সশরীরে এসে পড়ে সমরেশের যে খুব ভাল লাগছিল তা নয়। দুজনের জগৎটা যে একেবারে আলাদা হয়ে গেছে সেটা সে বেশ বুঝতে পারছিল। পৃথিবীর চল্লিশটা বড় শহরের কত লক্ষ লোককে সে তার জাদুবলে বশ করেছে, আরও কত লক্ষকে করবে। আর সুশীল? কত সংকীর্ণ তার জগৎটা! ভাবলে অনুকম্পাই হয়। বইটা পেলেই সমরেশ উঠবে। এর সঙ্গে বসে গালগল্প করার সময় তার নেই।
তুমি চালটা ঠিকই চেলেছ, বলল সমরেশ। এমনিতে হয়তো সত্যিই আসা হত না। শো চলছে তো শহরে, তাই বেজায় ব্যস্ত। এবার বইটা যদি ফেরত দাও তো উঠে পড়ি।
বই?
আছে তো? না কি—
সুশীল তালুকদার হো হো করে হেসে উঠল।
তোমার কোনও বই আমার কাছে নেই ভাই।
সে কী!–যা আশঙ্কা করেছিল তাই। সে বই পাচার হয়ে গেছে।
বই আছে তোমার বাড়িতেই, বলল সুশীল তালুকদার।
মানে? খাতায় যে তোমার হাতে লেখা দেখলাম–
তা থাকবে না কেন? খাতাটা কোথায় থাকত সেটা তো আমার জানা। ওই ছোঁকরাটির কথা শুনেই যখন বুঝলুম তোমার সঙ্গে দেখা হবে না, তখন মাথায় একটা মতলব এল। দেখিই না একটু রগড় করে! ওকে স্লিপ দিয়ে হটিয়ে দিলুম। তারপর দেরাজ খুলে দেখলুম নোটবুক সেখানেই আছে। ম্যাজিকের বইটা শেলফে দেখতে পাচ্ছিলুম, লিখে দিলুম খাতায় সেটার নাম, আমার নাম আর দশ বছর আগের একটা তারিখ। তারপর দুভম বইয়ের এক ভলম বার করে নিয়ে লুকিয়ে রেখে দিলুম তোমারই ঘরে।
কোথায়? তোমার যে বাক্স প্যাটার্নের পুরনো গ্রামোফোনটা আছে, সেটার ঢাকনা খুললেই পাবে।
কিন্তু কিন্তু… কিঞ্চিৎ আশ্বস্তভাবের সঙ্গে একটা হতভম্ব ভাব সমরেশের মনটাকে দুভাগে চিরে ফেলেছে। এরকম পাগলামির কারণটা কী?
কারণটা আর কিছুই না, ভাই, বলল সুশীল তালুকদার, সেদিন সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলুম আমার দুই মেয়ের অটোগ্রাফের খাতা। ব্রামা দ্য গ্রেট আমার কলেজের সহপাঠী ছিল সেটা তাদের বলেছি। তার উপরে তোমার ম্যাজিক দেখে তারা অভিভূত। আবদার করল তোমার সই নিয়ে আসতে হবে। তুমি তো দেখা করলে না। তারা শুনে প্রচণ্ড খাপ্পা, তোমার উপর থেকে ভক্তি চলে যায় আর কি! এটা হবে আমি জানি, যদিও হওয়াটা মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়। বললুম, বেচারা অসুখের জন্য আসতে পারেনি, এবার দেখিস একেবারে আমাদের বাড়িতে এসে হাজির হবে। আর হলও তো তাই!-ওরে রুনু ঝুনু! তোরা আয় রে!–দেখে যা তোদের বাপের কথা ঠিক হল কিনা!
পরক্ষণেই পর্দা ফাঁক করে বারো থেকে ষোলো বছর বয়সের দুটি ছিপছিপে মেয়ে মুখে সলজ্জ হাসি ও চোখে উজ্জ্বল দৃষ্টি নিয়ে ঘরে ঢুকে সমরেশকে প্রণাম করে তার সামনে খাতা কলম ধরল।
সই দিতে দিতে সমরেশ ব্রহ্ম ভাবল, তাকে ধাপ্পা দিতে পারে এমন লোকও এই কলকাতা শহরেই আছে, এটা তার জানা ছিল না!
