এদিকে বৃষ্টিতে ভিজেই হোক, আর যে কোনও কারণেই হোক, চিতায় শোয়ানো সূরয সিং-এর দেহে আবার প্রাণ ফিরে এল। আসলে সে মরেনি; ডাক্তারের ভুলে তাকে মৃত বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। অবিশ্যি এমনও হতে পারে যে চন্দ্র সিং আগেই ডাক্তারকে মোটা ঘুষ দিয়ে রেখেছিল, কারণ সূর্য সিং-এর স্বাস্থ্য ছিল অত্যন্ত ভাল।
যাই হোক, সূরয সিং এখন চিতা থেকে উঠে পড়ে উদভ্রান্তের মতো এদিক-সেদিক ঘুরতে লাগল। কী হয়েছে সেটাও সে ঠিক করে বুঝতে পারল না।
শ্মশানের কাছেই এক কুটির, সে কুটিরে থাকত এক তান্ত্রিক। তিনি ছিলেন পিশাচসিদ্ধ; তন্ত্রের অনেক কায়দাকানুন তাঁর জানা ছিল। তিনি সূরয সিংকে দেখে চিনতেও পারলেন, এবং অনুকম্পাবশত তাঁর কুটিরে আশ্রয় দিলেন। তারপর তিনিই মন্ত্রবলে সব ঘটনা বুঝতে পেরে সূর্যকে বুঝিয়ে দিলেন। বললেন, তুই নতুন জীবন পেয়েছিস, আমার কাছে এখন কিছুদিন থাক, এখনও তোর শরীর সম্পূর্ণ সুস্থ নয়–তারপর এই নতুন জীবনের সদ্ব্যবহার কর। আমি দিব্য চোখে দেখতে পাচ্ছি তোর কপালে যশলাভ আছে। তোকে কী করতে হবে সেটা আমি বাতলে দেব। রাজা হওয়া তোর কপালে নেই; সেটা তোর ছোট ভাই-ই হবে।
সুরয সিং রইল তান্ত্রিকের কাছে দেড় বছর। সেই সময় সে একটা জিনিস শিক্ষা করল; সেটা হল ইন্দ্রজাল। তান্ত্রিক তাঁর সমস্ত ঐন্দ্রজালিক বিদ্যা সূর্যকে দিয়ে দিলেন। তারপর সূরয একদিন সাধুকে ছেড়ে নিজের পথ দেখল। সে পথে সে অনেকদূর এগোল, এবং নতুন পাওয়া জীবনের সে সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করল।
চমকলাল থামলেন। আমি তো ব্যাপারটা বুঝেই ফেলেছি। বললাম, সূরয সিং আর চমকলাল তো একই লোক, তাই নয় কি?
চমকাল মৃদু হেসে বললেন, তুমি ঠিকই ধরেছ।
আমি বললাম, কিন্তু আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছি না; আপনার উপর যে লোক এত অত্যাচার করল, আপনাকে হত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করল–তাঁকে আপনি শুধু ম্যাজিক দেখিয়ে ছেড়ে দিলেন? আপনার মধ্যে কি প্রতিহিংসার ভাব ছিল না মোটেই?
তা থাকবে না কেন–আমি তো মানুষ।
তা হলে?
তা হলে আর কী? তা হলে এই!
এই বলে চমকলাল তাঁর পকেট থেকে একটা জিনিস বার করে আমার সামনে ধরলেন। তাঁর তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের মধ্যে থেকে চোখধাঁধানো রশ্মি আমাকে প্রায় অন্ধ করে দিল।
এই হল তারাসুন্দরীর অলঙ্কারের মরকত। রাজার কাছে এখন যেটা রয়েছে সেটা ভুয়ো, জাল। সেটা আমি তৈরি করিয়ে রাখি তারাপুর যাবার আগে। সামান্য হাত সাফাইয়ের ব্যাপার আর কি!
সন্দেশ, কার্তিক ১৩৯৩
তারিণীখুড়ো ও বেতাল
শ্রাবণ মাস, দিনটা ঘোলাটে, সকাল থেকে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে, তারই মধ্যে সন্ধের দিকে তারিণীখুড়ো এসে হাজির। হাতের ভিজে জাপানি ছাতাটা সড়াত করে বন্ধ করে দরজার পাশটায় দাঁড় করিয়ে রেখে তক্তপোশে তাঁর জায়গাটায় বসে তাকিয়াটা টেনে নিয়ে খুড়ো বললেন, কই, আর সবাইকে ডাক, আর নিকুঞ্জকে বল নতুন করে জল ফুটিয়ে এক কাপ চা করতে।
লোড শেডিং, তাই বসবার ঘরে দুটো মোমবাতি জ্বলছে, তাতে থমথমে ভাবটা তো কমেইনি, বরং বেড়েছে।
নিকুঞ্জই জল চাপিয়ে পাড়ার এবাড়ি ওবাড়ি থেকে ন্যাপলা, ভুলু, চটপটি আর সুনন্দকে ডেকে আনল। ন্যাপলা এসেই বলল, এই বাদলা দিনে মোমবাতির আলোয় কিন্তু–
ভূতের গল্প তো?
