আমি জিমন্যাস্ট হতে চাইনি। যেমন চোরেরা থানা অফিসারকে বলে হজৌর আমি চোর হতে চাইনি। যেমন মাতাল, স্ত্রী-র ঝাঁটা পেটা খেতে খেতে বলে, মাইরি বলছি আমি ছুঁতে চাইনি, সাধনটা জোর করে খাইয়ে দিলে। আমি যে রাজ্যের ভোটার, রেশনকার্ড হোল্ডার, মানুষ আর। বলব না, কারণ আমি, যাদের মানুষ বলে, অন্যান্য দেশে যাদের মানুষ বলা হয়, আমি সে দলে পড়ি না।
আমার রাজ্যে গত স্বাধীনতার পর থেকে, গত বলছি এই কারণে স্বাধীনতা মারা গেছে। এখন আমরা আর শৃঙ্খলমুক্ত নই শৃঙ্খলামুক্ত অর্থাৎ বিশৃঙ্খলা, তা সেই স্বাধীনতার পর থেকে এ রাজ্যে সর্বব্যাপক-অ্যাথলিট-তৈরি-প্রকল্প চালু করা হয়েছে। এমন কায়দায় করা হয়েছে, কারুর বোঝার উপায় নেই। সকাল-বিকেল ট্রেনিং হয়ে যাচ্ছে। ছেলে, বুড়ো, মেয়েম কেউ বাদ পড়েনি। এই ট্রেনিং-এর যিনি ডিরেক্টার, তাঁর মতো কোচ পৃথিবীতে আর দুটি নেই। তিনি অদৃশ্য, অথচ ট্রেনিং পুরোদমে চলছে। নিজেরাই নিজেদের ট্রেনিং দিচ্ছে। ইংরেজি করলে দাঁড়ায়,
সেলফ-প্রপেলড ট্রেনিং কোর্স। কবীর সাহেব গান লিখেছিলেন, যার ভাবটা ছিল এইরকম, আকাশ আর ভুমি দুটো বিশাল চাকি, সেই দুই চাকির মাঝখানে মানুষ যেন গমের দানা, অহরহ। পেষাই হয়ে চলছে। অদৃশ্য চাকির মতো, প্রচ্ছন্ন প্রশিক্ষণ প্রকল্প। কেউ জানল না, কেউ বুঝল না, অ্যাথলিট হয়ে গেল, জিমন্যাস্ট হয়ে গেল। সকালবেলা অফিস যেতে হবে, ব্যবসায় বেরোতে হবে। জীবিকার সন্ধানে সুস্থ সমর্থ মানুষকে বেরোতেই হবে। বাস, ট্রাম, ট্রেন ধরতেই হবে। না ধরে উপায় নেই। উপোস করে মরতে হবে। পৃথিবীর সব সভ্য দেশে কী হয়! ঝকঝকে, তকতকে একটা বাস স্টপেজে এসে দাঁড়ায়। মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। টুকটুক করে এক-একজন উঠে পড়ে। বাস ছেড়ে দেয়। আমাদের সিস্টেম অন্যরকম। অনেকে মনে করেন, এ আবার কী! এ আবার কী মানে! আমরা অ্যাথলিট চাই। স্বামী অ্যাথলিট, স্ত্রী অ্যাথলিট, ছাত্র, শিক্ষক, বড়বাবু, ছোটবাবু, জামাইবাবু, কামাইবাবু, হেঁপো রুগি, বেতো রুগি, ইচ অ্যান্ড এভরিওয়ান, হবে জিমন্যাস্ট।
সেই কারণে, আমাদের দৃশ্যটা হয় এই রকম:বাস আসছে। বাস আসছে, না তাল তাল মানুষ আসছে বোঝার উপায় নেই। ইঁদুর ধরা কলের মতো। এদিকে ঝুলছে, ওদিকে ঝুলছে। এদিকে মাথা, ওদিকে পা। ন্যাল ব্যাল, ঝাল ঝাল বাঙালি পাঁঠার দোকানের রেওয়াজি মালের মতো।
আর কী! সামনের আর পেছনের গেটে দুই ওস্তাদ হাতল ধরে জানালার রড ধরে, কখনও ঝুলে, হাত তুলে, পা তুলে, ডিগবাজি খেয়ে, চিৎকার করে, আশপাশের লোকের পিলে চমকে দিয়ে কর্পোরেশনের কুকুর ধরা গাড়ির মতো, কি একটা সামনে এসে হ্যাঁচকা মেরে থামল। অনেকের সঙ্গে আমিও দাঁড়িয়ে আছি। এই সময় আমি, টেনিস আর ফুটবল দুটোকে এক সঙ্গে পাঞ্চ করে টেনিফুটুস খেলি। সেটা কী? ওই খাট আর টিভি চাই। এ খেলার কোনও গ্রামার নেই। কোনও কোচ নেই। খাটে বসে, টিভি দেখে শিখতে হয়।
