‘কেন? আমার ওপর এত রাগ কেন?’
‘বেহালাটা চাই, বাড়িটাও চাই। ওই বাড়িটাকে কেন্দ্র করে এই পাড়ায় পাপ ঢুকেছে।’
‘আমি এখন কী করব?’
রুমকি গম্ভীর মুখে বললে, ‘বিয়ে করবে।’
‘কাকে?’
‘কাকে আবার, আমাকে।’
‘তোমাকে করব কেন?’
‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, তাই।’
‘কেন ভালোবাস? আমাকে কেউ ভালোবাসতে পারে আমি বিশ্বাস করি না।’
‘যে গুণ থাকলে মেয়েরা ভালোবাসতে পারে, তোমার মধ্যে সেইসব গুণ আছে। সব মেয়েই
তোমাকে ভালোবাসবে সেটাই আমার সমস্যা।’
‘তোমার মতো একটা স্মার্ট মেয়েকে আমার মতো একটা ক্যাবলা কতদিন কাছে রাখতে পারবে, সেটাই আমার ভয়।’
‘তুমি রাখবে কেন, আমিই তো তোমাকে আমার বুকে জড়িয়ে রাখব। আমার কত স্বপ্ন, তবে কী জানো, আমাকে মেরে ফেলতে পারে। অবিনাশযদি আমাকে বিনাশ করে!’
রুমকি একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেল। দেহটাকে চেয়ারে এলিয়ে দিয়েছে। চোখ দুটো আধ বোজা। স্বপ্নের রিলে হচ্ছে, ‘বাগানঘেরা সুন্দর একটা বাংলো। ছোট্ট একটা মোটরগাড়ি, লাল রঙের। কাঠের মেঝে। নরম কার্পেট পাতা বসার ঘর। এক দিকের জানালায় ফরেস্ট, আর দিকের জানালায় পাহাড়। সুন্দর একটা রান্নাঘর। সুন্দর একটা চানঘর। একটা ধ্যানঘর। একটা গোল্ডেন রিট্রিভার কুকুর। ভালো একটা মিউজিক সিস্টেম। আর তোমার মতো একটা তুমি। বাঁচতে বাঁচতে আমরা দুজনে বুড়ো-বুড়ি হয়ে যাব। আমাদের কোনও সন্তান থাকবে না। শীতের রোদে গোলাপ বাগানে গার্ডেন চেয়ারে দুজনে বসে থাকব। আমার হাতে বোনা সাদা পশমের। সোয়েটার তোমার গায়ে। মাথায় বেরে ক্যাপ। কোনও দুশ্চিন্তা নেই, বেয়াড়া কোনও আকাঙ্ক্ষা নেই। বাইনোকুলার দিয়ে পাখি দেখব। পাহাড়ের দিক থেকে বয়ে আসবে শীতল বাতাস। শীতের পাতা বড় বড় গাছ থেকে খস খস করে ঝরে ঝরে পড়বে।’
সুবীর ফিরে এল।
বেশ আড়ষ্ট হয়ে গেলুম, এ কোন সুবীর!
রুমকি বললে, ‘যাচাই করে নাও।’
সুবীর একটু থতোমতো খেয়ে গেল।
রুমকি বললে, ‘যাচাই হয়ে গেছে, আসল সুবীর।’
জিগ্যেস করলুম, ‘কী ভাবে করলে?’
‘তোমাকে বলেছিল, আমাকে যাচাই করে নিতে। এই যাচাই শব্দটা শুনে সুবীরদা কেমন যেন হয়ে গেল। অবিনাশ হলে বুঝতই না।’
‘তোর যে একজন যমজ ভাই আছে কোনওদিন বলিসনি তো!’
‘আমাদের পরিবারের লজ্জা। আমি ভুলতে চাই। সে এক সমস্যা। হয় সে জেলে যাবে, না হয় আমি যাব। অথবা আমাকে আত্মহত্যা করতে হবে। তোদের দুজনকে আমার একটা আইডেন্টিফিকেশন মার্ক দেখিয়ে রাখি যেটা ওর নেই। এই দেখ আমার কপালের ডানপাশে হেয়ার লাইনের নীচে ছোট্ট একটা কাটমার্ক। ভাঙা কাচ ঢুকে গিয়েছিল। খুব সাবধান, দ্বিতীয় সুবীর যে কোনও সময় আসতে পারে, আর প্রথম সুবীর অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। আমাকে। একজন ফোন করেছিল—বেহালার বাক্সটা কোথায়! যে কোনও দিন এই বাড়িতে হামলা হতে পারে। আমাদের প্রথম কাজ, এই মুহূর্তে হোলার বাক্সটাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে।’
‘কী ভাবে?’
