লেখাটা পড়ার পর থেকেই আমার মাথায় একটা অদ্ভুত ফন্দি ঘুরতে লাগল। এটা আমার বিশ্বাস এবং অনেকেরই বিশ্বাস যে মানুষ মরে গেলে ভূত হয় তখনই যখন মৃত্যুটা স্বাভাবিক না হয়ে হয় অপঘাত জাতীয় কিছু। খুন, আত্মহত্যা, বাজ পড়ে মরা, মোটর ক্র্যাশে মরা, জলে ডুবে মরা, হিংস্র জানোয়ারের হাতে মরা–এ সব ক্ষেত্রেই মৃত ব্যক্তির আত্মার টেনডেন্সি হয় যে তল্লাটে মৃত্যু হয়েছে তারই আশেপাশে ঘোরাফেরা করা–যেন সে অকালে প্রাণ হারিয়ে পৃথিবীর মায়া কাটাতে পারছে না।
ডেকান হেরাল্ডের পুরনো ফাইলেই জানতে পারলাম যে দশ বছর আগে ধুমলগড়ের বড় কুমার আদিত্যনারায়ণ হাণ্টিং লজে বন্দুক সাফ করার সময়ে অকস্মাৎ গুলি ছুটে গিয়ে মারা যান। অবিশ্যি মৃত্যুটা আত্মহত্যাও হতে পারে, কিন্তু সঠিক জানার কোনও উপায় ছিল না, অপঘাত ঠিকই, আর তাই প্রেতাত্মার উপস্থিতিতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।
আমার মনে হল, এই প্রেতাত্মার দেখা পেলে তার একটি সাক্ষাৎকার নিলে কেমন হয়? কী কারণে সে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে উঠতে পারছে না সেটা জানা যাবে কি? কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছিল তার সঠিক বর্ণনা পাওয়া যাবে কি? তার অতৃপ্ত বাসনা কিছু আছে কি এবং সে বাসনা পূর্ণ হলেই কি সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরলোকে প্রস্থান করতে পারবে?
আমার কাগজের সম্পাদক জগন্নাথ কৃষ্ণানকে বলে সাতদিনের ছুটি নিয়ে ধুমলগড় পাড়ি দিলাম। যারা অন্ধকার ঘরে টেবিলের চারপাশে ঘিরে বসে প্ল্যানচেট করে, তারাও প্রেতাত্মার সঙ্গে কথোপকথন চালায়, কিন্তু সেটা হয় একটি তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে, যাকে বলে মিডিয়াম। এখানে ভূতকে দেখা যায় না, ফলে মিডিয়াম যদি খাঁটি না হয় তা হলে বুজরুকির অনেক সুযোগ থাকে। প্ল্যানচেটে তাই আমার বিশ্বাস নেই। তবে ভূতে বিশ্বাস আছে কারণ তোরা তো জানিস, ভূতের অভিজ্ঞতা আমার নিজেরই অনেকবার হয়েছে।
ধুমলগড়ের ছোটকুমার প্রতাপনারায়ণ এখন গদিতে বসেছে, কারণ বাপ শঙ্করনারায়ণ মারা গেছেন। বছর পাঁচেক হল। বড় ছেলে আদিত্য হাণ্টিং লজে মারা যাওয়ায় বাপের সম্পত্তি ও সিংহাসন ছোটকুমারই পেয়েছে।
এস্টেটের ম্যানেজারকে আগেই চিঠি লিখে আমার আসার কথা জানিয়ে দিয়েছিলাম। ধুমলগড় পৌঁছে ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করে আমার অভিপ্রায় জানালাম। ম্যানেজার ঈশ্বরীপ্রসাদ বললেন যে একবার রাজার সঙ্গে কথা বলে নেওয়া দরকার। সকলকে হাণ্টিং লজে ঢুকতে দেওয়া হয় না।
ঈশ্বরীপ্রসাদই রাজার সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করিয়ে দিল। রাজার সুসজ্জিত আপিসঘরে সকালে প্রতাপনারায়ণের সঙ্গে দেখা করলাম। বয়স চল্লিশের বেশি না, চাড়া দেওয়া গোঁফ, শরীরে চর্বি যেন একটু বেশি। পোশাক একেবারে সাহেবি ধরনের, তার সঙ্গে দুহাতের আঙুলের আংটির বহর কেমন যেন বেমানান।
