হলঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে পরেশ দরজার কাছে এসে একবার থমকে দাঁড়াল। দরজার পাশে সেই ছবিটা। আর এক মৃগাঙ্কভূষণ। ১৯৪৭ সালের মৃগাঙ্কভূষণ! জনপ্রতিনিধি! মন্ত্রী মৃগাঙ্কভূষণ। উলটোদিকের দেয়ালের অয়েল পেন্টিংয়ের হাসি মুখে নেই। গম্ভীর সৌম্য মুখ। ব্রত উদযাপনের সংকল্প মুখে। পরেশ যেন অজস্র কণ্ঠের জয়ধ্বনি শুনতে পেল, অজস্র হাতের তালি। মৃগাঙ্কভুষণ আজ থেকে ২৮ বছর আগে যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন যে বক্তৃতাকে উচ্ছ্বাস জানিয়ে একমাঠ মানুষ উল্লাসে উদ্দীপনায় ফেটে পড়েছিল, শব্দতরঙ্গে কান পাতলে পরেশ যেন এখনও স্পষ্ট শুনতে পায় জলোচ্ছ্বাসের কলরবের মতো। পরেশ কাঁধের ঝাড়ন নামিয়ে ছবির ফ্রেম আর কাচটা ঘষে ঘষে পরিষ্কার করে দিল। সংসারে মৃগাঙ্কভূষণ এতবড় একটা উপস্থিতি ছিলেন যে তাঁর অনুপস্থিতিটা যেন মেনে নেওয়া যায় না, ফুলের গন্ধের মতো হাওয়ায় ভাসে, ছায়ার মতো লুটিয়ে থাকে। পরেশ বাড়ির কয়েকটা জায়গায় গেলে এখনও যেন চমকে ওঠে। মনে হয় আরশির সামনে দাঁড়িয়ে দাড়ি কামাচ্ছেন। টেবিলে বসে লিখছেন। কলমের ঠান্ডা শরীরে এখনও হাতের গরম। বাথরুম বন্ধ থাকলে মনে হয়, শাওয়ার খুলে স্নান করছেন। ওয়াশ-বেসিনের কাছে খাবার পর সামনে ঈষৎ ঝুঁকে উপরের পাটির বাঁধানো দাঁত পরিষ্কার করে চট করে মুখে পুরে দিচ্ছেন। খুট করে দাঁত সেট হয়ে যাবার শব্দ যেন এই মাত্র বেসিনের কাছ থেকে ভেসে এল। শোয়ার ঘরে গেলে মনে হয়, বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে আছেন বিশাল বুকের উপর আড়াআড়ি দুটো হাত, একটা পায়ের পাতার সঙ্গে আর একটা পায়ের পাতা জড়ানো। পরেশের জীবনে মৃগাঙ্কভূষণের পঞ্চাশ বছরের অস্তিত্ব যেন মুছে ফেলা যায় না। ফুলদানির ফুলের মতো মনের কোণে প্রতিষ্ঠিত।
কেটলিতে চায়ের পাতা ভেজালেই জলের ভাপের সঙ্গে দার্জিলিং চায়ের গন্ধ পরেশের নাকে এসে লাগে। এই গন্ধটা যেন পরেশের বর্তমানের সঙ্গে অতীতের সাঁকো। জলে চা ভেজে। অতীতে পরেশের বর্তমান ভেজে। যে রাতে মৃগাঙ্কভূষণ শহরে ভুখা মিছিলের উপর গুলি চালাবার নির্দেশ দিলেন সে রাতের কথা পরেশ কোনওদিন ভুলতে পারবে না। সারা শহরে সান্ধ্য আইন। রাত প্রায় বারোটার সময় মৃগাঙ্কভূষণের বিশাল কালো গাড়ি এসে ঢুকল। ক্লান্ত মৃগাঙ্ক সিঁড়ির হাতল ধরে ধরে উপরে উঠে গেলেন। কিছুই খেলেন না সেই রাতে। ইদানীং পান করতেন না। সেদিন আবার দীর্ঘ কয়েক বছর পরে, বোতল আর গেলাসের খবর পড়ল। পরেশ সারা রাত বসে রইল ঘরের বাইরে। সারা রাত মৃগাঙ্ক পান করলেন। শেষ রাতে পরেশ শুনতে পেল মৃগাঙ্ক নিজের সঙ্গে কথা বলছেন, নিজেকে তিরষ্কার করছেন, কাকে যেন বোঝাতে চাইছেন, মাঝে মাঝে চিৎকার করে বলছেন ষড়যন্ত্র।
