সেই জীবনখেলায়, ফুটবল, ক্রিকেট হল খেলারও খেলা। তার মানে তামাশার তামাশা, মহাতামাশা। টিভি-র পরদাই হল খেলার উপযুক্ত স্থান। দূরে বসে ক্যামেরার চোখে দেখো আর মনে মনে খেলো। ওই যে কপিল ব্যাটটা তুলল, তারপর শরীরটাকে স্লাইট বাঁয়ে মুচড়ে সোজা করার সময় দ্বিধাটা কাটাতে পারলে ওইভাবে স্টাম্প ছিটকে যেত না। আমি হলে সোজা ছয়। মেরে গ্যালারিতে ফেলে দিতুম। শ্রীকান্তের চোখ সেট হবার আগে লেগব্রেক ওভাবে মারলে। আউট তো হবেই। আমি হলে আরও দু-চারটে মেরে তারপর চার কি ছয় মারবার চেষ্টা করতুম। আমরা আসলে অ্যাডভাইসারের জাত। উপদেষ্টা। কোনটা বেশি প্রয়োজনীয়, অ্যাকশন না অ্যাডভাইস? ভালো উপদেশ না পেলে জীবনে কিছুই করা যায় না। লেখাপড়া, কলকারখানা,
মামলা-মোকদ্দমা, চুরি ডাকাতি। ভালো উপদেষ্টার উপদেশ না নিলে সব ভেস্তে যায়। খাটে বসে টিভি-র পর্দায় খেলা না দেখলে খেলোয়াড়কে মানুষ করা যায় না। কোচ এত কাছে থাকেন, খেলার সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে থাকেন, তাঁর পক্ষে কী করলে কী হত, এই উপদেশ দেওয়া সম্ভব নয়। এ একমাত্র খাট-এক্সপার্টরাই দিতে পারে। আমরা সবসময় দিয়েও থাকি। খাটে বসে, গ্যালারিতে বসে দিয়েও থাকি, ওঁরা শুনতে পান না। আমাদের উপদেশে চললে, কি ক্রিকেট, কি হকি, কি ফুটবল, আমরা হয়ে যেতুম অজেয়।
শুধু! এই শুধুটাই হল আসল, স্ট্যামিনা বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্য ভালো করতে হবে। ষাঁড়ের ডালনা নাকী বলে, খেতে হবে। তবে ভুঁড়ি বাড়ালে চলবে না। আমাদের কাল হল হুঁড়ি। আমাদের জাতীয় পরিকল্পনায় অনবরত দৌড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, বাসের পেছনে, ট্রামের পেছনে, ট্যাক্সি কি মিনির পেছনে। না দৌড়োলে কিছুই ধরা যায় না। আরও ভালো দৌড়ের জন্যে নিয়মিত বোমাবাজি, লাঠিবাজি, টিয়ারগ্যাসের ব্যবস্থা তো আছেই। আর আছে পথ-দুর্ঘটনার পর যানবাহনে ইটপাটকেল ছোড়া, আগুন, পুলিশের তাড়া। সারা দেশটাকে আমরা খেলার মাঠ। করেছি। পথঘাট করে তুলেছি ট্রেকিং-এর উপযোগী। ধর্মতলা থেকে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ধরে ব্রিজ পেরিয়ে বিটি রোড বরাবর ব্যারাকপুর যাত্রা, কোথায় লাগে, লে, লাদাখ, সান্দাকফু! তবু আমাদের ভুঁড়ি বাড়ছে। ইন্ডিয়ান ফুটবল টিম প্রথম ৪৫ মিনিট বেশ দৌড়ঝাঁপ করে, তারপর সেকেন্ড হাফে হাঁপায়। দরকার প্রাণায়াম। এই প্রাণায়ামের কথায় মনে পড়ল, আমরা সবাই ডাক্তার, সবাই অ্যাস্ট্রোলজার, আমরা সবাই যোগী। শশঙ্গাসন, ভুজঙ্গাসন, হলাসন, উষ্ট্রাসন। মুখে মুখে ফেরে। বাসে, ট্রামে, বাজারে এমনকী বিয়ের আসরে। কন্যা সম্প্রদান করতে গিয়ে মেয়ের মামা, চাদর গলায় জামাতার নাদুস ভুঁড়ির দিকে তাকিয়ে ফিশফিশ করে বললেন, বাবা, ফুলশয্যাতেই হলাসনটা শুরু করে দাও। আর পারলে শেষ রাতে উঠে পদহস্তাসন।
