প্রথম দু দিন গাড়িতে ঘুরে তারাপুরের দৃশ্য, পুরনো কেল্লা, জঙ্গলের মধ্যে তারাসুন্দরীর মন্দিরের ভগ্নাবশেষ ইত্যাদি দেখেই কেটে গেল। তৃতীয় দিন সন্ধ্যাবেলা শো। স্টেজটা একবার ভাল করে দেখে নিলুম–সব ঠিক আছে। আটশো তোক ধরে থিয়েটারে; হাউস যে ফুল হবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
ম্যাজিক দারুণ হল। এখানের লোকে যে এ জিনিস কখনও দেখেনি সেটা তাদের হাবেভাবেই বুঝতে পারছিলুম। ম্যাজিকে এংকোর দেয় শুনেছিস কখনও? তারাপুরে তাও হয়েছিল। একই ম্যাজিক দুবার করে দেখাতে হল।
সবশেষে এল থট রিডিং-এর খেলা। জনা চার-পাঁচ লোকের বিষয় আশ্চর্য সব তথ্য বলে দিয়ে চমকলাল হঠাৎ বললেন, আমি এবার হিজ হাইনেস-এর সম্বন্ধে কিছু বলতে চাই। আশা করি তাঁর কোনও আপত্তি হবে না।
রাজা একটু যেন উসখুস করে তারপর বললেন, গো অ্যাহেড।
চমকাল অবশ্য প্রথমেই অ্যাপলজাইজ করে নিলেন রাজাকে বাছাই করার জন্য। তারপর চলল রাজা সম্বন্ধে তথ্য পরিবেশন। বারো বছর বয়সে রাজার টাইফয়েড হয়েছিল, বাঁচার কোনও আশা ছিল না, শেষে এক ফকিরের ঝাড়ফুকে ভাল হয়ে ওঠেন। রাজা ব্যাপারটা স্বীকার করলেন। তারপর চমকল বললেন যে, রাজার একটা আশ্চর্য গুণ হল যে তিনি দুহাতেই লিখতে পারেন। এটাও রাজা স্বীকার করলেন। তারপর জানা গেল রাজা একবার একটা বাঘ মারতে গিয়ে সেই বাঘের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পিঠে আঁচড় খান। তারপর শিকারের দলের এক সাহেব, নাম ডানকান কুক, বাঘটাকে গুলি করে মারেন। রাজা এই ঘটনাও অস্বীকার করলেন না। তারপর চমকলাল বললেন, আপনার সম্পত্তির মধ্যে যেটিকে আপনি সবচেয়ে মূল্যবান বলে মনে করেন, সেটা যদি একবার সকলকে দেখান তা হলে আজকের সন্ধ্যার আমোদটা পরিপূর্ণ হয়। এতে আপনি রাজি হবেন কি? আশা করি আপনি বুঝতে পারছেন আমি কোন জিনিসটার কথা বলছি। আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি সেটাকে, আমার চোখ ঝলসে যাচ্ছে, আমি চাই এই সভায় উপস্থিত সকলকে সেটা আপনি একবার দেখান।
রাজা দেখলাম খুব স্পোর্টিং। কী সম্পত্তির কথা বলছেন চমকলাল সেটা আমিও জানি না, কিন্তু বুঝতেই পারছি মহামূল্য কোনও জিনিস।
রাজা বললেন, যে সম্পত্তিটার কথা জাদুকর বলছেন সেটা আমি কখনও কাউকে দেখাই না, কিন্তু আজকের দিনটি একটি বিশেষ দিন। আজ আমার জন্মতিথি, তাই জাদুকরের অনুরোধ আমি রাখছি।
রাজা তাঁর জায়গা ছেড়ে উঠে বেরিয়ে গিয়ে আবার দশ মিনিটের মধ্যেই ফিরে এলেন। চমকলালের থট রিডিং-এর খেলা শেষ হয়ে গেছে, তাই তিনি চোখের বাঁধন খুলে ফেলেছেন। রাজা তাঁর হাতে একটা জিনিস দিয়ে বললেন, এটা আমি জাদুকরকেই অনুরোধ করছি সভার সকলকে দেখাতে।
চমকলা যে জিনিসটা তুলে ধরলেন, এবং যেটা স্টেজ লাইটের আলোতে ঝলমল করছিল সেটা একরকম মহামূল্য পাথর। রঙ সবুজ, কাজেই মরকত বলেই মনে হয়, কিন্তু এত বড় মরকত আমি কল্পনাও করতে পারিনি।
এদিকে সভায় হাততালির চোটে কান পাতা যায় না। রাজা চমকলালের হাত থেকে মণিটা নিয়ে আবার চলে গেলেন সেটাকে রাখতে। তারপর ফিরে এসে চমকালের হাতে এক থলি মুদ্রা ইনাম দিয়ে শোয়ের কাজটা সারলেন। পরে দেখেছিলাম মুদ্রাগুলি সোনার।
কেন সেটা বলতে পারব না, আমার মনের মধ্যে একটা খটকা লাগছিল। সেটা অবিশ্যি চমকলাল বুঝতে পারলেন, থট রিডিং-এর জোরে। ট্রেনে যখন ফিরছি, তখন আমাকে বললেন, কী ব্যানার্জি, এত কী ভাবছ?
