কেন বলুন তো?
আজ বিক্রমাদিত্যের ছবিটা আঁকা শুরু করব। তুমি এলে ভাল হয়।
আমি তো জানতুম আপনি সকালে ছাড়া ছবি আঁকেন না।
এটার জন্য স্পেশাল ব্যবস্থা, বললেন মার্তন্ড। এ ছবির জন্য যে মুডটা চাই সেটা রাত্রেই ভাল আসবে। আর দৃশ্যটার জন্য আমি নিজে প্ল্যান করে একটা লাইটিং-এর ব্যবস্থা করেছি। আমি সেটা তোমাকে দেখাতে চাই।
কিন্তু মডেল যদি আপত্তি করে?
তুমি যে ঘরে আছ সেটা সে জানবেই না। তুমি ঠিক সাতটার সময় এসে স্টুডিয়োর এই কোণটাতে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকবে। আলোগুলো সব মডেলের উপর ফেলা থাকবে। তার পিছনে কী আছে সেটা সে দেখতেই পাবে না।
এককালে অ্যামেচার থিয়েটার করেছি। জানতুম ফুটলাইটের পিছনে দর্শকদের প্রায় দেখাই যায় না। এও সেই ব্যাপার আর কী।
আমি রাজি হয়ে গেলাম।
একটা ধুকপুকুনির ভাব নিয়ে সাতটার ঠিক পাঁচ মিনিট আগে হাজির হলুম মার্তণ্ডের বাড়ি। ওঁর মাদ্রাজি চাকর শিবশরণ আমাকে দরজা ফাঁক করে ঢুকিয়ে দিলে স্টুডিয়োতে।
মডেলের জায়গা এখনও খালি। তবে লাইটিং হয়ে গেছে এবং সত্যিই তারিফ করার মতো ব্যাপার সেটা। যে শ্মশানে ভূত পিশাচের নৃত্য হচ্ছে সেখানে এইরকম আলোরই দরকার।
মার্তণ্ড বসে আছে ক্যানভাসের সামনে, তার পাশে একটা জোরালো ল্যাম্প। সে আমাকে আড়চোখে দেখে একটা বিশেষ দিকে নির্দেশ করল। সেটা হল স্টুডিয়োর সঙ্গে লাগা একটা ঘরের দরজা। বুঝলাম সে ঘরে মডেল তৈরি হচ্ছেন।
এবারে আরেকটা জিনিসের দিকে দৃষ্টি গেল। সেটা হল কঙ্কাল। একটা হ্যাটস্ট্যান্ডের ডাঁটি থেকে সেটা ঝুলছে। তার গায়ে ভৌতিক আলো পড়ে সেটা আরও ভৌতিক দেখাচ্ছে। আর তার সঙ্গে ভৌতিক হাসি। তোরা লক্ষ করেছিস কিনা জানিনাবত্রিশ পাটি দাঁত বেরিয়ে থাকে বলে যে-কোনও খুলির দিকে চাইলেই মনে হয় সেটা হাসছে।
একটা খুট শব্দ শুনে অন্য ঘরের দরজাটার দিকে চোখ গেল। তলোয়ার হাতে রাজপোশাক পরিহিত বিক্রমাদিত্য বেরিয়ে এলেন দরজা খুলে। পাকানো গোঁফ, গালপাট্টা, লম্বা ঢেউ খেলানো চুল–কোনও ভুল নেই। মনটা হু হু করে উঠল, কারণ এই পার্টটা আমারই পাবার কথা, দৈব দুর্বিপাকে ফসকে গেল।
রাজা এসে স্টেজে আলো নিয়ে দাঁড়ালেন। মার্তণ্ড উঠে গিয়ে তার পোজ আর পোজিশনটা ঠিক করে দিয়ে চলে গেলেন হ্যাটস্ট্যান্ডের দিকে। কঙ্কালটাকে নামিয়ে নিয়ে সেটাকে মডেলের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে বললেন, এটার হাত দুটোকে তোমার কাঁধের উপর দিয়ে সামনের দিকে ঝুলিয়ে দাও, আর পা দুটো কোমরের দুপাশ দিয়ে নিয়ে এক করে তোমার বাঁ হাত দিয়ে চেপে থাকো।
দেখলুম মডেল দিব্যি মার্তণ্ডের ইনস্ট্রাকশন পালন করলে। লোকটার সাহসের প্রশংসা না করে উপায় নেই।
