আমি সোলাঙ্কির উপর ঝুঁকে পড়ে বললাম, এবার বলো তে দেখি, আমার জায়গাটা দখল করার জন্য আমার মাথায় বাড়ি তুমিই মারিয়েছিলে কি না। না বললে কিন্তু কঙ্কালের হাত থেকে তোমার মুক্তি নেই।
সোলাঙ্কির চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে; সে সেই অবস্থাতেই দম বেরিয়ে আসা গলায় বলে উঠল, ইয়েস ইয়েস ইয়েস–প্লিজ সেভ মি, প্লিজ!
আমি মার্তণ্ডের দিকে ফিরে বললুম, তুমি সাক্ষী। শুনলে তো?কারণ এঁকে আমি পুলিশে দেব। মার্তণ্ড মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানিয়ে দিলেন।
এবার কঙ্কালের কাঁধ ধরে মৃদু টান দিতেই সেটা রাজার কাঁধ ছেড়ে উঠে এল, সঙ্গে সঙ্গে কোমর ছেড়ে পা দুটোও।
.
এর পরে অবিশ্যি সোলাঙ্কি মশাইয়ের আর মডেল হওয়া হয়নি, কারণ তাঁকে বেশ কিছুদিন পুলিশের জিম্মায় থাকতে হয়েছিল। তার জায়গায় বিক্রমাদিত্য সিরিজের হিরো হলেন তারিণীচরণ বাঁড়ুজ্জে। ঘটনাটা মার্তণ্ডকেও কাবু করে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু দিন সাতেকের মধ্যেই রিকভার করে তিনি আবার পুরোদমে কাজে লেগে গেলেন।
বেতালের ছবি শেষ হবার পর দিনই মুসি নদীর জলে কঙ্কালটাকে ফেলে দিলাম। চোখের নিমেষে সেটা তলিয়ে গেল জলের তলায়।
সন্দেশ, বৈশাখ ১৩৯০
দুই বন্ধু
মহিম বাঁ হাতের কবজি ঘুরিয়ে হাতের ঘড়িটার দিকে এক ঝলক দৃষ্টি দিল। বারোটা বাজতে সাত। কোয়ার্টজ ঘড়ি–সময় ভুল হবে না। সে কিছুক্ষণ থেকেই তার বুকের মধ্যে একটা স্পন্দন অনুভব করছে, যেটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। বিশ বছর! আজ হল ১৯৮৯-এর সাতই অক্টোবর। আর সেটা ছিল ১৯৬৯-এর সাতই অক্টোবর। পঁচিশ বছরে এক পুরুষ হয়। তার থেকে মাত্র পাঁচ বছর কম। কথা হচ্ছে–মহিম তো মনে রেখেছে, কিন্তু প্রতুলের মনে আছে কি? আর দশ মিনিটের মধ্যেই জানা যাবে।
মহিমের দৃষ্টি সময় কাটানোর উদ্দেশ্যে এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে। সে দাঁড়িয়েছে লাইটহাউস বুকিং কাউন্টারের সামনের জায়গাটায়। যাকে বলে লবি। এখানেই প্রতুলের আসার কথা। মহিমের সামনের দরজার কাঠের ভিতর দিয়ে বাইরের রাস্তা দেখা যাচ্ছে। ওপারে গলির মুখে একটা বইয়ের দোকানের সামনে জটলা। রাস্তায় চারটে বিভিন্ন রঙ-এর অ্যাম্বাসাডর দাঁড়ানো। আর একটা রিকশা। এবার দরজার ওপরে দৃষ্টি গেল মহিমের। হাতে আঁকা চালু হিন্দি ছবির বিজ্ঞাপন। তাতে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে যার জোরে ছবি হিট করেছে সেই চাড়া-দেওয়া গোঁফওয়ালা ভিলেন কিশোরীলালকে। মহিম অবিশ্যি হিন্দি ছবি দেখে না। আজকাল ভিডিও হওয়াতে সিনেমা দেখাটা একটা ঘরোয়া ব্যাপার হয়ে গেছে। আর সিনেমা হাউসগুলোর যা অবস্থা! মহিম তার বাবার কাছে শুনেছে যে, এককালে লাইটহাউস ছিল কলকাতার গর্ব। আর আজ? ভাবলে কান্না পায়।