আমি আর কী বলি? বললাম যে, তারাপুরের সমস্ত ব্যাপারটা আমার মনে একটা খটকার সৃষ্টি করছে। প্রথমত, এত জায়গা থাকতে তারাপুর কেন?
চমকলাল বললেন, তার কারণ জানতে চাও?
বললাম, খুবই কৌতূহল হচ্ছে।
তা হলে তোমাকে একটা গল্প বলতে হয়।
তা বলুন না।
তোমার ধৈর্যচ্যুতি হবে না তো?
মোটেই না।
তবে শোনো। ওই যে পাথরটা দেখলে সেটা কোথায় পাওয়া যায় জানো?
কোথায়?
তারাসুন্দরীর মন্দিরে বিগ্রহের গলা থেকে খুলে নেওয়া।
তাই বুঝি?
তারাপুরের রাজা মহেন্দ্র সিং তখন বেঁচে। তাঁর দুই ছেলে ছিল। বড় হল সূরয আর ছোট চন্দ্র। তারা দুজনেই ছিল ওস্তাদ শিকারি। দুই ভাই একদিন শিকার করতে যায় তারাপুরের জঙ্গলে। গভীর বন, তাতে দিনের আলো প্রায় প্রবেশ করে না বললেই চলে। সেই বনে শিকার খুঁজতে খুঁজতে বড় ভাই সূরয সিং তারাসুন্দরীর মন্দিরটা দেখতে পায়, এবং ওর ভাইকে দেখায়। দুজনে একসঙ্গে মন্দিরে প্রবেশ করে। সূরয সিং ছিল সভ্যভব্য, কিন্তু চন্দ্র সিং অত্যন্ত লোভী প্রকৃতির। সে বিগ্রহের গলায় মরকত মণিটা দেখেই সেটাকে হাত করে নেয়। এ ব্যাপারে সূর্য আপত্তি করেছিল, কিন্তু চন্দ্র তাতে কান দেয়নি।
তারপর কিছুকাল কেটে যায়। রাজা মহেন্দ্র সিং এই মরকত মণির বিষয় কিছুই জানেন না; এদিকে চিরকালের লোভী চন্দ্র সিং এখন গদিতে বসার লোভ করছে। কিন্তু নিয়মমতো সিংহাসন পাবার কথা বড় ছেলে সূরয সিং-এর।
চন্দ্র সিং তখন চূড়ান্ত উপায় অবলম্বন করল। বড় ভাইয়ের শরবতে বিষ মিশিয়ে তাকে হত্যা করার চেষ্টা করল। সূরয সিং-এর হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়া বন্ধ হল। পাছে ডাক্তার কিছু সন্দেহ করে সূরয সিং-এর লাশ পরীক্ষা করেন তাই চন্দ্র সিং চটপট তাঁর সৎকারের ব্যবস্থা করে লাশ শ্মশানে পাঠিয়ে দিল।
সেটা ছিল শ্রাবণ মাস। বজ্রপাতের সঙ্গে সঙ্গে তুমুল বৃষ্টি আরম্ভ হল শ্মশানে। যারা শবযাত্রায় গিয়েছিল তারা সকলেই শব ফেলে দিয়ে পালাল–যেমন হয়েছিল ভাওয়াল রাজকুমারের বেলায়।
