আমি একটু হেসে বললাম, আর আমার সঙ্গে ধনদৌলতও কিছু নেই।
জয়ন্তবাবু চলে গেলেন। পরোপকারটা সকলের আসে না। অধিকাংশ মানুষই স্বার্থপর হয়–অন্তত আমার অভিজ্ঞতা তাই বলে। কিন্তু জয়ন্তবাবুকে দেখলাম তিনি শুধু পরোপকারীই নন, যা করেন তা হাসিমুখে করেন।
ঘুম এল না। ঘণ্টাখানেক পরে জয়ন্তবাবু আবার এসে বললেন, জেগেই যখন আছেন তখন চটপট খেয়ে নিন। আপনার স্টু তৈরি–আমি খোঁজ নিয়েছি। আপনার তো ডাইনিং রুমে যাওয়ার কোনও প্রশ্ন ওঠে না, আমি বেয়ারাকে বলছি আপনার ঘরেই খাবারটা এনে দেবে।
আমি অগত্যা রাজি হয়ে গেলাম।
.
রাত্রে ঘুম ভালই হল। সকালে বুঝতে পারলাম শরীরটা বেশ হালকা বোধ হচ্ছে। ডাক্তারের ওষুধ তা হলে কাজ দিয়েছে।
আমি বাথরুমে গিয়ে মুখ ধুয়ে দাড়িটা পর্যন্ত কামিয়ে ফেললাম। দেখলাম কোনও অসুবিধা হচ্ছে না।
আটটা নাগাদ জয়ন্তবাবু এলেন। বললেন, বাঃ–দিব্যি ফ্রেশ লাগছে। দেখি তো টেম্পারেচারটা।
টেম্পারেচার উঠল ৯৮.৮। অর্থাৎ জ্বর নেই বললেই চলে।
আমি একটা কথা জয়ন্তবাবুকে না বলে পারলাম না, এবং সেটা অন্তর থেকেই বললাম। ভদ্রলোকের ডান হাতটা আমার দুহাতে চেপে বললাম, আপনি আমার জন্য যা করলেন, এ ঋণ পরিশোধ হওয়ার নয়। সত্যি, বিপদে আপনার মতো বন্ধু না পেলে কী করতাম জানি না।
বন্ধুই যদি বললেন তা হলে আর আপনি কেন? বললেন জয়ন্তবাবু। তুমি-তে নেমে আসা যাক না। আড়ষ্টভাবটা তা হলে একেবারে কেটে যায়।
এত অল্প সময়ে আপনি থেকে তুমিতে নামাটা বোধহয় স্বাভাবিক নয়, কিন্তু প্রস্তাবটায় আমি আপত্তি করতে পারলাম না। বললাম, বেশ তো, তোমার যদি আপত্তি না থাকে তো আমারও নেই। তুমিই চলুক।
তা হলে আজকের দিনটা এখানে থেকে কালকে রওনা হওয়া যাক, কী বলো? আজ একটা গানবাজনার ব্যাপার আছে সিংহসদনে, সেটা সন্ধ্যায় দেখা যেতে পারে। আমার মেয়ে অনেক করে বলে দিয়েছে।
আমি বললাম, তথাস্তু।
পরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট খেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। শরীরটা ঝরঝরে লাগছে। জ্বরের লেশমাত্র নেই।
এবার জয়ন্তকে মারুতিতে তুলে আমরা আগে গেলাম, পিছনে অ্যাম্বাসাডার। পথে নানান গল্পে, রাস্তার পাশে চায়ের দোলনে নেমে চা খাওয়ায়, পাণ্ডুয়াতে নেমে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ ঘুরে দেখায়, বন্ধুত্বটা আরও জমে উঠল। মনে মনে বললাম, এ লোকটা এতদিন কোথায় ছিল? কী আশ্চর্যভাবে মানুষে মানুষে আলাপ জমে ওঠে। এর সঙ্গে কলকাতায় গিয়ে অনেক দেখা হবে, সুখ দুঃখের কথা হবে, দুজনে সন্ধ্যায় বসে দাবা খেলব, ভাবতেও মনটা খুশিতে ভরে উঠল।
