জ্যোৎস্না তখন প্রায় পঙ্গু। একমাত্র অকৃত্রিম ভালোবাসা ছাড়া তার আর কিছুই দেবার ছিল না। তখন লীনার একমাত্র ভালোবাসা ছাড়া আর সব কিছুই দেবার ছিল অবশ্য যথোচিত মূল্যে।
একবার দুবার দেখতে দেখতেই আলাপ। কেন গিয়েছিলুম জানি না। দেবার আনন্দেই বোধহয় অথবা দেবার ক্ষমতা আছে বলে, নাকি এই দীঘায় আসার প্রস্তুতি, আমার নিয়তিই বলতে পারবে।
কাঁচা সোনার মতো রোদ উঠেছে। লীনা ঘুমোচ্ছে ঘুমোক, আমি একটু লাউঞ্জে বসে চা খেয়ে আসি। ঘরে চা দিয়ে যাক এটা আমি চাই না। ঘরটা এত অগোছালো হয়ে আছে। যেই আসুক না কেন চট করে বুঝে নেবে এটা স্ত্রীর ঘর নয়। অবশ্য ওরা অভ্যস্ত এ সব দেখে। কিন্তু আমি তো একেবারে আনকোরা নতুন এ লাইনে। লীনাই আমার হাতেখড়ি।
বীচ আমব্রেলার তলায় বসে সবে চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছি পাশ থেকে গগলস চোখে এক সুন্দর ভদ্রলোক বল্লেন—সকালটা ভারি সুন্দর তাই না। কলকাতায় এমন একটা সকাল পাবেন না।
না তা তো পাব না, কেমন করে পাব।
নতুন নতুন জায়গায় রাতে ঘুম আসে না। তারপর পুরোনো হলেই সব সয়ে যায়। কি বলেন?
হ্যাঁ সে তো ঠিক কথাই। উত্তর দিয়েই কেমন যেন সন্দেহ হল। কথাটার যেন অন্য একটা মানে। আছে। তাকিয়ে দেখলাম ভদ্রলোক মুচকি হাসছেন। ফরসা মুখে সরু গোফ। কেমন যেন শয়তান চেহারা, সাপের মতো হিলহিলে। অবশ্য আমিও কিছু কম শয়তান নই। আমি কাঁচা আর ও যেন। পাকা শয়তান।
চা-টা গরম। তা না হলে এক চুমুকে শেষ করে ফেলে উঠে যেতুম। ভদ্রলোক বল্লেন, ‘সমুদ্র মানুষকে সজীব করে, যৌবন ফিরিয়ে দেয়।’ সমুদ্রের ধারে তাই পুরোনো সঙ্গী নিয়ে আসতে নেই, সবসময় নতুন সাথী নিয়ে আসতে হয়, বলে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। সেই শয়তানের ক্রুর হাসি। হঠাৎ নিজেকে মনে হল কাচের মানুষ, লোকটি যেন আমার ভিতরটা অ্যাকোয়ারিয়ামের মতো দেখছে। নিজেকে যেন কেমন অসহায় মনে হল।
ভদ্রলোক যেন দূর থেকে বল্লেন—’সমুদ্র আমাদের কাছে কিছু নেয় না। তাই সমুদ্রের ধারে আমরা যা খুশি তাই করতে পারি, যা খুশি তাই ফেলে যেতে পারি।’ আর একবার সেই ধারালো হাসি।
বীচ আমব্রেলার তলা থেকে উঠে প্রায় ছুটতে ছুটতে নিজের ঘরে ফিরে এলুম। যা ভেবেছি তাই। লীনা একলা আসেনি। এই সেই লোক যে আমাদের ওপর নজর রেখেছে। ছায়ার মতো অনুসরণ করছে। আমাদের সমস্ত গোপনীয়তা যার হাতের মুঠোর মধ্যে। এমনও তো হতে পারে আমার স্ত্রীর পাঠানো লোক অথবা অফিসের কোনও শত্রু। কিংবা আমার কোনও প্রতিবেশী।
