বর্তমান রাজা প্রতাপনারায়ণ কি শিকার করেন? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
না, বললেন ঈশ্বরীপ্রসাদ। ছোটকুমার চিরকালই একটু আয়েশী প্রকৃতির। খেলাধুলা বা শিকার-টিকারে তাঁর ঝোঁক নেই। সে গান বাজনা নিয়ে থাকে। তাকে হাণ্টিং লজে যেতে হয় না কখনও।
রাত্রে লক্ষ্মীবিলাস হোটেলে চাপাটি আর মুরগির মাংস খেয়ে, খাতা পেনসিল নিয়ে তৈরি হয়ে নিলাম। সেদিন ছিল পূর্ণিমা। আকাশে টুকরো টুকরো মেঘ দ্রুত ভেসে যাবার পথে মাঝে মাঝে চাঁদটাকে আড়াল করছে। পৌনে দশটায় জিপ এসে গেল, আমি হাণ্টিং লজের উদ্দেশে রওনা দিলাম।
মিনিট খানেকের মধ্যেই শহর পিছনে ফেলে জিপ জঙ্গলের পথ ধরল, আর তার দশমিনিট পরেই একটা দোতলা বাড়ির গাড়ি বারান্দার তলায় এসে জিপটা থামল। অর্থাৎ হাণ্টিং লজে এসে গেছি। বুঝতে পারলাম বাড়ির পিছন দিকের জমিটা ঢালু হয়ে জঙ্গলের দিকে নেমে গেছে।
জিপের ড্রাইভার গুরমীত সিং বলল যে দরকার হলে সে সারারাত থাকতে পারে। প্রস্তাবটা আমার ভাল লাগল না। পরিবেশ যত নিরিবিলি হয়, ভূতের আবির্ভাবের সম্ভাবনা তত বেড়ে যায়। বললুম, তুমি এখন যাও, কাল ভোরে ছটায় এসে আমাকে নিয়ে যেয়ো। জিপ চলে গেল।
আমি চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিলুম। একটা টিলার মাথাটা চেঁছে সমতল করে তার উপর তৈরি হয়েছে হাণ্টিং লজটা। পাথরের তৈরি মোগলাই প্যাটার্নের বাড়ি, বয়স নাকি দেড়শো বছর।
পাঁচ ধাপ সিঁড়ি উঠে সদর দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে জানালা দিয়ে আসা ফিকে চাঁদের আলোয় দেখলাম কার্পেট বিছানো এক সুদৃশ্য বৈঠকখানায় এসে পড়েছি। চারিদিকে আসবাবের ছড়াছড়ি, দেয়ালে টাঙানো স্টাফ করা বাইসন হরিণ বাঘ-ভাল্লুকের মাথা। বৈঠকখানার পরে একটা চওড়া বারান্দা, তার ডানদিকে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। আন্দাজ করলুম সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই খোলা ছাতে পৌঁছনো যাবে। সেখান থেকে বাড়ির পিছনের জঙ্গল দেখা যায়, আর সেখানেই বড় কুমারের মৃত্যু হয়েছিল।
মুখের মতো টর্চটা সঙ্গে আনিনি। চাঁদের আলো আছে ঠিকই, কিন্তু সে আর সব জায়গায় প্রবেশ করবে কী করে? তখন আমার চুরুট খাওয়া অভ্যেস। দেশলাই-এর আলোতে সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলায় পৌঁছলুম।
যা ভেবেছিলুম তাই। একপাশে পশ্চিমদিকে খোলা ছাত, তার নিচু পাঁচিলের ধারে গিয়ে দাঁড়ালেই সামনে ঢালু জমির ওপারে গভীর জঙ্গল শুরু হয়েছে। একবার মনে হল যেন বাঘের ডাকও শুনতে পেলুম জঙ্গলের দিক থেকে।
ছাত ছাড়াও একটা বড় ঘর রয়েছে নীচের বৈঠকখানার ঠিক ওপরে। এখানে একটা ফরাস পাতা দেখে বুঝলুম যে শিকারির যদি ঘুম পায় তাই এই ব্যবস্থা। ঘরের দেয়ালে বড় বড় অয়েল পেন্টিং, তার বেশির ভাগই মনে হল এই পরিবারের পূর্বপুরুষদের ছবি। ফরাসের পাশে একটা আরাম কেদারা ছাড়া আরও কয়েকটা ছোট ছোট সোফা রয়েছে।
