জায়গাটা খুঁজে পেতে অসুবিধা হল না। কিন্তু যা দেখলাম তাতে চক্ষু ছানাবড়া।
মাচা সমেত শিমুল গাছ বজ্রপাতে ঝলসে গেছে, আর তার পাশেই পড়ে আছে মৃত মোষ, আর তার কাঁধে দাঁত বসানো মৃত নরখাদক। সে এক বিচিত্র ছবি। মানুষের হাতের বন্দুকের চেয়ে হাজার গুণে বেশি শক্তিশালী আগ্নেয়াস্ত্রের শিকার হয়েছে এরা, সেটা আর বলে দিতে হয় না।
ফেরার পথে বাবাজিকে ধন্যবাদ দিতে গিয়েছিলাম, কিন্তু তাঁর সঙ্গে দেখা হল না। তাঁর পর্ণকুটির ভাসিয়ে নিয়ে গেছে লুঙ্গি নদী গতরাত্রের বৃষ্টিতে। তিনি নিজে নাকি একটি সেগুন গাছে চড়ে রক্ষা পেয়েছিলেন, কিন্তু আপাতত সর্দিজ্বরে কাবু হয়ে এক শিষ্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
আনন্দমেলা, পৌষ ১৩৮৮ (১৩ জানুয়ারি ১৯৮২)
তারিণীখুড়ো ও ঐন্দ্রজালিক
কই, আর সব কই? বললেন তারিণীখুড়ো। সব্বাইকে খবর দে, নইলে গল্প জমবে কী করে?
আমি বললাম, খবর পাঠানো হয়ে গেছে খুড়ো। এই এসে পড়ল বলে!
তা হলে এই ফাঁকে চা-টা বলে দে।
বললাম, তাও বলা হয়ে গেছে–দুধ চিনি ছাড়া চা।
ভেরি গুড।
মিনিট তিনেকের মধ্যেই ন্যাপলারা এসে পড়ল। বলল, ম্যাজিক দেখতে গিয়েছিল। অর্ণব দি গ্রেট। খুব ভাল লেগেছে।
খুড়ো বলল, ম্যাজিকের কথাই যদি বলিস, তা হলে তোদের বলেই ফেলি–কিছুকাল ম্যাজিশিয়ানের ম্যানেজার ছিলাম। অবিশ্যি তোরা তখনও জন্মাসনি।
কী নাম ম্যাজিশিয়ানের? ন্যাপলা জিজ্ঞেস করল।
আসল নাম জানি না, তবে স্টেজের নাম ছিল চমকাল। বাঙালি না, পশ্চিমের লোক। বছর পঁচিশেক আগের কথা। খুব নাম করেছিল। ম্যানেজারের জন্য বিজ্ঞাপন দেয়। আমি একবার ভদ্রলোকের ম্যাজিক দেখে নিয়ে তারপর অ্যাপ্লাই করি। যেমন তেমন খেলোয়াড় না হলে তার ম্যানেজারি করতে যাব কেন? তবে এ দেখলাম খাঁটি মাল। যাকে বলে স্টেজ ইলিউশন তা তো আছেই, আবার তার সঙ্গে আছে থট রিডিং। সে এক অবাক করা ব্যাপার। সবচেয়ে শেষে আসত এই খেলা। জাদুকরের চোখ বেঁধে দেওয়া হত। তারপর স্টেজের দিকে ফিরে বসে এক-একজন দর্শকের সিটের নাম্বার বলে তার সম্বন্ধে ঝুড়ি ঝুড়ি তথ্য বলে যেতেন চমকলাল। সে তোক কী চাকরি করে, তার কোনও ব্যারাম আছে কিনা, সে কী খেতে ভালবাসে, সম্প্রতি কী থিয়েটার বা বায়স্কোপ দেখেছে–একেবারে একধার থেকে সব। এমন আশ্চর্য খেলা আমি কখনও দেখিনি।
এই খেলা দেখে ইমপ্রেসড় হয়ে আমি ভদ্রলোককে অ্যাপ্লিকেশন পাঠাই। তারপর ডাক পড়ল, গিয়ে কথা বললুম, সঙ্গে সঙ্গে চাকরি হয়ে গেল। আমার নিজেরও একটু শখ ছিল দু-একটা–সেটা শুনে ভদ্রলোক বোধহয় আরও খুশি হলেন।
ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশের বেশি না, বেশ বনেদি চেহারা, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি আর গোঁফ, টিকলো নাক, আর চোখ দুটো যাকে বলে দেদীপ্যমান। ওরকম জ্বলজ্বলে চোখ আমি খুব কম মানুষের দেখেছি।
চা এল, তাই তারিণীখুড়োর কথা কিছুক্ষণের জন্য থামল। আমরা উদগ্রীব হয়ে বসে আছি, আর মনে মনে ভাবছি কতরকম কাজই না করেছেন ভদ্রলোক জীবনে। এইটেই হল তারিণীখুড়োর বিশেষত্ব। এক জায়গায় বেশিদিন টিকে থাকতে পারেননি। এখন অবিশ্যি আর কাজ-টাজ করেন না। বেনেটোলা লেনে একটা ফ্ল্যাট নিয়ে রয়েছেন, আর সেইখান থেকে হেঁটে আসেন এই বালিগঞ্জে আমাদের গল্প শোনাতে। বলেন বুড়োদের কোম্পানি নাকি ওঁর ভাল লাগে না। খুড়ো অবিশ্যি বিয়ে করেননি, তাই সংসারের চিন্তা যাকে বলে সেটা ওঁর নেই।
চায়ে পর পর দুটো চুমুক দিয়ে একটা এক্সপোর্ট কোয়ালিটি বিড়ি ধরিয়ে খুড়ো আবার বলতে শুরু করলেন।
চমকলালের সঙ্গে গোড়া থেকেই আমার একটা ভাল সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তেমন মুডে থাকলে আমাকে দু-একটা ছোটখাটো ম্যাজিকও শিখিয়ে দিতেন। ওঁর টুরের প্রোগ্রাম আমিই করতাম–আর সে বিরাট টুর। ভারতবর্ষের কোনও প্রদেশ বাদ নেই। আর সব জায়গাতেই সাকসেস। চমকলাল বলতে ছেলে বুড়ো সবাই অজ্ঞান।
একদিন বস্ আমাকে ডেকে বললেন, তুমি তারাপুর স্টেটের নাম শুনেছ? নামটা চেনা চেনা লাগলেও বললাম, শুনিনি। চমকল বললেন, ফৈজাবাদ থেকে ৫৬ মাইল দক্ষিণে! ভাল মোটরের রাস্তা আছে।
আমি বললাম, হঠাৎ তারাপুর কেন? তারাপুর একটা নেটিভ স্টেট, বললেন চমকলাল, সেখানকার রাজার খুব ম্যাজিকের শখ এটা আমি জানি। তাই একবার আমার জাদু দেখানোর ইচ্ছে করছে। দেখো যদি পারো অ্যারেঞ্জ করতে। রাজার ম্যানেজারকে একটা চিঠি ছেড়ে দাও, তারপর দেখো কী হয়।
আমি তাই দিলুম। সাতদিনের মধ্যেই জবাব চলে এল। রাজা চমকালের নাম শুনেছেন, এবং তার ম্যাজিক দেখতে খুবই আগ্রহী।
আমরা তো লটবহর নিয়ে একটা বিশেষ দিনে ফৈজাবাদ পৌঁছে গেলুম। এগারোটা ট্রাঙ্ক, তার জন্য একটা লরির ব্যবস্থা করার কথা আগে থেকে জানিয়ে দিয়েছিলুম। ফৈজাবাদেই রাজার ম্যানেজার মাধো সিং হাজির ছিলেন, আমাদের খুব আপ্যায়ন করে একটা বড় স্টুডিবেকার গাড়িতে তুলে দিলেন।
রাজবাড়ি পৌঁছে প্রথমে যে যার নিজের ঘরে একটু বিশ্রাম করলুম, তারপর ডাক পড়লে রাজার সঙ্গে গিয়ে দেখা করলুম। বছর পঁয়তাল্লিশ বয়স, বেশ ধারালো চেহারা, বললেন ছেলেবেলা থেকে ম্যাজিকের শখ। প্রাসাদের বাইরে আলাদা স্টেজ আছে। তাতে গান বাজনা থিয়েটার ম্যাজিক সবই হয়, সেখানেই চমকলাল তাঁর খেলা দেখাবেন।