মার্তন্ড ছবি আঁকা শুরু করে দিলেন। প্রথমে চারকোল দিয়ে স্কেচটা করে তারপর রং চাপানো হবে। এর আগে তো আমিই মডেল হতুম, তাই আঁকাটা কেমন হচ্ছে সেটা দেখার সুযোগ ছিল না। আজ দেখতে পেলুম মার্তণ্ডের নিপুণ হাতের কাজ।
মিনিট পাঁচেকও হয়নি, হঠাৎ মনে হল স্টেজের দিক থেকে একটা গোঙানির শব্দ পাচ্ছি। আর্টিস্ট এত মশগুল যে তার কানে শব্দটা যায়নি। সে খালি বললে, স্টেডি, স্টেডি, কারণ রাজা অল্প অল্প হেলতে দুলতে শুরু করেছেন।
আর্টিস্টের আদেশ সত্ত্বেও দেখলাম মডেল স্টেডি থাকতে পারছে না; সে এপাশ ওপাশ করছে। আর তার মুখ দিয়ে যে শব্দটা বেরোচ্ছে সেটাকে গোঙানি ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না।
হোয়াটস দ্য ম্যাটার? বিরক্তির সঙ্গে প্রশ্ন করলেন মার্তন্ড।
এদিকে আমি ম্যাটারটা বুঝে ফেলেছি। কারণ চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি কী ঘটছে।
কঙ্কালের হাত দুটো আর ঝোলানো নেই। সেটা ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠে মডেলের থুতনির নীচে এসে ক্রমে একটা ভয়ঙ্কর আলিঙ্গনে পরিণত হচ্ছে। সেই সঙ্গে পা দুটোও যেভাবে জড়িয়ে ফেলেছে কোমরটাকে, সেটা আর কোনওদিন খোলা যাবে বলে মনে হয় না।
মডেলের অবস্থা এখন শোচনীয়। তার গোঙানি ক্রমে পরিত্রাহি আর্তনাদে পরিণত হয়েছে, আর সে তলোয়ার মাটিতে ফেলে দিয়ে সমস্ত দেহটাকে ঝাঁকিয়ে দুহাতের সমস্ত শক্তি দিয়ে কঙ্কালের হাত দুটো আলগা করার চেষ্টা করছে।
মার্তণ্ড একটা চিৎকার দিয়ে দৌড়ে গেছে মডেলের দিকে, কিন্তু দুজনের কম্বাইন্ড চেষ্টা এবং শক্তিপ্রয়োগেও কোনওই ফল হল না। মার্তণ্ড হাল ছেড়ে দিয়ে টলতে টলতে পিছিয়ে এসে ইজেলটাকে উলটে ফেলে দিয়ে আমারই পাশে দেওয়ালের গায়ে এলিয়ে পড়ল।
আমার কিংকর্তব্যবিমূঢ় ভাবটা যদিও বেশিক্ষণ থাকেনি, কিন্তু তার মধ্যেই মডেল কাঁধে কঙ্কাল সমেত মাটিতে গড়িয়ে পড়েছে। এদিকে ঘড়ঘড়ে গলায় মার্তণ্ড বলছে, ডু সামথিং!
আমি এবার এগিয়ে গেলুম মঞ্চের দিকে। আমার কিন্তু ভয় কেটে গেছে এর মধ্যেই, কারণ মন। বলছে কঙ্কাল আমার কোনও ক্ষতি করবে না, আমার চেষ্টায় কোনও বাধা দেবে না।
কাছে যেতেই এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখে মাথাটা ভোঁ করে উঠল। রাজার চুল গোঁফ গালপাট্টা পাগড়ি সবই আলগা হয়ে খসে পড়েছে, আর তার ফলে যে মুখটা বেরিয়ে পড়েছে সেটা আমার চেনা।
ইনি হলেন মার-খাওয়া ফিল্মের হিরো বিশ্বনাথ সোলাঙ্কি।
মুহূর্তের মধ্যে চোখের সামনে থেকে একটা পর্দা সরে গিয়ে জাজ্বল্যমান সত্যিটা বেরিয়ে পড়ল, আর সেই সঙ্গে মাথায় খেলে গেল এক পৈশাচিক বুদ্ধি।