নাভ্ৰাতিলোভার খেলা দেখতে হবে। এ পাশে তিলোভা, ওপাশে মার্টিনা। মার্টিনা সার্ভিস। করছেন। তিলোভা এপাশে কী করছেন? ভালোভাবে লক্ষ করুন। তিলোভা সামনে ঝুঁকে পড়েছেন। পেছনটা দুলছে। কীভাবে দুলছে! দুটো বাচ্চা বেড়াল যখন খেলা করে তখন একটা আর একটার ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে পেছনটা যেভাবে দোলায়, ঠিক সেইভাবে। বাস আসছে। আমি সামনে ঝুঁকে পড়ে পেছন দোলাচ্ছি। মার্টিনার সার্ভিস আসছে। খপ করে বাসের হাতলটা ধরতে হবে, তারপর ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবলের কায়দা। ডাইনে-বাঁয়ে ডজ করে গোলে ঢুকে যাও। ভেতরে ট্রাপিজের খেলা। ফ্রি স্টাইল রেসলিং। সামারসল্ট। সব মিলিয়ে পরিপূর্ণ একটি অলিম্পিক।
জাতীয় পরিকল্পনায় আমরা যেটার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছি, সেটা হল ধৈর্য আর সহিষ্ণুতা। দাঁড়িয়ে থাকো। বাসের জন্যে দাঁড়াও। দাঁড়িয়েই থাকো। গ্যাসের লাইনে দাঁড়াও। গ্যাসের সঙ্গে ওয়েট লিফটিংও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। আজকাল রিকশায় খালি সিলিন্ডার চাপিয়ে ডিপোয় নিয়ে যেতে হয়। সিলিন্ডার নামানো, সিলিন্ডার ওঠানো একটা ভালো ব্যায়াম। হাতের গুলিটুলি বেশ ভালো হয়। ঘাড়ের ব্যায়াম হয়। এই কাজটা আজকাল মেয়েদের করতে হয় বেশির ভাগ। ফলে মেয়েদের স্বাস্থ্য আজকাল ভালোই হচ্ছে। কেরোসিনের লাইন। ব্যাঙ্কের কাউন্টারে লাইন। রেশনের দোকানে লাইন। দাঁড়াও। দাঁড়িয়ে থাকো। এই দাঁড়িয়ে থাকার ফলে পায়ের হাড়গুলো বেশ ভালো হচ্ছে। কোমরের জোর বাড়ছে। আর বাড়ছে ধৈর্য। মায়েদের স্কুলে ছেলেমেয়ে নিয়ে যাওয়া তারপর ছুটির আগে গেটের সামনে তীর্থের কাকের মতো দাঁড়িয়ে থাকা। এ সবই হল ওই বৃহত্তর জাতীয় পরিকল্পনার অঙ্গ। খেলোয়াড় তৈরি করো।
মাঠে-ময়দানে যাবার দরকার নেই। খাটে বালিশের পর বালিশে পিঠ রেখে বোলো ঠ্যাং ছড়িয়ে, সামনে খুলে রাখো টিভি। একদিনের ক্রিকেট তো অনবরত হচ্ছে। আগে কলেরা-টলেরা হলে বলতো, মড়ক লেগেছে। এ যেন ক্রিকেটের মড়ক! কোনও কিছু করার উপায় নেই। টিভি-র সামনে থেকে নড়ার উপায় নেই। সকাল ন’টা পনেরো কি দশটা। বাজার করা কি দোকান করা মাথায় উঠে গেল। দাড়ি কামানো বন্ধ। এমনকী নাওয়া-খাওয়া মাথায় উঠে গেল। যা হয় ভাতে ভাত করেই ছেড়ে দাও। হোল ফ্যামিলি সারি দিয়ে টিভির সামনে। কত বড় সমস্যা! গাভাসকার কেন যে তেড়ে মারছেন না। এই ঠুকঠুক করে খেলার সময়। মাঠের সঙ্গে ডিরেক্ট টেলি-লিঙ্ক থাকলে, আমার উপদেশ ছুড়ে দিতুম, এটা আপনার টেস্ট নয়। আর রেকর্ডে দরকার নেই। আপনার ওই এক দোষ, একের পর এক কেবল রেকর্ড করার চেষ্টা। মারশালের বল কি ওভাবে মারে! ফাস্ট বলে খেলার নিয়ম হল, উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে আসুন, খুব বেশি না, সামান্য কয়েক পা, তারপর হাঁকড়ান। একেবারে তছনছ করে দিন। মারুন ছয়। ছয়ের পর ছয়। তারপর ছয়। মেরে গ্যালারিতে পাঠিয়ে দিন। এই বলটা মনে হল হুগলি ছিল।’