তবে খাটে বসে টিভি দেখতে দেখতে এক্সপার্টর্স কমেন্টস করার দিন আমার শেষ হয়ে এল। গত বিশ্বকাপে সারারাত ঠ্যং-এর ওপর ঠ্যাং তুলে টিভি দেখেছি। বোতলভরা জল ঢুকুর ঢুকুর খেয়েছি। আর বেলা অবধি ভোঁস ভোঁস ঘুমিয়েছি। এতে আমার পালিকার, অর্থাৎ আমি যাঁর গৃহপালিত, তাঁর ঘুমের ব্যাঘাত হয়েছে। স্নায়ু উত্তেজিত হয়েছে। ফরাসি দেশ হলে আমার নামে লাখ টাকার ডেমারেজ স্যুট ঠুকে দিত। টিভিতে তালা মেরে এবার থেকে রেশনিং সিসটেমে, যেমন চাল গম চিনি ছাড়ে, সেই রকম প্রোগ্রাম ছাড়বে। সারা রাত হ্যা হ্যা করা চলবে না।
গণ্ডির বাইরে
রাত শেষ হচ্ছে। ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফুটছে। সমুদ্রের দিকের জানলাটা খোলা। ঘরের মধ্যে বিভিন্ন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জিনিস-আসবাবপত্র ক্রমশ অস্পষ্ট থেকে স্পষ্ট হচ্ছে। সমুদ্র এখনও শান্ত। দীঘার সমুদ্র অবশ্য সাধারণত শান্তই। কিন্তু এই ঘুমভাঙা ভোরে সমুদ্র এখন প্রশান্ত। ঠান্ডা ঝিরঝিরে হাওয়া বইছে। সারারাত একটুও ঘুম হয়নি। এখন যেন বেশ খারাপ। লাগছে। পুরো ব্যাপারটা যেন অসুস্থতায় ভরা। এমন সুন্দর পাখি ডাকা ভোর, ওই সমুদ্রের অনন্ত নীল বিস্তার কোনও কিছুর সঙ্গেই একাত্ম হয়ে পারছি না। ঘটনাটা এমন আকস্মিক। এই হঠাৎ দীঘায় আসা। ইত্যাদি। মাথার মধ্যে সব কিছু জট পাকিয়ে যাচ্ছে, ঘুলিয়ে যাচ্ছে, ধোঁয়াটে হয়ে যাচ্ছে।
বিছানার এককোণে লীনা এখন পরম শান্তিতে ঘুমোচ্ছে। আমি শিল্পী নই, কিন্তু এমন সুঠাম শরীর প্রকৃতই দুর্লভ। সেই কারণেই হয়তো এখন খারাপ লাগলেও চোখ ফেরাতে পারছি না। দিনের আলোয় ব্যাপারটা যত স্পষ্ট হচ্ছে ততই নানারকম আশঙ্কা মাথায় ভিড় করে আসছে। সত্যি কিন্তু এখনও যেন মনে হচ্ছে যা ঘটে ঘটুক এ রাত ভোলার নয়। আমি কোনও রাজা। মহারাজা অথবা বিজেতা হলে বলতুম, ঠিক হ্যায়, রাজত্ব চলে যায় যাক, তবু এ জিনিস ফেরাবার নয়।
সমুদ্রের দিকের জানলা বন্ধ করে দিলে এখনই ঘরে নামবে ফিকে অন্ধকার, সেই অন্ধকারে, এখনও আমরা দুজনে সাঁতার কাটতে পারি। কিন্তু আপশোশ হয়। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে। যৌবন ফেলে এসেছি। এখন দেহ প্রৌঢ়ত্বের দরজায়। এ দেহ নিয়ে আর মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া যাবে না। তবুও অনেকদিন পরে এমন একটা রাত জীবনে এল।
এতক্ষণ লক্ষ করিনি নিজেকে। হঠাৎ নজরে পড়ল, খাটের উলটোদিকে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের চেহারা ধরা পড়েছে। মধ্যবয়সি জুলকায় একটি মানুষ, ফোলা ফোলা মুখ, বুকে কাঁচা-পাকা চুল, মাথার মধ্যে একটি ছোট টাক, চোখের কোণ দুটো ফোলা। খুব তারিফ করার মতো চেহারা নয়। অথচ মাত্র দশবছর আগে কী ছিলুম। ঠিক এই মুহূর্তে আমার কলকাতার বাড়িতেও ভোর হচ্ছে। হয়তো সেখানে দক্ষিণে সমুদ্র নেই, কিন্তু দেবদারু গাছ আছে। জাফরির ওপারে প্রশান্ত ছাদে নিজের হাতে তৈরি বাগান আছে। সেখানে এই মুহূর্তে খাটে শুয়ে আছে। আমার স্ত্রী, সেও ঘুমোচ্ছে। কিন্তু সে অসুস্থ। প্রায়-পঙ্গু আর্থারাইটিসে।—খাটের উপর বুককেসে বসানো আছে ফোটোস্ট্যান্ড। আমাদের যৌবনের ছবি। সবে ইঞ্জিনিয়ার হয়েছি। গর্বোদ্ভাসিত চোখা সুন্দর যুবকের পাশে, বিশ্বসুন্দরী না হলেও বেশ সুন্দরী মহিলা। মার পাশে শুয়ে আছে। আমাদের একমাত্র মেয়ে। এই বারোয় পড়েছে। মার চেয়ে সুন্দর, ফুলের মতো টাটকা, দেবালয়ের মতো পবিত্র।
