পরেশ সারা হলঘরের ধুলো ঝাড়তে পারে। ফ্ল্যানেল দিয়ে পিতলের কারুকাজ করা ফুলদানি, ছবির ফ্রেম চকচকে করতে পারে। ফেদার ডাস্টার দিয়ে গ্র্যান্ড পিয়ানোর উপর থেকে। পাউডারের সূক্ষ্ম প্রলেপের মতো ধুলো উড়িয়ে দিতে পারে। মৃগাঙ্কভূষণের শুভ্র দাঁত থেকে ঝুল সরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু পঙ্খের কাজ করা উত্তরের দেয়াল থেকে বিশ্রী ছোপ কী করে সরাবে! যা ভিতর থেকে আসছে, অনবরত আসছে তাকে সে আটকায় কী করে! অল্প অল্প চুন গুড়ো হয়ে পুরু কার্পেটের উপর ঝরে পড়ছে। দেয়ালের ওই নোনা ছোপ পরেশের মনে তার নিজের পিঠ বেয়ে ক্রমশ উপরের দিকে উঠে আসছে।
বয়স যখন তার পনেরো তখন থেকে সে এ বাড়িতে আছে। এখন পঁয়ষট্টি। যখন এসেছিলেন তখন তার নিজের জীবনে সকাল, এই সংসারের মধ্যাহ্ন। এরপর সে গোধূলি দেখেছে। রাত্রি এসেছে, পায়ে পায়ে। এখন বোধহয় মধ্যরাত। মাঝে মাঝে মনে হয় ঘোরানো সিঁড়ির নীচে, কিংবা মালপত্র রাখার খুপরি ঘর থেকে প্রহরে শেয়াল ডাকছে। শহর কলকাতায় শেয়াল? না। শেয়াল তার মনে! এই বাড়িতে তার সুদীর্ঘ জীবনে সে অনেক শেয়ালের রজনী দেখেছে। সাদা। উর্দি পরে রঙিন গেলাসে রঙিন পানীয় পরিবেশন করতে করতে তার মনে হয়েছে সারসের ভোজ সভায় শেয়ালের বোকামি।
পুবের জানালা খুলে দিলে, সকালের রোদ কার্পেটে লুটিয়ে পড়ে উত্তরের দিকে কিছুটা গড়িয়ে আসে, তারপর চেয়ার আর পায়ায় জড়াজড়ি হয়ে একটা লোমশ বুড়ো কুকুরের মতো কার্পেটের উপর কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে উঠে চলে যায়। শেষ বেলার পশ্চিমের জানলা খুললে একটু রোদের জলাশয় তৈরি হয়। পুরোনো কার্পেট থেকে বয়সের গন্ধ ওঠে। কিছুটা রোদ খাওয়াতে পারলে যৌবন হয়তো ফিরে আসত। দেয়ালের ক্ষয় হয়তো আটকানো যেত।
ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে পরেশ মাঝে মাঝে বসে পড়ে। আগেকার মতো এক দমে কাজ করতে পারে না। অবশ্য কাজের আর আছে কী? এক সময় ছিল যখন এ বাড়িতে নিশ্বাস ফেলার সময় পাওয়া যেত না, আর এখন? এখন কাজ খুঁজে বের করতে হয়। পরেশ কাঁধের ঝাড়ন সোফার হাতলে নামিয়ে রাখল। মনে পড়ল আজ থেকে তিরিশ বছর আগে এই চেয়ারে বাংলার লাটসাহেব বসেছিলেন আর ওই উলটো দিকেরটায় বসেছিলেন মৃগাঙ্কভূষণ। সারা ঘরে লোক থইথই করছে। মাথার উপর সবক’টা ঝাড়লণ্ঠন জ্বলছে। কী সব জমকালো পোশাক, সুগন্ধ। দিদিমণির বয়স তখন কত হবে? পরেশ মনে মনে হিসেব করল আঠারো থেকে কুড়ির মধ্যে। একেবারে সাদা পোশাক পরে ওই পিয়ানো বাজিয়ে দিদিমণি গান গেয়েছিলেন সে রাতে।