বুকিং কাউন্টারের সামনে লোকের রাস্তায় আসা যাওয়া দেখতে দেখতে মহিমের মন চলে গেল অতীতে।
তখন মহিমের বয়স পনেরো, আর প্রতুল তার চেয়ে এক বছরের বড়। সেই বিশেষ দিনটার কথা মহিমের স্পষ্ট মনে আছে। ইস্কুলে টিফিন-টাইম। দুই বন্ধুতে ঘাটের একপাশে জামরুল গাছটার নীচে বসে আলুকাবলি খাচ্ছে। দুজনের ছিল গলায় গলায় ভাব। আর দুজনে ছিল তাদের ক্লাসে সবচেয়ে বড় দুই বন্ধু। কোনও মাস্টারকে তারা তোয়াক্কা করত না। এমনকী অঙ্কের মাস্টার করালিবাবু–যাঁর ভয়ে সারা ইস্কুলের ছাত্ররা তটস্থ–তাঁর ক্লাসেও মহিম প্রতুলের শয়তানির কোনও কমতি ছিল না। অবিশ্যি করালিবাবুর মতো মাস্টার তা সহ্য করবেন কেন? এমন অনেকদিন হয়েছে যে, ক্লাসের সব ছেলে বসে আছে। কেবল মহিম আর প্রতুল বেঞ্চির উপর দাঁড়ানো। কিন্তু কী হবে?–পরের ক্লাসেই আবার যে-কে-সেই।
তবে বিচ্ছু হলেও দুজনেই ছিল বুদ্ধিমান। ফেল করবে এমন ছেলে নয় তারা। সারা বছর ফাঁকি দিয়েও পরীক্ষায় ছাত্রদের মধ্যে মহিমের স্থান থাকত মাঝামাঝি। আর প্রতুলের নীচের দিকে।
প্রতুলের বাবার রেলওয়েতে বদলির চাকরি। ১৯৬৯-এ তাঁর হুকুম এল ধানবাদ যাওয়ার। প্রতুলেরও অবিশ্যি বাবার সঙ্গে যেতে হবে, ফলে তার বন্ধুর সঙ্গে যোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। সেই নিয়েই দুজনের কথা হচ্ছিল।
আবার কবে দেখা হবে কে জানে,বলল প্রতুল। কলকাতার পাট একবার তুলে দিলে ছুটিছাটাতেও এখানে আসার চান্স খুব কম। বরং তুই যদি ধানবাদে আসিস তা হলে দেখা হতে পারে।
ধানবাদ আর কে যায় বল? বলল মহিম। বাবা তো ছুটি হলেই হয় পুরী, না হয় দার্জিলিং। আজ অবধিও এ নিয়ম পালটায়নি।
প্রতুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর কিছুক্ষণ ঘাসের দিকে চেয়ে থেকে বলল, তুই বড় হয়ে কী করবি ঠিক করেছিস?
মহিম মাথা নাড়ল। সেসব এখন ভাবতে যাব কেন? ঢের সময় আছে। বাবা তো ডাক্তার, উনি অবিশ্যি খুশি হবেন যদি আমিও ডাক্তার হই। কিন্তু আমার ইচ্ছে নেই। তুই কিছু ঠিক করেছিস?
না।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ। তারপর প্রতুলই কথাটা পাড়ল–শোন, একটা ব্যাপার করলে কেমন হয়?
কী ব্যাপার?
আমরা তো বন্ধু–সেই বন্ধুত্বের একটা পরীক্ষার কথা বলছিলাম।
মহিম ভুরু কুঁচকে বলল, পরীক্ষা মানে? কী আবোল-তাবোল বকছিস?
আবোল-তাবোল নয়, বলল প্রতুল। আমি গল্পে পড়েছি। এরকম হয়।
কী হয়?
ছাড়াছাড়ির মুখে দুজন দুজনকে কথা দেয় যে, এক বছর পরে অমুক দিন অমুক সময়ে অমুক জায়গায় আবার মিট করবে।