আমি আরাম কেদারায় বসে একটা চুরুট ধরালুম। পকেট থেকে নোট বই বার করে চেয়ারের হাতলে রাখলুম। শর্টহ্যান্ড লেখার অভ্যাস আছে, দরকার হলে অন্ধকারে লিখতেও কোনও অসুবিধে হবে না। আরেকটা জিনিস আমার কাছে ছিল সেটা হল এক ফ্লাস্ক ভর্তি গরম চা। নভেম্বর মাস, বেশ শীত, ফ্লাস্কের ঢাকনায় চা ঢেলে খেয়ে শরীরটাকে একটু গরম করে নিলুম।
চির-প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী আমারও বিশ্বাস ছিল যে ভূতের আবিভাব যদি হয়ই, তবে সেটা। মাঝরাতে, অর্থাৎ বারোটায়। বাইরে ক্রমে নিস্তব্ধ হয়ে আসছে, তার মধ্যে মাঝেমাঝে শেয়াল গোষ্ঠী কেয়া হুয়া হুয়া করে সরব হয়ে উঠছে। খবরের কাগজের আপিসে কাজ করে রাত জাগার অভ্যেস হয়ে গেছে, তবে এ পরিবেশ কেমন যেন ঝিমধরা। তার উপরে দরজা-জানলা দিয়ে আসা আবছা চাঁদের আলো ঘরটাকে কেমন যেন একটা স্বপ্নরাজ্যের চেহারা এনে দিয়েছে। তাই বোধহয় ঘাড়টা। একবার একটু নুয়ে পড়েছিল, এমন সময় একটা ব্যাপারে সজাগ হয়ে উঠলুম।
আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে ঘরে একটি নতুন ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে।
আমি ছাতের দরজার দিকে দৃষ্টি ঘোরালাম।
সমস্ত দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি ছায়ামূর্তি।
মূর্তি নিঃশব্দে প্রবেশ করে ধীরপদে এগিয়ে এসে ঘরের মাঝখানে দাঁড়াল। মুখ বোঝার উপায় নেই, আন্দাজে বোঝা যায় পরনে শিকারির পোশাক।
তোমার কী প্রয়োজন? ইংরাজিতে গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন এল।
আমি কি ধুমলগড়ের বড়কুমারের সঙ্গে কথা বলছি?
হ্যাঁ, আবার সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর।
বললাম, আমি আপনার সঙ্গেই সাক্ষাৎ করতে এসেছি।
কী প্রয়োজনে?
আমি একজন সাংবাদিক। আপনাকে দু-একটা প্রশ্ন করতে চাই।
কী প্রশ্ন?
প্রথম হল–আপনি কেমন আছেন?
উত্তর এল, মৃত ব্যক্তির আত্মা কেমন আছে সেটা কোনও প্রশ্ন নয়।
তা হলে দ্বিতীয় প্রশ্ন করছি।
করুন।
আপনার কি কোনও অতৃপ্ত বাসনা আছে, যে কারণে আপনি এই হাণ্টিং লজ থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না?
মোটেই না। আমার আয়ু আমার জন্মের মুহূর্তেই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। আমি জানতাম আমার মৃত্যু হবে সাতই অগ্রহায়ণ, আমার বত্রিশ বছর বয়সে। আমি এই মৃত্যুর জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলাম, এবং মৃত্যুর আগে আমার সব সাধ মিটিয়ে নিয়েছিলাম। অবিশ্যি কী ভাবে যে মরব সেটা আগে থেকে জানা ছিল না।
বলা বাহুল্য, আমি সব কিছুই শর্টহ্যান্ডে লিখে নিচ্ছি।
