়ি করেন। সে ছুটি কাটানোর জন্য, না অন্য কোনও কারণে, সেটা এখনও বুঝতে পারিনি। এই বিশেষ ব্যক্তিটির নাম ছিল মহেশ হালদার। এই মহেশ হালদার অবধি আমি হালদার বংশের ইতিহাস পাচ্ছি, যদিও এঁর সম্বন্ধেও অনেক কিছু জানতে বাকি আছে। এর পরে সব যেন কেমন ব্ল্যাঙ্ক। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এর হাজারিবাগের বাড়িটা আপনি দেখেছেন? অর্ধেন্দুবাবু বললেন, দেখেছি, কিন্তু সেখানেও এক রহস্য। এই বাড়িটাকে এখানকার সকলেই উল্লেখ করে নরিস সাহেবের বাংলো বলে! অথচ মহেশ হালদার যে বিয়ে করেছিলেন সে খবর আমি পেয়েছি, কিন্তু মহেশ হালদারের পরে বংশটার যে কী হল সে খবর পাইনি। সম্ভবত মহেশবাবু নরিস সাহেবকে বাংলোটা বিক্রি করে দেন কোনও কারণে।
কলকাতায় তাঁদের আর কোনও বংশধর নেই? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
অর্ধেন্দুবাবু বললেন, মহেশ হালদার ছিলেন তাঁর বাবা যোগেশ হালদারের একমাত্র সন্তান। তাই তাঁর যদি আর ছেলেপিলে না থাকে তা হলে হয়তো হালদার বংশ মহেশেই শেষ হয়ে গেছে। প্রশাখা আর কোথাও আছে কিনা জানা নেই। আমি শুধু শাখাতেই ইন্টারেস্টেড।
এই বংশ সম্বন্ধে খবর দিতে পারে এমন কোনও লোকের সন্ধান পাননি হাজারিবাগে?
এখানে এক ভদ্রলোক আছেন, আজন্ম এখানেই বাস, তাঁর বয়স নব্বই, নাম কালীকিঙ্কর বাঁড়ুজ্যে। একবার ভাবছিলাম, তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করব।
তা চলুন না আজই বিকেলে যাওয়া যাক।
কালীকিঙ্করবাবুকে সকলেই চেনে, তাই তাঁর বাড়ি বার করতে অসুবিধা হল না। গিয়ে শুনি ভদ্রলোক বৈকালিক ভ্রমণেই বেরিয়েছেন। বুঝে দেখো কীরকম স্বাস্থ্য! নব্বই বছরেও বিকেলে হাঁটা চাই।
আমরা একটু অপেক্ষা করতেই ভদ্রলোক এসে পড়লেন। আমরা নিজেদের পরিচয় দিলাম। ভদ্রলোক বললেন, আমার কাছে তো বড় একটা কেউ আসে না। আপনাদের কোনও প্রয়োজন আছে। বুঝি?
আপনি ঠিকই ধরেছেন, বললেন অর্ধেন্দুবাবু। আমি পূর্ববঙ্গের এক জমিদার বংশ নিয়ে রিসার্চ করছি। হালদার বংশ। তাঁদের একজন ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি হাজারিবাগে একটা একতলা বাংলো বাড়ি করেছিলেন। সেই বাড়িকে এখানকার লোকেরা নরিস সাহেবের বাংলো বলে।
ও–তাই বলুন। ওসব হালদার-ফালদার জানি না; তাঁরা এখানে এসে থাকতে পারেন। আমার যখন সাত কি আট বছর বয়স তখন আমি নরিস সাহেবকে দেখেছি ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতে যেতে। আমায় দেখে মাথা হেঁট করে গুড আফটারনুন বলতেন। তবে তাঁর শেষটা জানেন তো?
আমরা দুজনেই মাথা নেড়ে বললাম জানি না।
ভদ্রলোক আত্মহত্যা করেন, বললেন কালীকিঙ্করবাবু। কারণ জানা যায়নি। লোকে বলে বাড়িটা নাকি হানাবাড়ি। সাহেবের ভূত দেখা যায় এখনও। আমি অবশ্য দেখিনি। খুব জবরদস্ত সাহেব ছিলেন নরিস সাহেব।
তাঁর বাড়িটা কোথায় গেলে দেখা যায় বলতে পারেন?
বাড়ি তো এই কাছেই।
কালীকিঙ্করবাবু আমাদের রাস্তা বাতলে দিলেন। আমরা দুজনে তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে উঠে পড়লাম।
রাস্তায় বেরিয়ে এসে অর্ধেন্দুবাবুকে বললাম, আপনি এতদিন সে বাড়ি দেখেননি?
ভদ্রলোক বললেন, দেখেছি বইকী, কিন্তু লোকে ঠিক বলছে কিনা একবার যাচাই করে নিলাম। ইনি যা বলবেন সে তো আর ভুল বলবেন না।
আমারও যে বাড়িটা দেখার জন্য কৌতূহল হচ্ছে।
আসুন না, দেখিয়ে দিচ্ছি।
মাথায় টালি বসানো ঢালু ছাতওয়ালা বাড়ি, বাংলোই বলা চলে, যেমন হাজারিবাগে আরও দেখা যায়। টালির অধিকাংশই অবশ্য খসে গিয়ে ছাত ফাঁক হয়ে গেছে। চারদিকে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা চার পাঁচ বিঘে জমির উপর জীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে বাংলোটা। কেউ থাকে না সেখানে, শেষ কবে ছিল তাও কেউ বলতে পারে না।
আমি অর্ধেন্দুবাবুকে বললাম, আপনার হালদার বংশের কথা জানি না মশাই, কিন্তু এই নরিস। সাহেবকে নিয়ে আমার বিলক্ষণ কৌতূহল হচ্ছে। আর সত্যি বলতে কি, এই সাহেবের প্রেতাত্মার সঙ্গে যদি যোগস্থাপন করা যায়, তা হলে তো ইনি মহেশ হালদার সম্বন্ধে কিছু তথ্য দিতে পারেন। তাই নয় কি?
