একটা কেন–দুটো আছে-হাঃ হ্যাঃ হ্যাঃ।
আমি একটু থতমত খেয়ে গেলুম।
আরে কঙ্কাল তো তোমারও আছে! বললেন ভোজরাজ। নেই কি? কঙ্কাল আছে বলেই তো চলে ফিরে বেড়াচ্ছ! তোমার কঙ্কাল আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। কনুইয়ের কাছে হাড়ে চিড় ধরল, ডাক্তার আবার সেটাকে জুড়ে দিল। তুমি জোয়ান বলেই জোড়া লাগল! আমি যদি মাথায় বাড়ি খেয়ে পড়ে হাড় ভাঙতুম, আমাকে কি আর কোনওদিন উঠতে হত?
এই সুযোগে একটা প্রশ্ন না করে পারলুম না।
আমায় কে জখম করল সেটা বলতে পারেন?
এ ভেরি অর্ডিনারি গুণ্ডা,বললেন ভোজরাজ। তবে তার পিছনে অন্য কেউ আছে কি না জানি না। থাকতে পারে। সেটা জানতে পারে আমার কঙ্কাল। সেটা আমার চেয়ে অনেক বেশি জ্ঞানী। তুমি চাইছ সে কঙ্কাল, আমি দিতেও প্রস্তুত আছি–অনেককাল রোজগার নেই, দেনা জমে গেছে বিস্তর, দু হাজার পেলে সব শোধ হয়ে যাবে, আমিও নিশ্চিন্তে মরতে পারি কিন্তু একটা কথা বলি তোমায়। এ কঙ্কাল যে-সে কঙ্কাল নয়। যাঁর কঙ্কাল তিনি ছিলেন সিদ্ধপুরুষ। মাটি থেকে পাঁচ হাত শূন্যে উঠে যোগ সাধনা করতেন। বায়ু থেকে আহার্য আহরণ করতেন, ফলমূলের দরকার হত না। তাঁর তেজ ছিল অসামান্য। একবার তাঁর সাধনার সময় এক চোর তাঁর কুটিরে ঢুকে ঘটিবাটি সরাতে গিয়েছিল। হাত বাড়ানো মাত্র আঙুলগুলো বেঁকে যায়। কুষ্ঠ। কেউটে ছোবল মারতে এলে সাপ ভস্ম হয়ে যেত, বাবাজির কিছু হত না!
আমি একটা কথা না বলে পারলুম না।
কিন্তু এই বাবাজির কঙ্কালকেও তো আপনি বশে এনেছিলেন। একে দিয়ে ভেলকি দেখাতেন স্টেজে।
তা হলে বলি শোনো, বললেন ভোজরাজ। কঙ্কালকে আমি কোনওদিন বশে আনিনি। এ সবই তাঁর খেলা। অন্য যা ম্যাজিক দেখাতুম সেগুলো কিছুই না–সব যন্ত্রপাতির কারসাজি। লোকে ভাবত কঙ্কালের যা কিছু ক্ষমতা সবই গুরুজীর কৃপায়। মনে মনে তাঁর শিষ্য হয়ে আমি একটানা দশ বছর তাঁর পদসেবা করি। তখন আমার তরুণ বয়স–ম্যাজিক সম্বন্ধে একটা কৌতূহল ছিল, এই পর্যন্ত। গুরুজী একবারও আমার কোনও নোটিস নেননি। তারপর একদিন হঠাৎ আমার দিকে চেয়ে বললেন, বেটা, তোর ওপর আমি খুশি হয়েছি। তবে তুই এখন সংসার ত্যাগ করতে যাসনি। তার অনেক কাজ আছে। তুই হবি ভোজবাজির রাজা। তোর নাম হবে। যে কাজে নাম করবি সেই কাজেই আমি তোকে সাহায্য করব, তোর সেবার প্রতিদান দেব। তবে সেটা এখন নয়। আমি মরবার পর।
আমি বললাম, সেটা কীরকম করে হবে যদি বুঝিয়ে দেন।
গুরুজী আমাকে সন তারিখ বলে দিয়ে বললেন, এই দিনে যাবি তুই নর্মদার তীরে মান্ধাতা শহরে। সেখানে শ্মশানে গিয়ে দেখবি একটা বেল গাছ। সেই গাছ থেকে নদীর ধার ধরে পশ্চিমে চলে যাবি নশো নিরানব্বই পা। সেখানে দেখবি বনের মধ্যে একটা তেঁতুল গাছ আর বাবুল গাছের মধ্যে আকন্দ ঝোঁপের পাশে একটা কঙ্কাল। সেটাই আমি। সেটাকে তুই নিয়ে যাস। সেটাই সাহায্য করবে তোর কাজে, তোর আদেশ মানবে, লোকে দেখে তোকে বাহবা দেবে। তারপর কাজ ফুরিয়ে গেলে সেটাকে নদীর জলে ফেলে দিবি। যদি তখনও কাজ বাকি থাকে তা হলে সেটা জলে ডুববে না। তখন আবার তুলে এনে তোর কাছে রেখে দিবি।
সব শুনেটুনে ভোজরাজকে জিজ্ঞেস করলাম, ওটা জলে ফেলে দেবার সময় কি এখনও আসেনি?
