‘ঠোকা? ঠোকাঠুকির মধ্যে আমি নেই। ওই লক্ষ্মীছাড়া। যার নাম রাখা হয়েছিল লক্ষ্মী, সেই লক্ষ্মী পেছনের পায়ে ঝেড়েছে এক লাথি।’
আমি চেয়ারটা যেখানে ছিল সেইখানেই চতুষ্পদ করে রেখে, ওষুধ আর তুলো নিয়ে মাসিমার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমাকেও তো একটা বাঁচার রাস্তা বের করতে হবে। সারা মেঝেতে চেয়ার টানার লম্বা লম্বা দাগ।
‘এই নিন মাসিমা, ওষুধ।’
মাসিমা ওষুধ আর তুলোটা হাতে নিয়ে বড়মামাকে ধমকের সুরে বললেন, ‘তুমি সাতসকালে। গরুর কাছে কী করতে গিয়েছিলে? তোমার অন্য কোনও কাজ ছিল না!’
মেজোমামা বললেন, ‘হ্যাঁ ঠিকই তো, তোমার অন্য কোনও কাজ ছিল না? তুমি কি পশু চিকিৎসক? তুমি তো মনুষ্য চিকিৎসক!’
বড়মামা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘নাও, কথা শোনো দুজনের। যা হয় একটা কিছু বলে দিলেই হল! তোরা জানিস না?
‘কী জানতে হবে?’ মাসিমা তুলোয় লাল ওষুধ লাগালেন।
‘তোরা জানিস না, আমার সবক’টা কাজের লোক পালিয়ে গেছে। মালি গন। কুকুরগুলোকে যে দেখত সেই বিশে ব্যাটা হাওয়া। গরুটাকে যে দেখত সেই রামখেলোয়ান সরে পড়েছে। দেন হু উইল বেল দ্য ক্যাট? তোমরাই বলো?
‘ইংরেজিটা ঠিক হল না বড়দা।’ অধ্যাপক মেজোমামা আবার বানান ভুল, ভাষার ব্যবহারের ভুল একেবারেই সহ্য করতে পারেন না।
‘তোমার অবশ্য দোষ নেই। তুমি তো লিটারেচারের লোক নও। সারা জীবন প্রেসক্রিপশানই লিখে গেলে, টিডি, বিডি। তোমার বলা উচিত ছিল…।’
মাসিমা কটমট করে মেজোমামার দিকে তাকাতেই মেজোমামা আমতা-আমতা করে চুপ হয়ে। গেলেন, যেন গান শেষ হল, ‘না, মানে ভুল, মানে বেল মানে, ক্যাট দি বেল মানে, না না বেল দি ক্যাট মানে…’
মাসিমা আবার তাকাতেই মেজোমামার রেকর্ড একেবারেই থেমে গেল।
‘দেখি কপালটা নীচু করো। ওঃ লম্বা বটে! তালগাছ।’
বড়মামা অভ্যর্থনা সভার সভাপতির মতো কপালে যেন তিলক নিচ্ছেন।
মাসিমা একহাতে বড়মামার মাথার পেছন দিকটা ধরে সামনে ঝুঁকিয়ে আর এক হাতে। অ্যান্টিসেপটিকে ভেজানো তুললো থ্যাঁতলানো কপালে চেপে ধরেছেন। বড়মামার যেন চুল কাটা হচ্ছে সেলুনে। তুলোটা কপালে চেপে ধরতেই বড়মামা বিশাল একটা চিঙ্কার ছাড়লেন। মানুষ উঁচু ছাদ থেকে পড়ে যাবার সময়েই অমন চিৎকার করে। চিৎকার শুনেই কোথা থেকে ছুটে এল বড়মামার কুকুরদের অন্যতম, সবচেয়ে দুর্দান্ত স্প্যানিয়েল—’ঝড়’। সবক’টা কুকুরেরই বাংলা নাম। ঝড়ু, সুকু, ডাকু।
