‘হুগলি নয় গুগলি।’
‘গুগলি কী করে ছাড়ে?’
‘খুব সোজা, বলটাকে ছাড়ার আগে আঙুলের কায়দায় নিজের দিকে টেনে দেয়।’ ‘তার মানে ওইদিকের উইকেটে না গিয়ে এই দিকের উইকেটে চলে আসে।’
‘ওইটাই তো কায়দা। এগোতে পেছোতে, পেছোতে এগোতে মানে সেই গানটার মতো, যাব কি যাব না, পাব কি পাব না, হায়।’
‘আর স্পিন?
‘ভেরি সিম্পল। বলটাকে আঙুলের কায়দায় লাটুর মতো ঘুরিয়ে দেয়।’
‘কী আঙুল, ভাবা যায়, কী করে শেখে?’
‘কেন, কলকাতায় এলেই শিখে যাবে। প্রেমিকাকে ফোন করার জন্যে টেলিফোনের ডায়াল ঘোরাবে। ঘোরাতেই থাকবে। প্রতিবারই খট। নো কানেকশান। আবার ঘোরাবে। আবার, আবার। একদিনেই স্পিন বোলার।’
‘আর লেক-ব্রেক!’
‘খুব সোজা, ব্যাটসম্যানের পা লক্ষ করে বল ছোড়া। সায়েবরা একটা শাস্ত্র বানিয়ে ব্যাপারটাকে কী না কী করে তুলেছে! আসলে কিছুই নয়। ঢিল ছুড়ে আম পাড়ার মতো স্টাম্প পাড়া, কথা ছুড়ে যৌথ পরিবার ভাঙার মতো উইকেটের যৌথ পরিবার ছিটকে দেওয়া। খেলা তো আর জীবনের বাইরে নয়, জীবনটাই খেলা। এই খেয়ালটা রাখতে পারলেই খেলোয়াড়। যেমন নিজের জান সম্পর্কে যে সচেতন, সে জানোয়ার। লোহালক্কড় ছাড়া যে ভাবতে পারে না, সে কালোয়ার। যুদ্ধের ইংরেজি হল ওয়ার। ওয়ার প্রত্যয়ান্ত শব্দই হল খেলোয়াড়।
ভারত হল ক্রিকেট, ফুটবল আর হকির দেশ। হকিতে আজকাল আমরা প্রায়ই হেরে ভূত হয়ে যাই। হকি আর বাঙালির একই হাল। দুটোরই একসময় খুব গর্ব ছিল। সেই গৌরব ভাঙিয়ে আজও চলছে। তবে হকি পশ্চিমবাংলায় তেমন পপুলার হয়নি। অদ্ভুত এক দুর্বোধ্য খেলা। বলটা এত ছোট, চোখে পড়ে না। শুধু লাঠি হাতে পাঁই পাঁই দৌড়। আর গোলকিপারকে এমন অসহায় মনে হয়। সে বেচারার কিছুই করার থাকে না। পায়ে ইয়া দুই লেগগার্ড পরে ভূতের মতো। দাঁড়িয়ে থাকে। হকি পপুলার না হলেও হকিস্টিক এক সময়ে খুব কাজে লাগত। মারামারির করার জন্যে, মাথা ফাটাফাটি করার জন্যে! পরমাণু বোমা জন্মাবার পর যেমন কামান, গোলাগুলির যুদ্ধ প্রায় অচল হয়ে এল, সেইরকম ছুরি, ব্লেড, চপার, বোমা, পাইপগান এসে হকিস্টিককে অচল করে দিয়েছে। ক্রিকেটের আলাদা একটা ইজ্জত! পরশপাথর যা ছোঁয়, তা-ই সোনা হয়। ইংরেজ যা নাড়াচাড়া করে তাই জাতে উঠে যায়। তারা যদি ড্যাংগুলি খেলত তাহলে ড্যাংগুলিরও টেস্ট সিরিজ হত। কলকাতার অধিকাংশ বাই লেন এখন ক্রিকেট সাধনার পিচ। যে কোনও খেলারই কিছু টার্মস জানা থাকলেই সমঝদার। যেমন ক্রিকেট মাঠের কোন পজিশানে। কী নাম মুখস্থ করতে হবে। চেনার দরকার নেই। কণ্ঠস্থ করলেই হবে। স্লিপ, গালি, পয়েন্ট, কভার পয়েন্ট, একস্ট্রা কভার, মিড অফ, সিলি মিড অফ, মিড অন, সিলি মিড অন, লং অন, লং অফ, শর্ট লেগ, স্কোয়ার লেগ, ডিপ স্কোয়াল লেগ, ডিপ ফাইন লেগ। জানতে হবে বল করার ধরনের কিছুনাম—গুগলি, ইয়র্কার, স্পিন, লেগব্রেক। আর কী! কেউ তো আর বলছেনা, তুমি খেলে দেখাও। তুমি করে দেখাও।
আমি তো খাটে বসে আছি। পিঠে তিন থাক বালিশ। সামনে টিভি। ইন্ডিয়া ভার্সেস ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ঘরে আরও অনেক দর্শক। ওই সব নাম মাঝে মাঝে বলতে হবে।