রাজাসাহেব আমাকে আসার কারণ জিজ্ঞেস করাতে অকপটে তাকে সব বলে দিলুম। রাজা শুনে বললেন, এ তোমার খুবই উদ্ভট শখ তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তবে আমায় জিজ্ঞেস করলে আমি বলব যে আমার দাদা লজে ভূত হয়ে অবস্থান করছেন এটা আমি মোটেই বিশ্বাস করি না। ভূত জিনিসটাতেই আমি বিশ্বাস করি না। আর সে ভূত থাকলেও সে তোমার সঙ্গে কথা বলবে, তোমার প্রশ্নের জবাব দেবে, এমন আশা করাটাই বোধ হয় ঠিক না।
আমি তখন ম্যাকার্ডি সাহেবের কথা বললাম। প্রতাপনারায়ণ বলল, ম্যাকার্ডির ধারণা ভারতবর্ষ হচ্ছে ভূত-প্রেতের ডিপো। তাকে বলে বোঝাতে পারিনি যে এ ধারণা ভুল। পোড়োবাড়ি দেখলেই সাহেব সেটাকে ভূতের বাড়ি বলে ধরে নিত। সাহেবের পুরো ব্যাপারটাই কল্পনাভিত্তিক।
আমি বললাম, তাও একবার যাচাই করতে ক্ষতি কী? এতদূর যখন এসেছি, তখন, কোনওরকম অনুসন্ধান না করেই ফিরে যাব?
আমার গোঁ দেখে প্রতাপনারায়ণ শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন। রাজবাড়ি থেকে হাণ্টিংলজের দূরত্ব। দেড় মাইল। পাতলা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সাপের মতো আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে নাকি সেখানে পৌঁছাতে হয়। ঈশ্বরীপ্রসাদকে বলে রাজা আমার জন্য একটা জিপের বন্দোবস্ত করে দিলেন। সেটা আমাকে রাত দশটা নাগাত পৌঁছে দিয়ে আবার ভোরবেলা গিয়ে নিয়ে আসবে।
বিকেলে ঈশ্বরীপ্রসাদের সঙ্গে বসে একটু আলাপ আলোচনা করলাম। লোকটা অনেকদিন ম্যানেজারি করেছে, বয়স সত্তরের কাছাকাছি। দুই কুমারকেই সে ছেলেবেলা থেকে বড় হতে দেখেছে। বলল দুই ভাইয়ের স্বভাবচরিত্রে অনেক বেমিল থাকলেও দুজনের মধ্যে বেশ হৃদ্যতা ছিল। দাদার মৃত্যুতে প্রতাপনারায়ণ খুবই বিচলিত হয়ে পড়েছিল। আত্মহত্যার কোনও কারণ ছিল না। ঈশ্বরীপ্রসাদ নিজেও খুবই আঘাত পেয়েছিল। বড়কুমার এভাবে অকস্মাৎ মরবে সেটা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। শিকারি হিসাবে সে ছিল খুব পাকা। হাত ফসকে গুলি ছুটে গিয়ে নিজের গায় লাগবে সেটা বিশ্বাস করা খুব কঠিন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, বড়কুমারের মৃত্যুর ব্যাপারে কোনও তদন্ত হয়েছিল কি?
ঈশ্বরীপ্রসাদ বললেন, পুলিশ ইন্সপেক্টর মহাদেব দেওয়ান তদন্ত করেছিলেন। তাঁর ধারণা–এটা অপঘাত মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই না। কারণ আদিত্যনারায়ণের হাতে বন্দুক ছিল, এবং তার ডান হাতের তর্জনী বন্দুকের ট্রিগারের সঙ্গে লাগানো ছিল। কাজেই আত্মহত্যা বা অ্যাক্সিডেন্টু দুটোই সম্ভব। আসলে কী হয়েছিল তা বলা মুশকিল।
