সুবীর আসছে। রুমকি রান্নাঘরে চলে গেল। সুবীরের সঙ্গে কোনও কথা না বলে আমি বাথরুমে স্নানে ঢুকে গেলুম। বাথরুমের মতো নিভৃত চিন্তার জায়গা দ্বিতীয় নেই। চিনু মারা গেল আগুনে পুড়ে। পোস্টমর্টেমে সন্দেহজনক কিছু নেই। এখানেই তো সব মিটে যেতে পারত! একটি মেয়ে এল। সঙ্গে নিয়ে এল একগাদা সমস্যা ও সন্দেহ। বন্ধু বিচ্ছেদের উপক্রম। এখন মনে হচ্ছে, বাড়ির কোথায় কী আছে দেখার জন্যে সুবীরের এত উৎসাহ কেন?
আমরা যখন একসঙ্গে খেতে বসলুম, সুবীরকে কেমন যেন একটু অন্যমনস্ক দেখাল। খেয়ে উঠে জামা-প্যান্ট পরে বেরোবার সময় বললে, ‘আমি ব্যবসার কাজে দিন পনেরোর জন্যে বাইরে। যাচ্ছি শুভ্র! তুই এদিকটা ম্যানেজ কর। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’ চলে গেল!
আমি আর রুমকি বেশ অবাক হয়ে বসে রইলুম কিছুক্ষণ।
রুমকি বললে, ‘চলো, অলক্ষুণে বেহালার বাক্সটা পোড়াই। তুমি ওটাকে টুকরো টুকরো করে দাও, আমি কেরোসিন ঢেলে জ্বালিয়ে দি।’
সৎকার করার আগে সেই অপূর্ব সুন্দর বাক্সটা একবার খুললুম। ভেতরে একটা ভাঁজ করা কাগজ। ‘কী আশ্চর্য! এটা আবার কী?’
রুমকি বললে, ‘ছিল না?’
‘না।’
‘খোলো। খুলে দেখ।’
একটা চিঠি।
শুভ্র, এ আমার স্বীকারোক্তি। আমিই সুবীর, আমিই অবিনাশ। চিনুর মৃত্যুর জন্যে আমিই দায়ী। চিনুকে আমি পেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে তোকে ছাড়া আর কিছু চাইত না। আমার ঈর্ষা তাকে প্রাণদণ্ড দিল। অবিনাশ নামে ওই বাড়িতে আমার প্রবল প্রতিপত্তি ছিল। ওর মায়ের সঙ্গে আমার বিশ্রী একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। দোষটা আমার নয় ওই মহিলার। কাকাবাবু অসুস্থ মানুষ। বাইপাস হয়ে গেছে। লোকটার আর কিছু নেই।
মা যে মেয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে, শুনেছি, এই প্রথম দেখলুম। যে-রাতে চিনু আমাকে
জুতো মারলে, সেই রাতেই আমার প্রতিশোধস্পৃহা প্রবল হল। একাধিক রাত আমি ওদের বাড়িতে থেকে দেখেছিলুম, সকালের চা চিনু নিজেই করে। অনেক মাথা খাঁটিয়ে একটু ফুলপুফ প্ল্যান বের করলুম। এমন বরাত, লেগে গেল। খুব ভোরে উঠে খানিকটা মোবিল রান্নাঘরের মেঝেতে কায়দা করে ফেলে রাখলুম। সন্দেহটা যাতে তৃতীয় কারও দিকে যায়, তার জন্যে একটা হেঁয়ালি চিরকুট লিখে ওর মায়ের বালিশের ভেতর রাখলুম। আমি ত্রিসীমানায় আর থাকলুম না। মোবিলে পা স্লিপ করে ওর মায়ের হাত থেকে বাসন পড়ল, চিনু পা হড়কে গ্যাসের ফ্লেমের ওপরে পড়ে সবসুদ্ধ নিয়ে মেঝেতে। বীভৎস! রাতের ঘুম চলে গেল। আমি এখন অন্য ঘুমের কোলে চলে যাচ্ছি। তুই যদি এই স্বীকারোক্তি নিয়ে থানায় যাস, আমাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। তোর প্রেমিকা, তোর বাড়ি—দুটোর ওপরেই আমার লোভ ছিল। ভূতের উপদ্রব আমার প্ল্যান, আউটহাউসের যত কাণ্ড আমি করিয়েছি।