মৃগাঙ্কর রাজনৈতিক জীবনের চাকা সেই রাত থেকেই যেন ঘুরে গেল। মুখের হাসি মিলিয়ে গেল, আত্মবিশ্বাস খুলে পড়ে গেল। দীর্ঘ সময় উদাস দৃষ্টি মেলে ডেকচেয়ারে শুয়ে থাকতেন। দেখে মনে হত গতিশীল প্রচণ্ড একটা ইঞ্জিন যেন ক্রমশ স্তব্ধ হয়ে আসছে।
এর পরই সেই দিন, মৃগাঙ্ক নির্বাচনে হেরে গেলেন। যে কেন্দ্র থেকে তিনি এতকাল হাজার হাজার ভোটে জিতেছেন সেই কেন্দ্রে তাঁর হার হল খুবই অল্প ভোটে। তাঁর দল ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সারা শহর উল্লাসে, বাজি পুড়িয়ে চিৎকার করে মিছিল বের করে পুরোনো দিন, পুরোনো। নেতৃত্বকে বিদায় জানাল। মৃগাঙ্কভূষণ সে রাতে, খুব অল্প আহার করলেন, দু-চারটে লিখলেন, ডায়েরি লিখলেন, ফোনে অল্প দু-একজনের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললেন। তারপর মাথার কাছে আলো জ্বেলে শুয়ে ছবির বই উলটোলেন। পরেশের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্পও করলেন। সম্পূর্ণ অন্য মানুষ, একেবারে সাধারণ মানুষ। ঘাটের অন্ধকার কোণে বাঁধা ডিঙি নৌকোর মতো স্থির, কর্মহীন।
অতবড় বিশাল মানুষটি, পরেশের চোখের সামনে দেখতে দেখতে কেমন বিবর্ণ, চাকচিক্যহীন হয়ে গেলেন। শীতের ডালের শুকনো পাতার মতো। কালো রঙের বিশাল গাড়ির পরিবর্তে এল ছোটো অস্টিন। গাড়িটা প্রায়ই গ্যারেজে পড়ে থাকত। আগে বাড়ি সবসময় গুণগ্রাহী, স্তাবক, পার্টির দলবলে জমজমাট থাকত। দেখতে দেখতে তারা কপূরের মতো উবে গেল। গোটাচারেক টেলিফোন মিনিটে মিনিটে বেজে উঠত। তারাও নীরব হয়ে গেল।
আগে প্রায় প্রতিদিনই গোটাকতক সভা সমিতিতে হয় প্রধান অতিথি না হয় সভাপতি হতে হত। ব্যস্ত ডায়েরির পাতা উলটে সময় দিতে হত। বহু জায়গায় দুঃখ জানিয়ে প্রত্যাখান পত্র পাঠাতে হত কিংবা বাণী পাঠিয়ে কাজ সারতে হত। ক্ষমতাচ্যুত হবার পর ব্যস্ততা নিমেষে কমে গেল। শেষে বহুদিন পরে কারা যেন একবার এসেছিলেন, শিশুউদ্যানের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ধরে নিয়ে যাবার জন্য। মৃগাঙ্কভূষণ হেসেছিলেন। করুণ হাসি। পরেশকে বলেছিলেন, তলোয়ারে মরচে পড়ে গেলে শিশুদের খেলার জিনিস হয়ে দাঁড়ায়।
দল ভাঙা কিছু প্রবীণ একবার এসেছিলেন, দল গড়ে নতুন স্বপ্ন দেখার প্রস্তাব নিয়ে। শীতের রোদে পিঠ রেখে লনে বসে সেই বৃদ্ধ শার্দুলের দল মৃগাঙ্কভূষণকে ঘণ্টাখানেক ধরে উত্যক্ত করে চলে গিয়েছিলেন। নতুন দলের উদীয়মান নেতারাও একবার এসেছিলেন তাঁদের নতুন দলে
আসবার প্রস্তাব নিয়ে। মৃগাঙ্কভূষণ রাজি হননি। বলেছিলেন, মোমবাতির পরমায়ু শেষ হয়ে। গেছে। নতুন রোশনাই আর সম্ভব হবে না। মৃগাঙ্কভূষণ নেতা ছিলেন না। দাপট ছিল, লোভ ছিল না।