ভোজরাজ বললেন, না, আসেনি। একবার মুসির জলে ফেলে দেখেছিলাম, ডোবেনি। এখন বুঝতে পারছি তোমারই অপেক্ষায় ছিলাম। তোমার কর্কট রাশিতে জন্ম তো?
হ্যাঁ।
পঞ্চমী তিথি?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
তবে তুমিই সেই লোক। অবিশ্যি রাশি আর তিথি না মিললেও, তোমাকে দেখেই মনে হয়েছিল তুমি সিধে লোক। বাবার কঙ্কালের হিল্লেটা তোমার হাত দিয়ে হলে ভালই হবে। আমার বিশ্বাস বাবারও তোমাকে ভাল লাগত। তিনি সাচ্চা লোক পছন্দ করতেন।
তা হলে এখন কী করতে হবে?
আগে ওই বাক্সটা খোলো।
ঘরের এক পাশে একটা বড় কাঠের সিন্দুকের দিকে দেখিয়েছেন ভোজরাজ। আমি গিয়ে ডালাটা তুললুম। ভেতরে কিংখাবের কাজ করা একটা গাঢ় লাল মখমলের ওপর হাঁটু ভাঁজ করে কঙ্কালটা শোয়ানো রয়েছে। ভোজরাজ বললেন, ওটাকে তুলে বাইরে আনন।
দেখলাম মিহি তামার তার দিয়ে সুন্দর করে কঙ্কালের হাড়গুলো পরস্পরের সঙ্গে প্যাঁচানো রয়েছে। পাঁজরটা দুহাত দিয়ে জাপটে ধরে কঙ্কালটা.বাইরে আনলুম। ভোজরাজ বললেন, ওটাকে দাঁড় করাও।
করালুম।
এবার হাত দুটো ছেড়ে দাও।
হাত সরিয়ে আনলুম, আর সঙ্গে সঙ্গে আমার চোখ টেরিয়ে গেল।
কঙ্কাল নিজে থেকেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। কোনও সার্পোট নেই।
এবারে ওটাকে গড় করো। এই শেষ কাজের জন্য ওটা তোমারই সম্পত্তি।
কাজটা যে কী জানি না, তবু রিস্ক না নিয়ে গড় না করে একেবারে সাষ্টাঙ্গ হয়ে শুয়ে পড়লুম স্কেলিটনের সামনে।
যা করছ তা বিশ্বাস করে করছ তো? জিজ্ঞেস করলেন ভোজরাজ। বললুম, আমার মনের সব কপাট খোলা, ভোজরাজজী। আমি হাঁচি টিকটিকি ভূত-প্রেত দত্যি-দানা বেদ-বেদান্ত
আইনস্টাইন-ফাইনস্টাইন সব মানি।
ভেরি গুড। এবার তুমি ওটাকে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করো। দেখো যেন গুরুজীর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়। কাজ হয়ে গেলে ওটাকে মুসি নদীর জলে ফেলে দিয়ে।
.
কঙ্কাল পেয়ে অত্যন্ত খুশি হয়ে মার্তণ্ড আমাকে দুশোর জায়গায় পাঁচশো টাকা বকশিস দিয়ে ফেললেন। তারপর বললেন, আজ সন্ধ্যায় কী করছ?
