বড়মামা হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, ‘শাট আপ। শা-আট আ আপ!’
মেজোমামা ফিশফিশ করে আমাকে বললেন, ‘সাবজেকটটা ভালো ছিল তবে একটু খেপে আছে।’
বড়মামা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে আমাকে ডাকলেন, ‘কাম হিয়ার। কুইক।’
‘শুনে আসি মেজোমামা।’
‘হ্যাঁ শুনে আয়। কেসটা কী আমাকে জানিয়ে যাবি।’
‘আচ্ছা।’
ঘরে ঢুকতেই বড়মামা বললেন, ‘কী হবে?’
‘কীসের কী হবে?’
‘জুতো পরে ঢুকে পড়েছি যে!’
‘ও কিছু হবে না।’
‘এটা যে রাস্তার জুতো। কুসি দেখলে খ্যাঁক-খ্যাঁক করবে।’
‘মাসিমা তো এখন ধারে কাছে নেই।’
‘মেঝেতে যে দাগ পড়ে গেল!
‘আমি পা দিয়ে পালিশ করে দিচ্ছি।’
‘আমি যে দাঁড়িয়ে পড়েছি!’
‘চলতে চান তো চলে ফিরে বেড়ান না। অসুবিধে কীসের!’
‘যেদিকে যাব সেই দিকেই তো দাগ পড়ে যাবে!’
‘জুতো খুলে ফেলুন।
‘ইয়েস, দ্যাটস রাইট।’
বড়মামা জুতো খোলার চেষ্টা করতে গিয়ে বারকতক নেচে নিলেন। লাল চকচকে মেঝেতে নাচের জুতোর নকশা তৈরি হল।
‘দেখলি, দেখলি! সাধে কুসি আমার ওপর রেগে যায়! রেগে যাবার অনেক কারণ আছে! পৃথিবীতে কোনও কিছুই কি সহজ নয় রে!’
‘জুতোটা না খুলে অমন করে নাচছেন কেন?’
বড়মামা রেগে উঠলেন, ‘আমি কি ইচ্ছে করে নাচছি। আমাকে নাচাচ্ছে যে! রবারের জুতো পরে একবার দেখ না। পরা সহজ, তারপর পা থেকে আর খুলতে চায় না। ক্রীতদাসের জাত। পায়ে ধরে বসে থাকতে চায়।’
‘এখন তা হলে কী হবে! সারাদিন এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকবেন?
‘আমি বরং দাগে দাগ মিলিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাই। তুই ওই মারকিউরোক্রোমের শিশি আর খানিকটা তুলে নিয়ে আয়। ও, না।’
‘কী হল আবার?’
‘বাইরে তো উনি ক্যামেরা তাক করে বসে আছেন। এখুনি ফট করে একটা ছবি তুলে এত বড় করে বাঁধিয়ে রাখবেন।’
‘তাহলে আপনি ওই চেয়ারটায় বসুন, আমি পা থেকে জুতো দু-পাটি খুলে দি।’
‘না, দেখে ফেলবে।’
‘দেখলে কী হয়েছে? আর কে-ই বা দেখবে?
‘ও বাবা, দেখলে কী হয়েছে! হোল বাড়িতে হইচই পড়ে যাবে। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ভাগনেকে দিয়ে জুতো খোলাচ্ছে! মনে নেই সেদিনের কথা? তোকে বলেছিলুম পিঠে একটু তেল ঘষে দিবি, সেই নিয়ে কতরকমের কথা!’
‘তাহলে আমি চেয়ারটাকে টেনে আনি, আপনি বসে বসে খুলে ফেলুন।’
‘অগত্যা তাই করতে হবে। আমার আবার জুতোয় হাত দিলে কীরকম গা ঘিনঘিন করে। পায়ের জিনিস পায়ে-পায়েই খোলা উচিত। আমারই সাবধান হওয়া উচিত ছিল, এটা হল সন্ধের জুতো, সকালের নয়।’
‘সে আবার কী, জুতোর আবার সকাল-সন্ধে আছে নাকি?