ঝড় বড়মামাকে বাঁচাতে এসেছে। সামনের থাবার ওপর মুখ নামিয়ে, ঝিকি মেরে মেরে, বার কতক ঘেউ ঘেউ করে খুব খানিকটা বকাঝকা করল। যখন দেখল মাসিমা তবু তার প্রভুকে ছাড়ছে না, তখন শাড়ির আঁচল ধরে হিড়হিড় করে টানতে শুরু করল। ফাইন লাগছিল। ব্যাপারটা। ঝড়ুর মুখটা ভারী সুন্দর। সেই মুখে আঁচলের আধখানা, পেছনের দু-পায়ে ভর রেখে, মুখটা সামান্য ওপরে তুলে, টান টান, টানাটানি, টাগ অফ ওয়ার।
বড়মামার কপাল ততক্ষণে মেরামত হয়ে গেছে। মাসিমার দু-হাত এখন মুক্ত। দু-হাতে আঁচল ধরে টানছেন। নতুন শাড়ি। সহজে ছিড়ছে না, কুকুরেও ছাড়ছে না। মেজোমামা তারিফ করে বললেন—
‘ডগ ইজ এ ফেতফুল অ্যানিম্যাল। প্রভুভক্ত জীব।’
‘প্রভুভক্তি আমি ঘুচিয়ে দিচ্ছি। এই, লাঠিটা নিয়ে আয় তো।’ লাঠির নাম শুনে ঝড়ু একটু থমকে দাঁড়াল, তারপর চোখ দুটো আধ-বোজা করে যেমন টানছিল তেমনি টানতে লাগল, ঝটকা মারতে লাগল, খোঁটায় বাঁধা প্রাণীর মতো অর্ধবৃত্ত আকারে ঘুরতে লাগল। বড়মামা একটু সামলেছেন। মুখ দেখে মনে হল ঝড়ুর বীরত্ব ও প্রভুভক্তিতে বেশ গর্বিত। তবে লাঠি থেকে বাঁচাতে হবে। ভক্তেরই তো ভগবান! বড়মামা শাসনের সুরে বললেন, ‘ঝডু, ঝডু, ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও, নো অসভ্যতা।’
উত্তরে ঝড়ু আরও মরিয়া হয়ে মাসিমার আঁচলে হ্যাঁচকা টান মারতে লাগল। মেজোমামা বললেন, ‘ঝড়ু ছাড়া ঝড়ুর কিছু করতে পারবে না। কুকুরের সঙ্গে কুকুরের ল্যাঙ্গোয়েজেই কথা বলতে হবে।’ বড়মামা কুকুরের পক্ষেই গেলেন, ‘আসলে কী হয়েছে জানিস, কুকুরের তো বাঁকা বাঁকা দাঁত, কুসির শাড়িটা তাঁতের জ্যালজেলে, দাঁতে আটকে গ্যাছে। ও টানছে না, ও দাঁত থেকে খুলে ফেলার জন্যে ছটফট করছে। দেখি, কাঁচিটা দেখি, এ কেসটা হল সার্জারির কেস।’
মাসিমা বললেন, ‘শাড়িটার দাম জানো? সেভেনটি সিকস। সার্জারি নয়, লাথি।’
মাসিমা সত্যি সত্যিই একটা লাথি চালালেন। ঝড়ুর গায়ে লাগল না, কিন্তু ভয়ে ছেড়ে দিল। শাড়ির আঁচলটা ফুটো ফুটো, চিবোনো চিবোনো। মাসিমার চোখে জল এসে গেছে।
‘আজই নতুন শাড়িটা সবে ভেঙে পরলুম, হতচ্ছাড়া, জানোয়ার কুকুর। শাড়িটার কী সুন্দর রং ছিল!’ মাসিমার কাঁদো কাঁদো গলা শুনে মেজোমামা বললেন—
‘ছিল বলছিস কেন, এখনও তো সুন্দর রংই রয়েছে! জলে পড়লে রং ওঠে, কুকুর ধরলে রং উঠবে কেন?’
বড়মামা বললেন, ‘বারো হাত শাড়ির হাতখানেক কেটে ফেলে দিলেও এগারো হাত থাকে। যে কোনও মহিলার পক্ষে এগারো হাত যথেষ্ট। কী বল?
মেজোমামা বললেন, ‘ইয়েস ইয়েস। ইলেভেন ইয়ার্ডস’— ‘তোমার ইংরেজিটা শুদ্ধ করো, ইয়ার্ড মানে গজ, হাত নয়।’ বড়মামা হঠাৎ সুযোগ পেয়ে গেছেন।
নীচে ‘হাম্বা’ করে একটা শব্দ শোনা গেল, ‘গরু খুলে গেছে, ওমা গরু খুলে গেছে, গরু যাঃ যাঃ, হায় গো, ডাঁটার ঝাড়টা নিয়ে পালাল গো!’