একটা শক্তিরূপিণী মেয়ে তোর জীবনে হঠাৎ এসে পড়ায় তুই জোর বাঁচা বেঁচে গেলি শুভ্র। আমার ভয়ঙ্কর, ভয়ঙ্কর সব প্ল্যান ছিল। আমি জানতুম তুই ফরেস্টে যাবি, আর তখনই ওই প্রাসাদের মতো বাড়িটা আমার দখলে এসে যাবে। চিনু কিন্তু খুব বিশ্বাসযোগ্য মেয়ে ছিল না। রাগী, অহংকারী, বিলাসী, খুঁতখুঁতে। সে আমাকে ধরে ফেললেও উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে যাচ্ছি, রুমকি দেবী। দেবী দুর্গা। তোদের জীবনে সুখ আসুক।
আর একটা আশ্চর্য কথা বলে যাই, গয়নাগুলো সব রুমকির। রুমকির মা জমিদারের মেয়ে ছিলেন। স্বামীর অবস্থা দেখে গয়নাগুলো তোর দাদুর কাছে রেখেছিলেন। তারপর এল সেই দুর্যোগ। বোলপুরের কাছে রেললাইনে যে অজ্ঞাত পরিচয় মহিলা কাটা পড়েছিলেন, তিনি। রুমকির মা।
দেখ, কী মজার ব্যাপার, ভদ্রমহিলা কেমন না জেনেই ঠিক জায়গায় মেয়ের বিয়ের গয়না রেখে গিয়েছিলেন, পাত্রটিও তুলনাহীন ভালো। তিনি ওপর থেকে দেখে সুখী হবেন, আশীর্বাদ করবেন নিশ্চয়! ভগবান আছেন, কী বলিস শুভ্র! গয়নাগুলো কিন্তু আমার আবিষ্কার। বিদায়! তোদের ঘৃণাই আমার পাথেয়। একটা হিরের আংটি বাথরুমের সোপকেসে রইল। ঘৃণ্য অপরাধীর প্রীতি উপহার।
সুবীর।
রুমকির চোখে জল। আমার ভেতরটাও কেমন যেন থমথম করছে। না, ভাবব না। কিছুই ভাবব না। ভাবনা খুব খারাপ জিনিস। আমার মা বলতেন—সমর্পণ। ঠাকুরের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে দে।
হঠাৎ রুমকি তেড়েফুঁড়ে উঠল, ‘আজ পূর্ণিমা। আজই আমরা বিয়ে করব।’
‘সে কী, পুরোহিত পাব কোথায়?’
‘নিজেদের বিয়ে আমরা নিজেরাই করব। তুমি অনেক ফুল আর মালা কিনে আনো। মায়ের ছবির সামনে। চাঁদ সাক্ষী।‘ বিছানায় থইথই চাঁদের আলো। সাদা সাদা ফুল, মালা, সুরভি। রুমকির সুন্দর কপালে সোনার টিপ। তার ওপর চাঁদের আলো। রুদ্ধগলায় বললে, ‘যেদিন তোমার কাছে এলুম, সেদিন সুবীরদা ওই ওই পাশটায় শুয়েছিল।’ সেই বেহালা আজ আবার বাজছে। কে! কে বাজায়!
কেয়ারটেকার
পরেশ ক’দিন থেকে লক্ষ করছে হলঘরের উত্তর দিকের দেয়ালে যেন নোনা ধরেছে। ছোপ ছোপ অসুস্থ ফুলের মতো একরাশি দাগ দেয়ালে ভেসে উঠেছে। হয়তো আরও অনেক দাগ বিশাল পেন্টিং-এর নীচে চাপা পড়ে আছে। মৃগাঙ্কভূষণ রায় ছড়ি হাতে এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছেন। ছবি বলেই হাসিটা অক্ষয় হয়ে আছে। সাহেব আর্টিস্টকে পঞ্চাশ বছর আগে এই ভাবে হাসি হাসি মুখেই সিটিং দিয়েছিলেন। এই ঘরেই তখন তার হাসির সময়। সারা সংসার তখন তাঁর সঙ্গে হাসছে। তাঁর বিশাল চা বাগান সেই সময় দার্জিলিং হিলসের গা বেয়ে থাকে থাকে ধাপে ধাপে নেমে এসেছে। অর্থ, সম্পদ, প্রতিপত্তির উপর একটা পা তুলে দিয়ে তিনি তখন হাসছেন।