সন্দেশ, চৈত্র ১৩৮৮
ধুমলগড়ের হাণ্টিং লজ
মাথায় অনেকরকম উদ্ভট শখ চাপে মানুষের, বললেন তারিণীখুড়ো, কিন্তু আমার যেমন চেপেছে, তেমন কজনের চাপে জানি না।
আমরা পাঁচজন ঘিরে বসেছি খুড়োকে। বাইরে এক পশলা বেশ ভাল বৃষ্টি হয়ে গিয়ে এখন সেটা অবিরাম ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে দাঁড়িয়েছে। আষাঢ় মাস, তার উপর লোডশেডিং, টিম টিম করে দুটো মোমবাতি জ্বলছে, দেয়ালে আমাদের সকলের প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ছায়া পড়েছে–সব মিলিয়ে তারিণীখুড়োর গল্প শোনার পক্ষে আইডিয়াল পরিবেশ। খুড়োর মতে তাঁর গল্পগুলো সবই সত্যি। এ ব্যাপারে গ্যারান্টি দেবার সাধ্যি আমার নেই, তবে গল্পগুলো যে রঙদার তাতে কোনও সন্দেহ নেই, আর তারিণীখুডোর যে গত চল্লিশ বছর ধরে সারা ভারতবর্ষ ঘুরে নানারকম অভিজ্ঞতা হয়েছে সে কথা বাবা আমাদের বলেছেন, কাজেই সেটা অবিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই।
ন্যাপলা বলেই বসল, আজ কিন্তু ভূতের মতো আর কোনও গল্প জমবে না।
তারিণীখুড়ো ইস্কুল মাস্টারি ঢং-এ বললেন, ভূত সচরাচর চার প্রকার হয়। এক অশরীরী আত্মা, যাকে চোখে দেখা যায় না; দুই ছায়ামূর্তি; তিন, নিরেট ভূত–দেখলে মনে হবে জ্যান্ত মানুষ, কিন্তু চোখের সামনে ভ্যানিশ করে যাবে; আর চার, নরকঙ্কাল–যদিও সে কঙ্কাল চলে ফিরে বেড়ায় এবং কথা বলে। আমার চাররকম ভূতেরই অভিজ্ঞতা হয়েছে।
আজ কোন প্রকার ভূতের গল্প বলছেন আপনি? ন্যাপলা প্রশ্ন করল।
সে কথায় কান না দিয়ে, দুধ-চিনি ছাড়া গরম চায়ে একটা চুমুক দিয়ে খুড়ো তাঁর গল্প শুরু করলেন।
তোরা তো পত্রিকা-টত্রিকা পড়িস, নিশ্চয়ই লক্ষ করেছিস যে আজকাল এই সময় ডেকান হেরাল্ডের ফাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে বছর সাতেকের পুরনো একটা লেখা চোখে পড়ল। লেখক এক সাহেব–নাম রবার্ট ম্যাকার্ডি। লেখার বিষয় হল ধুমলগড়ের হাণ্টিং লজ। ধুমলগড় মধ্যপ্রদেশের একটা ছোট্ট শহর, চাঁদা থেকে সত্তর কিলোমিটার পশ্চিমে। চারিদিকে জঙ্গল, আর সেই জঙ্গলেরই একটা অংশে একটা টিলার উপর রাজার হাণ্টিং লজ বা শিকারাবাস–দিব্যি আরামে রাত্রিবাস করা যায় এমন একটা বাড়ি, আবার তার খোলা ছাতে বসে জন্তুজানোয়ারও মারা যায়। ভারতবর্ষের বহু প্রদেশে বহু মৃগয়াপ্রিয় রাজাদের এইরকম হাণ্টিং লজ আছে; ম্যাকার্ডি সাহেব এইগুলো স্টাডি করতেই ভারতবর্ষে এসেছিলেন। ৪১৬
ধুমলগড়ের হাণ্টিং লজে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করেন যে লজটি হন্টেড। অর্থাৎ সেখানে একটি প্রেতাত্মা বাস করে। ম্যাকার্ডি খবর নিয়ে জানেন যে ওই হাণ্টিং লজেই ধুমলগড়ের বড়কুমার আদিত্যনারায়ণের মৃত্যু হয়। ছোটকুমার প্রতাপনারায়ণ সেটা ভেরিফাই করে।