‘আগুন। আগুনের মতো আর কী আছে! আর সেই কাজটা এখুনি করতে হবে।’
‘অত সুন্দর বাক্সটা!’
‘তোর সবচেয়ে বড় বিপদ কী বল তো—তুই চুরি না করেও চোর।’
‘গয়নাগুলো ফেরত দিয়ে দিলেই তো হয়।’
সুবীর দৃঢ় গলায় বললে, ‘না, ও গয়না চিনুর। তার মানে তোর।’
‘আমি তো চিনুকে বিয়ে করিনি।’
‘করবি! চিনু তো তোর সামনে বসেই আছে।’
চারদিক থেকে কীরকম একটা ভয় ঘিরে আসছে। নারকেলডাঙার যে বন্ধ কারখানায় পোডড়া বাড়ি থেকে সুবীরের যমজ অবিনাশ ‘অপারেট’ করছে, সেই বিখ্যাত স্বদেশী ফ্যাক্টরির ফাউন্ডার ছিলেন সুবীরের ঠাকুরদা। কোন জায়গার কী পরিণতি! পৃথিবীর সব দেশ চেষ্টা করছে এগোতে, আমরা চেষ্টা করছি পেছোতে।
সুবীর বললে, ‘আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে।‘
‘কী আইডিয়া?’
‘বেহালার কেসটা লুকিয়ে লুকিয়ে নারকেলডাঙার বাগানে ওদের ঘাঁটিতে রেখে আসব।’
‘কী লাভ?’
‘নিজেদের মধ্যে লাঠালাঠি শুরু হয়ে যাবে। প্রত্যেকেই প্রত্যেককে সন্দেহ করতে থাকবে।’
আমি বললুম, ‘এই উদবেগ, এই অশান্তি এক কথায় মিটে যায়, যদি গয়নাগুলো চিনুর মাকে দিয়ে আসি। কারণ চিনুর মৃত্যুর পর সমস্ত কিছুর মালিক চিনুর মা।’
রুমকি বললে, ‘অসম্ভব! এমনও তো হতে পারে গয়নাগুলো তোমার দাদুর কাছে বাঁধা রেখে টাকা ধার নিয়েছিল? এমনও তো হতে পারে ওর মধ্যে তোমাদের গয়নাও আছে। এটা কাঁচা প্রস্তাব?’
সুবীর চান করতে গেল।
রুমকি হঠাৎ বললে, ‘সুবীর একজন না দুজন?
‘মানে?’
‘আমার সন্দেহ হচ্ছে।’
রুমকি ফিশফিশ করে তার সন্দেহের কথা জানাচ্ছে। ‘দেখো, এমনও তো হতে পারে, একটা লোক ডবল রোল প্লে করছে।’
‘সন্দেহের কারণ?
‘সিনেমায় সীতা ঔর গীতা হয়, বাস্তবে দেখেছ?’
‘না। তবে ভ্রান্তিবিলাস পড়েছি।’
সন্দেহের দ্বিতীয় কারণ, আঙুলের আংটি। একেবারে একই আংটি দুজনের আঙুলে থাকতে পারে কি? তৃতীয় কারণ, বেহালার বাক্সটা বাগাতে চাইছে, কারণ ওইটা হল রশিদ। সবচেয়ে বড়ো বিপদ, তোমরা দুজনে গিয়ে লকারে গয়নাগুলো রেখে এসেছ। সুবীর কী ব্যবসা করে? সে। ব্যবসা কেমন চলে? তুমি জানো কিছু?
‘না।’
‘একালে মানুষকে বিশ্বাস করা শুধু বোকামি নয় বিপদেরও কারণ। আমি কে? আমাকে এতটা বিশ্বাসের কারণ? যে-মেয়ে এক কথায় অজানা এক পুরুষের সামনে সব খুলে দাঁড়াতে পারে সে কি ভালো মেয়ে? তুমি আমাকে বিশ্বাস করলে, তোমার বন্ধু আমাকে যাচাই করে নিতে বলল। কেন? তুমি সরল, সে সন্দিগ্ধ। সে ব্যবসাদার।’