এই মুহূর্তে আমাকে চলে যেতে হবে ওই লোকটির থেকে দূরে। আজকের সমস্ত প্রোগ্রাম মাটি। ভেবেছিলাম শনিবার, রবিবার দুদিন থেকে চলে যাব। সেই ব্যবস্থাই ছিল। লীনার সঙ্গে একটা রাত কি যথেষ্ট! না, সারাদিন, সারারাত, এমনি করে যতক্ষণ না একেবারে পুরো ব্যাপারটার উপর বিতৃষ্ণা আসছে। তারপর কিছুদিন হয়তো বিরতি। আবার ফিরে ফিরে আসা রক্তের উন্মাদনা। কান পাতলে শোনা যাবে। ধমনিতে ধমনিতে সমুদ্রের গর্জন।
আলোর বন্যা বইছে ঘরে। লীনা এখনও শুয়ে আছে। একটা প্রচণ্ড ইচ্ছেকে মনের মধ্যে চেপে রেখে, জামাকাপড় পরে ফেলুম, দাড়ি কামানো ইত্যাদি পরে হবে। অন্য কোথাও অন্য। কোনওখানে। সেই সরু গোফ, রঙিন কাচ, ইস্পাত হাসি যেন আমাকে পেছন থেকে তাড়া করছে। লীনার সঙ্গে আর একসঙ্গে ফেরা যায় না, কারণ আমাদের উপর নজর রেখেছে। আমরা নজরবন্দি। লীনার জন্যে ভাবনা নেই, সে ঠিক ফিরে যাবে হয়তো ওই লোকটির সঙ্গেই। কিংবা তৈরি হবে কোনও গভীর ফাঁদে আমাকে ধরবার জন্যে।
‘আমি চলে যেতে বাধ্য হচ্ছি’, কথা কটি একটি চিরকুটে তাড়াতাড়ি লিখে কয়েকশো টাকা সমেত তার বালিশের তলায় রেখে বেরিয়ে এলুম। ব্যালকনি থেকে সমুদ্র কত সুন্দর। তরঙ্গশীর্ষে। সোনারোদ ঝলকাচ্ছে। দেখার সময় নেই, মন নেই। গাড়িতে স্টার্ট দিলুম। বেরোবার মুখে সেই ভদ্রলোক, সেই হাসি। ‘গাড়িতে এসেছেন, তা ভালোই। তবে ওই দীঘা রোডে ভয়ানক অ্যাকসিডেন্ট হয়।’ খুব চিন্তা করতে করতে অথবা সমুদ্রের কথা ভাবতে ভাবতে কিংবা সমুদ্র থেকে পালাতে চাইলে, কখন কী হয় বলা যায় না। গাড়ি ছুটছে ছুটছে। মনে হচ্ছে আমার দেহ থেকে আমি মুক্ত হয়ে আরও আগে ছুটে চলেছি, কানের কাছে এখনও শুনছি সমুদ্রের গর্জন।
গরুর রেজাল্ট
বড়মামা প্রায় কুঁকতে ধুকতে নীচে থেকে ওপরে উঠে এলেন। এমন চেহারা এর আগে আর কখনও দেখিনি। কপালের ডানপাশটা ফুলে ট্যাঁপা লালা। দু-হাতের কনুইয়ের কাছ পর্যন্ত লাল টকটকে। গাঢ় নীল রঙের সিল্কের লুঙ্গি একটু উঁচু করে পরা। পায়ে কারও ওয়াটার প্রুফ জুতো।
ধীরে-ধীরে সিঁড়ি ভেঙে বড়মামা দোতলার ঢাকা বারান্দায় উঠে এলেন। ঝলমলে রোদ জাফরির নকশা পেতে রেখেছে ঝকঝকে লাল মেঝের ওপর। দূরে কোণে মেজোমামা বসে বসে ক্যামেরার লেনস পরিষ্কার করছিলেন। আমি তাঁর ফাইফরমাস খাটছিলুম। ‘এটা দে, ওটা দে।’
মেজোমামার কোলের ওপর ক্যামেরা। হাতে হলদে রঙের ফ্ল্যানেলের টুকরো। চোখ আর ক্যামেরার দিকে নেই, বড়মামার দিকে। মেজোমামা হঠাৎ বললেন, ‘স্টপ। ঠিক ওই জায়গাতেই এক সেকেন্ড। আমি চট করে তোমার একটা স্ন্যাপ নিয়ে নি! তোমাকে ঠিক দিশি কাউবয়ের মতো দেখাচ্ছে। বেড়ে দেখতে হয়েছ তো! কী করে হল?’