‘জুতোর নেই। শরীরের আছে। সারারাত ঘুমের পর সকালের শরীর হল ফুলো ফুলো, তাজা! মুখ ফুলো, চোখ ফুলো, হাত ফুলো, পা ফুলো। শরীর যত সন্ধের দিকে এগোচ্ছে তত শুকোচ্ছে, চুপসে যাচ্ছে। এসব হল অ্যানাটমি, ফিজিওলজির ব্যাপার। ডাক্তার হলে বুঝতে পারতিস।’
বড়মামা ডাক্তার। চেয়ারটাকে প্রথমে দু-হাতে তুলে আনার চেষ্টা করলুম। বেজায় ভারী। এখন। টেনে আনার চেষ্টা করলুম। ঘষটাতে ঘষটাতে আসছি তেলা মেঝের উপর দিয়ে। চেয়ার ঠেলতে বেশ মজা লাগে। ইচ্ছে করেই বেশ একটু ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আনছি। সোজা রাস্তায় আসছি না। পথ ফুরিয়ে যাবে তাড়াতাড়ি!
‘এ কী, এ কী, অ্যাাঁ ঘরের এ কী অবস্থা, তুই সারা ঘরে চেয়ার নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস কেন! বসার
জায়গা পাচ্ছিস না! ও মাগো, মেঝেটার কী অবস্থা! দরজার সামনে মাসিমা। আমি যেখানে যেভাবে ছিলুম সেইভাবে, বড়মামাও সেই একই ভাবে কাঠের মতো দাঁড়িয়ে।
বড়মামা চোখ দুটো কেবল বুজিয়ে ফেলেছেন। এটাবড়মামার নিজস্ব টেকনিক। ভয় পেলেই চোখ বুজিয়ে ফেলা।
সেই চোখ বোজানো অবস্থাতেই বড়মামা বললেন, ‘কুসি, আমি আহত।’
‘তোমাকে কিছু বললেই তো তুমি আহত!’
‘আমি সেভাবে আহত নই, এই দেখ আমার কপাল।’ বড়মামা মাসিমার দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। কপালটা এর মধ্যেও আরও ফুলেছে। ঘেঁতো হয়ে গেছে।
‘তোমার কপালে এই সবই লেখা আছে আমরা জানতুম!’
‘হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস।’ মাসিমার পাশে মেজোমামা এসে দাঁড়িয়েছেন। হাতে ক্যামেরা।
মেজোমামাকে দেখেই বড়মামা লাফিয়ে উঠলেন, ‘ও, নো নোনো ফোটোগ্রাফ।’
‘ছোট্ট করে একটা। ফ্যামিলি অ্যালবামে মানাবে ভালো।’
মাসিমা মেজোমামাকে থামিয়ে দিলেন, ‘রাখো তো তোমার ক্যামেরা। আগে ছবি তোলা শেখো। ঠ্যার ঠ্যার করে হাত কাঁপে, ফোকাস করতে পারো না! কেবল পয়সা নষ্ট।’
‘হাত কাঁপে! আমার হাত কাঁপে?’
‘হ্যাঁ, কাঁপে। ছবি না তুলে তোমার কম্পাউন্ডার হওয়া উচিত ছিল। জল দিয়ে পেনিসিলিন গোলবার জন্য কসরত করার দরকার হত না, তোমার কাঁপা হাতে শিশিটা ধরিয়ে দিলেই আপনি গুলে যেত!’
মেজোমামা একটু মুষড়ে গেলেও হেরে যেতে প্রস্তুত নন। আমার মামারা সহজে হারতে চান না। মেজোমামা বললেন, ‘আমি যখন রেগে যাই তখনই আমার হাত কাঁপে, তা না হলে আমার হাত ল্যাম্পপোস্টের মতোই স্টেডি।’
‘তোমার সবসময়েই হাত কাঁপে, তা হলে বুঝতে হবে সবসময়েই রেগে আছ। কথা বাড়িয়ো না, যা করছিলে তাই করোগে যাও।’
মাসিমাকে সুবিধে করতে না পেরে মেজোমামা বড়মামার ওপর সহানুভূতিশীল হয়ে উঠলেন।
‘আহা, তোমার কপালটা বেশ লাল হয়ে ফুলে উঠেছে বড়দা। কীসে ঠুকলে অমন করে?’
বড়মামা যেন হালে পানি পেলেন। মাসিমা যেভাবে তাকিয়ে আছেন, একমাত্র কপালের জোরেই বড়মামা বাঁচতে পারেন।