কলকাতা পৌঁছে স্বভাবতই জয়ন্তকে আগে নিউ আলিপুরে পৌঁছে দিয়ে বললাম, বাড়ি তো চিনে গেলাম; এবার একদিন সপরিবারে আসব।
বাড়িতে এসে স্ত্রী মনোরমাকে সব ঘটনা বললাম, অতি মূল্যবান জিনিস লাভ হল। একটি নতুন, খাঁটি বন্ধু।
চিঠিটা এল তিনদিন পরে। লেখা হয়েছে শান্তিনিকেতন থেকে ফিরেছি সেইদিনই, কিন্তু স্থানীয় ডাকের সাহায্যে এই অল্প পথটুকু আসতে লেগেছে তিনদিন। চিঠিটা এই–
ভাই অমিয়,
পঁচিশ বছর পরেও তোকে আমার চিনতে অসুবিধা হয়নি, কিন্তু আমার দাড়ির জন্য তুই বোধহয় আমাকে চিনতে পারিসনি। আমার আসল নামটা আমি তোকে বলিনি, আর সেই সঙ্গে আরও কিছু কথা বানিয়ে বলেছি, কারণ আমার আসল পরিচয়টা জানলে তোর সঙ্গে বন্ধুত্বটা হত না, আর সেইসঙ্গে আমার প্রায়শ্চিত্তটাও হত না। আমি হলাম তোর স্কুলের সহপাঠী কৌশিক মিত্র–ডানাম রেন্টু। তোকে নিশ্চয়ই মনে করিয়ে দিতে হবে না যে, তার সঙ্গে সাপে-নেউলে সম্পর্ক ছিল আমার। তুই ছিলি ক্লাসের ভাল ছেলে, আর আমি ছিলাম সেরা শয়তান। তোর পিছনে যে কতদিন ধরে কতরকম ভাবে লেগেছি, সেটা আজ ভাবতে অবাক লাগছে। তোর যদি সেইসব দিনের কথা মনে করে কোনও তিক্ত ভাবও থেকে থাকে, আশা করি এই দুদিনের বন্ধুত্বে সেটা কেটে গেছে। মনে রাখিস, আমরা দুজনেই এখন অন্য মানুষ, স্কুল হল সুদূর অতীতের ব্যাপার। এই নতুন সম্পর্কটাই আসল, পুরনোটা কিছু না।
ইতি তোর বন্ধু
রেন্টু
পুনঃ তুমি থেকে তুইয়ে নামতে আপত্তি নেই তো?
আমি চিঠিটা পেয়ে তখনই উত্তর দিয়েছিলাম–
ভাই রেন্টু,
তোর চিঠিটা পেয়ে খুব খুশি হলাম। আগামী রবিবার সন্ধ্যায় আমি তোর বাড়িতে আসছি। তখন কথা হবে।
সন্দেশ, পৌষ ১৩৯৪
নরিস সাহেবের বাংলো
তারিণীখুড়োকে ঘিরে আমরা পাঁচ বন্ধু বসেছি, বাদলা দিন, সন্ধে হব-হব, খুডোর চা খাওয়া হয়ে গেছে। এবার বিড়ি ধরিয়ে হয়তো গল্প শুরু করবেন। খুড়ো এলে সন্ধেতেই আসেন, আর এলেই একটি করে গল্প লাভ হয় আমাদের। সবই খুডোর জীবনেরই ঘটনা, কিন্তু সে ঘটনা গল্পের চেয়েও মজাদার। একজন লোকের এতরকম অভিজ্ঞতা হতে পারে সেটা আমার ধারণা ছিল না।
খুড়ো বললেন, আমি যে সবসময় চাকরির ধান্দায় দেশ-বিদেশে ঘুরছি তা কিন্তু নয়; মাঝে মাঝে রোজগারের উপর বিতৃষ্ণা এসে যায়, তখন ঘুরি কেবল ভ্রমণের নেশায়। নতুন জায়গা দেখার শখ আমার ছেলেবেলা থেকে। সেইভাবেই একবার গিয়ে পড়েছিলাম ছোটনাগপুর। ও অঞ্চলটা তখনও দেখা হয়নি। আর ওখানেই ঘটে এক আশ্চর্য ঘটনা। সেই গল্পই আজ তোদের বলব।
খুড়ো বিড়িতে একটা লম্বা টান দিয়ে তাঁর গল্প শুরু করলেন।
.
