কিন্তু আমি কী করে হঠাৎ দীঘায় চলে এসেছি ছিটকে। সঙ্গে এই আগুনের টুকরোই বা কে। হঠাৎ একাই হাসতে ইচ্ছে করল। আরশির আমিও হেসে উঠলাম। মনে হল যেন মিশরের রাজা ফারুক সি বিচে, সুইমিং কস্টিউম পরে বসে আছি। এই মুহূর্তে আমার কোনও পরিচিত জন যদি ওই জানলা দিয়ে উঁকি মারে কিংবা একটা ছবি তুলে আমার স্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে দেয়, অথবা বেশ এনলার্জ করে আমার অফিসে পাঠিয়ে দেয়, তাহলে কেমন হয়। এতে কি আমার স্ত্রীর বয়স এককথায় দশবছর বেড়ে যাবে। আমার মেয়ে কি আমায় বাবা বলে ডাকবে না, আমার অফিসের কর্মচারীরা আমার গায়ে থুথু দেবে। কাগজের পাতায় পাতায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হঠাৎ দীঘা। সফরের কাহিনি ফলাও করে ছাপা! সেন্ট্রাল ইনভেসটিগেশনে ফাইল উঠবে! চাকরি থেকে অবসর নিতে বাধ্য হব! সামান্য একটা রাতের জন্যে বড়ো বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে না কি!
চাদরটা পায়ের কাছ থেকে তুলে লীনার শরীরটা ঢেকে দিলুম। সে একটু আড়মোড়া ভাঙতে গিয়ে একটা হাত মাথার উপর তুলে পা দুটো ছড়িয়ে টান টান করল। শরীরে যত্ন নেয়, চুল থেকে নখ অবধি যত্নে বেড়েছে। এমন একটি রচনার মধ্যে নিজেকে যে-কোনও মূল্যে হারিয়ে ফেলা চলে। আমার অবস্থায় পড়লে বোধহয় অনেক মহাপুরুষই ভেসে যেতেন। না লীনা এখন জাগবে না। সে কারুর স্ত্রী নয়, সে কারুর মানয়। কারুর প্রতি তার কোনও কর্তব্য নেই কোনও দায়িত্ব নেই। বিশেষ কোনও সময়ে তাকে ঘুম থেকে উঠতেই হবে এমন কোনও কথা নেই।
এখন সাতটা বাজতে অনেক দেরি। আটটা বাজবে আরও অনেক পরে। অতএব এখনও স্বচ্ছন্দে বিছানায় থাকা যায়। নরম, কোমল, উষ্ণ। দীঘায় আমি ভ্রমণে আসিনি, সমুদ্রে স্নানেরও বাসনা। নেই। আবার পরে আসব কি না তাও জানি না। বর্তমানের কথা চিন্তা করলে এইটুকু বলা যায় সময় ফুরিয়ে আসছে, যৌবন চলে গেছে। অতএব আর সুযোগের শেষ বিন্দুটুকুর সদব্যবহার করতে হলে আমার এখনই এই ঘর এই শয্যা ছাড়া উচিত নয়। কিন্তু রাতের অন্ধকারে সব কিছু ছিল প্রচ্ছন্ন, দিনের আলোয় তা যেন বড় বেশি প্রকট। তাছাড়া সেই উন্মাদনা, সেই নেশাটাও যেন কেটে গেছে। এখন যা কিছু করতে চাই সে ওই জোর করে পাওনা আদায়ের সামিল হবে, মনের যোগ থাকবে না, তবে একথা ঠিক দাতার কোনও কৃপণতা নেই, কেবল গ্রহীতাই শক্তিহীন।