ঘরের কোণে গ্র্যান্ডফাদার ঘড়িটা মিঠে সুরে একবার বাজল। পরেশ অতীত থেকে বর্তমানে। ফিরে এল। সামনের দিকে তাকাল, তার দৃষ্টি হলঘর থেকে গড়িয়ে কার্পেট বেয়ে দরজা পেরিয়ে উপরে ওঠার সিঁড়ি বেয়ে একটা বাঁক উঠলেই পরেশ দোতলায় উঠে যেত। টানা মার্বেল পাথর বাঁধানো চওড়া ঢাকা-বারান্দা পুব থেকে পশ্চিমে চলে গেছে। মেহগনি কাঠের বড় বড় দরজা লাগানো সারি সারি ঘর। একেবারে শেষের ঘরে এই বাড়ির শেষ উত্তরাধিকারিণী এখনও। বিছানায়। বিশাল খাটের তুলনায়, খাটো শরীর। কোঁচকানো চাদরের সমুদ্রে মোচার খোলা। মৃগাঙ্কভূষণের একমাত্র মেয়ে পদ্মিনী। পরেশ পদ্মিনীর কথা ভেবে একটু চঞ্চল হয়ে উঠল। মা মরা মেয়েকে পরেশই মানুষ করেছে। কার্পেট মোড়া সিঁড়ি দিয়ে মৃগাঙ্কভূষণকে মধ্যরাতে শোবার ঘরে তুলে দিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে জুতো খুলে দিয়ে, আলো নিভিয়ে দরজা ভেজিয়ে পরেশ দৌড়ে আসত পদ্মর ঘরে। কোনওদিন। দেখত ফুলের মতো ঘুমোচ্ছে, কোনওদিন দেখত জানালার কাছে চেয়ারে বসে আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে আছে।
সেই পদ্ম আজ প্রৌঢ়া। বাতে পঙ্গু! বিছানা আর ঘর এরই মধ্যে জগৎ সীমাবদ্ধ। সাড়ে আটটা ন’টার মধ্যে পরেশ এক গেলাস গরম জল, চা আর হট ব্যাগ নিয়ে উপরে উঠবে। সাবধানে দরজা খুলে ট্রেটা টিপয়ের উপর রেখে, একটা ওয়াশ স্ট্যান্ড বিছানার কাছে টেনে আনবে। কোনও কোনও দিন কার্পেটের উপর থেকে গড়িয়ে যাওয়া কাচের গেলাস তুলে রাখতে হয়। শেষ পেগ এক চুমুকে শেষ করে পদ্মিনী এইভাবেই গেলাস ছুড়ে ফেলে দেয়। পদ্মিনী উঠবে।
কোনওদিন এক ডাকে। কোনওদিন ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙে না। তখন পরেশ হাতির দাঁতের একটা পেপার কাটার নিয়ে পায়ের তলায় বারকতক সুড়সুড়ি দেয়। মোমের মতো পা আপেলের মতো রক্তাভ গোড়ালি।
বিছানায় বসে ওয়াশ স্ট্যান্ডে মুখ ধোবেন পদ্মিনী। তারপর এক কাপ চা খাবেন, লেবু আর অ্যাসপিরিন দিয়ে। টকটকে মুখে অসম্ভব খাড়া একটা নাক। টানা টানা প্রতিমার মতো চোখ, অসম্ভব একটা ব্যক্তিত্ব। পরেশ মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবে পদ্মিনী যখন ছোট, যখন একসঙ্গে দুজনে খেলা করত তখন দুজনের মধ্যে ব্যক্তিত্বের এই ব্যবধান ছিল না। তারপর বয়সের সঙ্গে সঙ্গে লাল রক্ত যখন নীল হয়ে আসতে লাগল, পরেশ আর তখন খেলার সাথী নয়। সম্পর্ক তখন প্রভু-ভৃত্যের।
পরেশ পেছন ফিরে তাকাল, মৃগাঙ্কভূষণ হাসছেন। পরেশ লজ্জা পেয়ে তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল। হাসিটা যেন নীরব ভৎসনা, যে সোফায় লাট-বেলাট বসতেন, যে সোফায় স্বাধীন ভারতের যত ভাগ্যবিধাতারা বসে গেছেন, সেই সোফায় পরেশ তুই! সাম্যবাদের চূড়ান্ত হয়ে গেল যে! এতটা কি ভালো! পদ্মিনী যখন চলতে ফিরতে পারতেন তখনও পরেশ কোনওদিন সোফায় বসার সাহস পেত না। কার্পেটে বসে হুকুম শুনত। ইদানীং সে নির্ভয়। বয়স আর অত্যাচার আর নীল রক্তের অভিশাপ তার শেষ প্রভুকে শক্ত দুটো হাতে যেন পাকিয়ে দিয়েছে। শেষ কতবছর আগে দৃপ্তভঙ্গিতে ওই সিঁড়ি দিয়ে পদ্মিনী ঘুরে ঘুরে পায়ে পায়ে নেমে এসেছে তার মনে নেই। এই ঘর সোফা এই কার্পেট এই আয়োজনের মধ্যে গত পঞ্চাশ বছর ঘুরতে ঘুরতে পরেশ মাঝে মাঝে নিজেকে প্রভু ভেবে ফেলে; কিন্তু সে সাময়িক, কোথা থেকে সেই পঞ্চাশ বছরের ভৃত্য এসে কান ধরে তাকে প্রভুর আসন থেকে তুলে দেয়।