‘দেখছ, দেখছ, বলটা, ইয়র্কার।’
‘শ্রীকান্তের দোষ কী, ইয়র্কার খেলার ক্ষমতা ব্র্যাডম্যানেরও ছিল না।’
‘কপিলের উচিত আজাহারকে স্লিপ থেকে গালিতে সরিয়ে আনা।’
কেউ চ্যালেঞ্জ করবে না, বলটা ইয়র্কার ছিল কি না। গুগলি কি না। মাঠে খেলা খুবই কঠিন। খাটে খেলা খুব সহজ। স্মরণশক্তি থাকলেই হয়ে গেল। তখন আর হাতের খেলায় নয়, মাথার খেলা। টেস্ট ক্রিকেটের অতীত কিছু রেকর্ড মনে রাখতে হবে। কথা বলতে হবে জোর দিয়ে। আর তো কোনও কিছুর প্রয়োজন নেই। সত্যি খেলোয়াড় হলে পলিটিক্সের মধ্যে পড়তে হবে। তা না হলে, ইন্ডিয়ান টিমে কেন বাঙালি নেই। গাভাসকারে কপিলে মাঝে মাঝেই কেন সংঘর্ষ! কেন একবার ও বসে তো ও ওঠে, ও ওঠে তো সে বসে। সিনেমার মতো ক্রিকেট-গসিপে কাগজ ঠাসা। আমার খাটেই ভালো। আর ভালো কিছু বই, ব্লাসটিং ফর রানস, সানি উইকেট।
ফুটবল তো আমাদের খেলা। তবে মুশকিল বাধিয়েছে আমার খাট আর টিভি। দুটো ওয়ার্ল্ড কাপ। দেখে আমাদের খেলায় আর খেলা পাই না। কথায় কথায় মারাদোনা, সক্রেটিস। আমাদের এখানে খেলোয়াড় যত না খেলে, বেশি খেলে সাপোর্টার। কিছু খেলা আছে যেমন ফুটবল, ক্রিকেট, যার ওপর ঝোঁক না থাকাটাইজ্জতের প্রশ্ন। আভিজাত্য। ব্লাড সুগার, প্রেসার, হার্ট ডিজিজ হল অ্যারিস্ট্রোক্র্যাসির লক্ষণ, সেইরকম ফুটবল আর ক্রিকেট। ফুটবল দুটো বড় দলের
যে-কোনও একটি দলের সাপোর্টার হতে হবে। আর গোটাকতক টার্মস শিখে রাখতে হবে— যেমন অফসাইড, ডিফেন্স, ফরওয়ার্ড লাইন, রাইট ইন, রাইট আউট, টাইব্রেকার। এর মধ্যে অফসাইডটা অবশ্যই জানতে হবে। মাঝে মাঝে খেলা দেখতে দেখতে বলতে হবে অফসাইড, অফসাইড। অফসাইড না বললে ভালো রেফারি হওয়া যায় না, বিশিষ্ট দর্শক হওয়া যায় না। উচ্চাঙ্গ সংগীতে মাঝে মাঝে মাথা দোলাতে হয়, ‘অহো অহো’ করতে হয়। ফুটবলে সেইরকম অফসাইড। এবারের বিশ্বকাপে কোনও খেলোয়াড়েরই তো বিপক্ষের গোলের কাছাকাছি যাবার উপায় ছিল না। এগিয়েছে কি অফসাইড। চেষ্টাচরিত্র করে যা-ও বা একটা গোল দিলে, অফসাইড। হয়ে গেল। আপদ চুকে গেল। অফসাইডের মতো জিনিস নেই। সব সাধনা এক কথায় পণ্ড। সাধকরা বলেন, সংসার থেকে দূরে থেকে সংসার করাটাই বেদান্তের একটা পথ। নির্লিপ্ত। নিরাসক্ত। তাঁরা উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন, ‘মনে করো তুমি একটা সিনেমা দেখছ। সিনেমা দুভাবে দেখা যায়। সিনেমার চরিত্রে নিজেকে হারিয়ে ফেললে, কখনও হাসবে, কখনও কাঁদবে, আতঙ্কের দৃশ্যে চেয়ারের হাতল চেপে ধরবে। সারাক্ষণ সে এক যন্ত্রণা! কিন্তু যদি মনে রাখা যায়, আরে এ তো সিনেমা, এ তো মায়া, তাহলে আর কিছুই হবে না। তখন চোখ আর মন দুটোই যাবে সমালোচনার দিকে। কার অভিনয় ভালো হল। কার ঝুলে গেল! কাহিনিটির ত্রুটি কোথায়। সুর কেমন। পরিচালনা কেমন! খেলা তো খেলার খেলা। বেদান্ত বলছেন, জীবন হল মায়া, অভিনয়, খেলা স্বপ্ন। ইংরেজ শেকসপিয়র বলছেন, লাইফ ইজ এ স্টেজ। শাক্ত কবি। বলছেন, জীবন রঙ্গমঞ্চ।
