এবার প্রশ্ন করলাম, আপনি তা হলে আত্মহত্যা করেননি?
উত্তর এল, না। আমার মৃত্যু হয় অকস্মাৎ আমার নিজের অসাবধানতা হেতু। আমি বন্দুক সাফ করছিলাম, কিন্তু সে বন্দুকে যে টোটা ছিল সেটা আমি–
প্রেতাত্মার কথা হঠাৎ থেমে গেছে, কারণ তার কথা ছাপিয়ে আরেকটা গম্ভীর কণ্ঠস্বর শোনা গেছে।
মিথ্যা কথা!
আমি তো থ! এ আবার কার কণ্ঠস্বর? কোন তৃতীয় ব্যক্তি এসে ঢুকল ঘরে?
আমার দৃষ্টি আবার দরজার দিকে ঘুরে গেছে। হ্যাঁ, দরজার মুখে দণ্ডায়মান আরেকটি মূর্তি। যদিও আমি নিজের সাহসের বড়াই করি, কিন্তু যখন দেখলাম এই দ্বিতীয় মূর্তিটি নিরেট নয়, এর পাঁজরের হাড়ের ফাঁক দিয়ে ফাঁক দিয়ে পিছনের আকাশ দেখা যাচ্ছে, তখন গলাটা যে একটু শুকিয়ে যায়নি, তা বলব না। আসলে আগন্তুক একটি নরকঙ্কাল এবং আরও আশ্চর্য এই যে এই কঙ্কালের হাতে একটি বন্দুক।
এবার কঙ্কাল ধীরে ধীরে এগিয়ে এল প্রথম মূর্তির দিকে। এদিকে প্রথম মূর্তি যেন সভয়ে পিছিয়ে যেতে শুরু করেছে দেয়ালের দিকে। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখছি এই ছায়াছবি। মিথ্যে কথা! আবার সজোরে বলে উঠল কঙ্কাল। আমার মৃত্যু আকস্মিক নয়, আমার অন্যমনস্কতার জন্য নয়। বন্দুক চালাতাম আমি তেরো বছর বয়স থেকে; আমি অতটা অসাবধান হতে পারি না।
আমার মন বলছে এই কঙ্কালই আসলে বড়কুমারের প্রেতাত্মা। আমি জিজ্ঞেস করলাম। তা হলে আপনার মৃত্যু হয় কী ভাবে?
আমাকে খুন করা হয়েছিল! গর্জিয়ে উঠল কঙ্কাল। সম্পত্তির লোভে, সিংহাসনের লোভে! এই অন্যায়ের প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত আমি এই বন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি পাচ্ছিলাম না। আজ সেই মুক্তির সুযোগ এসেছে। আজ আমার হত্যার প্রতিশোধ আমি নিজেই নিচ্ছি। পুলিশ সন্দেহ করেছিল আমাকে খুন করা হয়েছে। কিন্তু টাকা দিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করা হয়েছিল, এই সব পাপের শাস্তি দেবার সুযোগ আজ এসেছে। ইষ্টনাম জপ করো প্রতাপ, তোমার অন্তিমকাল উপস্থিত!