চিন্তাধারা যখন এলোমেলো বঙ্গাহীন ঘোড়ার মতো ছোটে তখন একটা সিগারেট কিছু সাহায্য করতে পারে ভেবে একটা সিগারেট ধরালুম। আচ্ছা লীনা কি সত্যি একলাই এসেছে আমার। সঙ্গে, না অন্য কেউ আমার অলক্ষ্যে আমাদের উপর নজর রাখছে। এই সব পেশাদার মেয়েকে বিশ্বাস নেই। বলা যায় না সাগর সৈকতের এই নির্জনতা হয়তো এতটা নির্জন নয়। দরজা অথবা জানলার ছিদ্রে চোখ রেখে হয়তো কেউ রাতের উদ্দাম দৃশ্য দেখেছে। ক্যামেরার চোখে একের। পর এক ধরে রেখেছে। পরে কোনওদিন একটি একটি ছবি চোখের সামনে তুলে ধরে আমাকে সর্বস্বান্ত করে দেবে। না তা কি সম্ভব। সেদিন বলছিল এদের ব্যবসারও একটা ‘কোড অফ কনডাক্ট’ একটা ‘গুডউইল’ আছে। হতে পারে। জীবনে এই রকম একটা বিশ্রী ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ব কোনওদিন ভাবিনি। বর্তমানে আমরা সকলেই ‘ফ্রাসট্রেটেড’। আমি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যা করতে চেয়েছি, দেশকে যা দিতে চেয়েছি তা পারিনি। টাকা দিতে প্রলোভন দেখিয়ে নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে দিনের পর দিন একদল লোক আমাকে নিয়ে পুতুল খেলেছে। বাড়িতেও আমার স্ত্রীর কাছ থেকে যা দাবি ছিল যে-কোনও কারণেই হোক পাইনি। আমারও যা দেবার ছিল দিতে পারিনি। প্রচণ্ড হতাশা থেকে মুক্তি খুঁজেছি আমরা পানপাত্রে। কিন্তু মদ তো। অনেকেই খায় তা বলে একটা নাচিয়ে ক্যাবারে গার্ল এনে দীঘায় রাত কাটায়? এই মুহূর্তে ওই আরশিতে যদি আমার মতো সমান পদমর্যাদা সম্পন্ন কোনও মানুষ এসে বলত, হ্যাঁ আমিও তোমার দলে, তাহলে একটা ‘মর্যাল সাপোর্ট’ পেতুম। লীনাকে আরও ভালো লাগত। কিন্তু এ যেন কেমন নিজেকে নিঃসঙ্গ অপাঙক্তেয় অপরাধী বলে মনে হচ্ছে।
পারিবারিক জীবনের ব্যর্থতাকে কাজ দিয়েই ভুলতে চেয়েছিলুম। নারীসঙ্গের বাসনা জাগত না বললে ভুল হবে। কিন্তু এর ভিতর থেকে দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন একটা পিতা, একটা স্বামী, একটা সামাজিক মানুষ সবসময় হঠকারিতাকে বাধা দিয়েছে; কিন্তু শেষকালে কী যে হল। ছাত্রজীবনে একবার দুবার কলকাতায় কিছু কিছু লাল আলোর এলাকা দিয়ে ইচ্ছে করেই হেঁটে গেছি। কেমন একটা উত্তেজনা জাগত। রাস্তাটুকু পেরোতুম মাথা নীচু করে নানা মন্তব্য আর ছুড়ে মারা গানের কলির মধ্যে দিয়ে। অবশেষে মনে হত ভীষণ ক্লান্ত, ঘাম জমে যেত কপালে, কণ্ঠতালু শুকিয়ে। যেত ভয়ে। অথচ আজ এই যৌবনের শেষ ধাপে সেইরকমই একটি চরিত্রের মূল্যবান সংস্করণকে এই মুহূর্তে নাড়াচাড়া করছি, অপটু অনভ্যস্ত হাতে।
এই টোপ ঠিক কে আমাকে গিলিয়েছে, কার হাতে সুতো বা আমি নিজেই গিলেছি কিনা বলতে পারব না। কোনও একটা ‘বারে’ কোনও এক রাতের পরিচয়। সঙ্গে কে ছিল, আর কে কে ছিল না মনে নেই। লীনা একটু পরেই ডায়াসে উঠে গিয়ে দুলে দুলে নেচেছিল, শরীর অনাবৃত করেছিল। অনেক হাততালি কুড়িয়েছিল, শেষ রাতে মাতাল হয়েছিল।