মানে, যদি আপনার স্টকে আর থাকে। দুটো গল্প তো অলরেডি বলা হয়ে গেছে।
আমার স্টক? আমার যা স্টক তাতে দুটো আরব্যোপন্যাস হয়ে যায়।
তার মানে টু থাউজ্যান্ড অ্যান্ড টু নাইটস?
আমাদের মধ্যে ন্যাপলাই খুড়োর সঙ্গে তাল রেখে কথা বলতে পারে।
আজ্ঞে হ্যাঁ, বললেন খুড়ো। তবে সব যে ভূতের গল্প তা নয় অবশ্যই।
এখানে বলে রাখি যে তারিণীখুড়োর গল্পগুলো এত জমাটি হয় যে সেগুলো গুল না সত্যি সে কথাটা আর কোনওদিন জিজ্ঞেস করি না। তবে এটা জানি যে পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে ভারতবর্ষের নানা জায়গায় ঘোরার ফলে খুড়োর অভিজ্ঞতার স্টক অফুরন্ত।
আজকে কীসের গল্প বলবেন? জিজ্ঞেস করল ভুলু।
আজকেরটা ভূতেরও বলতে পারিস, কঙ্কালেরও বলতে পারিস।
কঙ্কাল আর ভূত যে এক জিনিস সেটা তো জানতাম না, বলল ন্যাপলা।
তুই আর কী জানিস রে ছোঁকরা? এক জিনিস না হলেও একেক সময় এক হয়ে যায়। অন্তত আমি যে ঘটনার কথা বলতে যাচ্ছি তাতে তাই হয়েছিল। শোনার যদি সাহস থাকে তোদের তো বলতে পারি।
আমরা পাঁচজনে একসঙ্গে পর পর তিনবার আছে! বলার পর খুড়ো শুরু করলেন।
.
আমি তখন মালাবারে এলাচের ব্যবসা করে বেশ দুপয়সা কামিয়ে আবার ভবঘুরে। কোচিন থেকে গেলুম কোয়েম্বাটোর, সেখান থেকে ব্যাঙ্গালোর, ব্যাঙ্গালোর টু কুর্নল, কুর্নল টু হায়দ্রাবাদ। ফার্স্ট ক্লাশ ছাড়া ট্রেনে চড়ি না, ভাল হোটেলে থাকি, শহরে ঘোরার ইচ্ছে হলে ট্যাক্সি ডাকি। হায়দ্রাবাদে যাবার ইচ্ছে ছিল সালার জাং মিউজিয়ামটা দেখার জন্য। স্রেফ একজন লোকের সংগ্রহ থেকে একটা পুরো মিউজিয়ম হয়ে যায় সেটা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। মিউজিয়ম দেখে গোলকোণ্ডায় একটা ট্রিপ মেরে আবার বেরিয়ে পড়ব ভাবছি, এমন সময় লোকাল কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দেখে মনটা চনমন করে উঠল। হায়দ্রাবাদেরই আর্টিস্ট ধনরাজ মার্তণ্ড একজন মডেল চাইছেন পৌরাণিক ছবি আঁকার জন্য। তোরা রবিবর্মার নাম শুনেছিস কি না জানি না। রাজা রবিবর্মা। ট্রাভাঙ্কোরের এক রাজবংশের ছেলে ছিলেন। পৌরাণিক ছবি এঁকে খুব নাম করেছিলেন গত শতাব্দীর শেষ দিকটায়। ভারতবর্ষের বহু রাজারাজড়ার বাড়িতে দেখতে পাওয়া যায় তাঁর আঁকা সব অয়েল পেন্টিং। কতকটা রবিবর্মার স্টাইলের ছবি আঁকে এই ধনরাজ মার্তণ্ড, আর আমি যখনকার কথা বলছি, বছর পঁয়ত্রিশ আগে, তখন লোকটার খুব নাম, খুব পসার। তার এই বিজ্ঞাপনটা দেখে বেশ একটা জোরালো প্রতিক্রিয়া হল। পুরুষ মডেল চেয়েছে, চেহারা ভাল হওয়া চাই, রোজ সিটিং দিতে হবে, উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেবে। তোদের তো বলেইছি, সে বয়েসে আমার চেহারা ছিল লাইক এ প্রিন্স। তার উপর ডন-বৈঠক দেওয়া শরীর। গায়ে জোব্বা, মাথায় মুকুট আর কোমরে তলোয়ার দিয়ে যে-কোনও নেটিভ স্টেটের সিংহাসনে বসিয়ে দেওয়া যায়। যাই হোক, অ্যাপ্লাই করে দিলুম, আর ডাকও এসে গেল সাতদিনের মধ্যে।