প্রথম ছায়া মূর্তির ঘর থেকে বাইরে পালাবার চেষ্টা বিফল করে দিল বন্দুকের গর্জন। ফরাসের উপর লুটিয়ে পড়ল প্রথম ছায়ামূর্তির নিস্পন্দ দেহ। সঙ্গে সঙ্গে কঙ্কাল আমাকে উদ্দেশ করে বলে উঠল, সত্য ঘটনা প্রকাশ হলে আমি শান্তি পাব। আমার এই উপকার করার জন্য আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
এই কথাটা বলে বন্দুকধারী কঙ্কাল অদৃশ্য হয়ে গেল।
আমি একটা দেশলাই জ্বালিয়ে ফরাসের কাছে গিয়ে ধরতেই প্রথম ছায়ামূর্তির রহস্য উদঘাটিত হল। ইনি ছায়ামূর্তি নন; ইনি রক্তমাংসের দেহসম্পন্ন সদ্যোমৃত ধুমলগড়ের রাজা প্রতাপনারায়ণ, যিনি আজ থেকে দশ বছর আগে সম্পত্তি আর গদির লোভে নিজের দাদা আদিত্যনারায়ণকে খুন করে সেটাকে অপঘাত মৃত্যু বলে চালিয়েছিলেন।
এই খুনের অবিশ্যি তদন্ত হয়েছিল, এবং স্বভাবতই তাতে আমাকেও জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল। কারণ আমি ছাড়া আর কোনও তৃতীয় ব্যক্তি ছিল না প্রতাপনারায়ণের সঙ্গে। অথচ যে অস্ত্র দিয়ে তাকে খুন করা হয়েছে তার কোনও চিহ্ন নেই ত্রিসীমানায়, তাই শেষ পর্যন্ত বেকসুর খালাস পেয়ে গেলাম।
সন্দেশ, শ্রাবণ ১৩৯১
নতুন বন্ধু
বর্ধমান স্টেশনের রেস্টোর্যান্টে ভদ্রলোক নিজেই যেচে এসে আলাপ করলেন। ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি আর গোঁফ, মোটামুটি আমারই বয়সী–অর্থাৎ বছর চল্লিশ-বেয়াল্লিশ–বেশ হাসিখুশি অমায়িক হাবভাব। বারোটা বাজে, তাই লাঞ্চটা সেরে নিচ্ছিলাম। আসলে চলেছি শান্তিনিকেতন, আমার সদ্য কেনা মারুতি ভ্যান-এ। ড্রাইভার সন্তোষকেও বলেছি খেয়ে নিতে।
একটা চারজনের টেবিলে বসেছি আমি একা। সবে ভাত আর মাংস অর্ডার দিয়েছি এমন সময় ভদ্রলোক আমার দিকে এগিয়ে এসে বললেন, আপনার টেবিলে বসতে পারি? আমি বললাম, বিলক্ষণ। আমি তো একা। আপনিও একা বুঝি?
আজ্ঞে হ্যাঁ, বললেন। আপনি কোথায় চললেন?
শান্তিনিকেতন।
বাঃ–ভালই হল। আমিও শান্তিনিকেতনেই যাচ্ছি। সেখানে আমার ছেলে আর মেয়ে পড়ে। ওদের দেখতে যাচ্ছি। গিন্নিরও আসার শখ ছিল, কিন্তু আমার শ্বশুরমশাইয়ের শরীরটা হঠাৎ খারাপ হয়ে যাওয়াতে শেষ মুহূর্তে আর আসতে পারল না। আপনি কি ওখানে থাকবেন কিছুদিন?
দিন দুয়েক, বললাম আমি। আমি ওখানে একটা জমি দেখতে যাচ্ছি। একটা ছোট্ট বাড়ি করার ইচ্ছে আছে, যাতে মাঝে মাঝে গিয়ে থাকতে পারি। আমি একজন লেখক। উপন্যাস-টুপন্যাস লিখি।
আপনার নামটা–?
অমিয়নাথ সরকার।
ও হো! আপনার লেখা তো আমি পড়েছি। আপনি তো সাকসেসফুল রাইটার মশাই! দিব্যি লেখেন। একবার ধরলে ছাড়া যায় না।
আপনি শান্তিনিকেতনে কদিন থাকবেন?
আমিও ওই দিন দুয়েক।
আপনার পরিচয়টা–?
আমাকে নামে চিনবেন না। আমি ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশনে কাজ করি; নাম জয়ন্ত বোস।
আমাদের খাবার এসে গেল। ভদ্রলোক দেখলাম অমলেট আর টোস্ট খেলেন, আর তার সঙ্গে এক কাপ চা। দশ মিনিটের মধ্যে খাওয়া শেষ করে আবার রওনা দেওয়ার উদ্যোগ করছি, এমন সময় ভদ্রলোক বললেন, এতটা পথ একা একা যাওয়া কেন–আপনি আমার অ্যাম্বাসাডারে আসুন না; আপনার গাড়ি পেছন পেছন আসুক। বেশ গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে। ৫৯২
প্রস্তাবটা আমার ভালই লাগল। ড্রাইভারকে বলে দিলুম, তারপর জয়ন্তবাবুর গাড়িতে উঠলাম। এই গাড়িটাও মোটামুটি নতুন বলেই মনে হল। ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করতে বললেন বছরখানেক হল কিনেছেন। আমরা পৌনে একটা নাগাদ রওনা দিয়ে দিলাম।
