‘কী হল? চোখ বুজিয়ে আছ কেন? তোমার বন্ধু যা দেখতে বলেছে দেখ। তাকাও।’ আমার ভীষণ ভয় করছে। বুক ঢিপঢিপ করছে। মেরুদণ্ডে শীতল স্রোত।
ভয়ে ভয়ে বললুম, ‘তুমি কী করে শুনলে?’
‘আমার কুকুরের কান।’
‘তুমি সব পরে ফেল। আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।’
রুমকি হেসে উঠল, ‘তা কি হয়! নেপালীর ভোজালি জানো?’
‘না।’
‘খাপ থেকে বেরোলে একটু না একটু রক্ত না নিয়ে ঢোকে না। আমার এই বুক তোমার হাত দুটো চাইছে।’
কারও মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়লে যেমন হয়, আমার ঠিক সেই রকম হল। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো রুমকি আছড়ে পড়ল আমার ওপর। কিছুক্ষণ কী হল বলতে পারব না। তাল তাল মাখনের মধ্যে আমি ডুবে যাচ্ছি। আমি যেন একটা পুডিং। ছোট্ট একটা চেরি ফল আমার ঠোঁটের সামনে। এক ঝাঁক টিয়া বাইরের আকাশে বাতাস-কাঁপানো ডাক ডাকতে ডাকতে উড়ে গেল। পরক্ষণেই সেই প্রাচীন ঘুঘুটার ঘুক ঘুক ডাক। সুন্দর একটা দেহের তলায় চাপা পড়ে আছি। চেতনা আচ্ছন্ন হয়ে আসছে। বেলাভূমিতে আঁজলা আঁজলা ঝিনুক ছড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রের ঢেউ। এখন চোখের সামনে সেই ক্ষতস্থান। কোনও এক নেশাকাতর পিতার খোদাই। আর পাশেই রহস্যময় গুহা। বীজ আকারে প্রতিটি মানবসন্তানকে দশমাসের জন্মসাধনা করতে হয়। সুরক্ষিত, শব্দহীন, আলোকহীন সেই নিভৃত। যেখানে খাদ্য আছে, স্নেহ আছে, অদৃশ্য কোনও ভাস্কর আছে। চৈতন্য দিয়ে, সংসার দিয়ে তৈরি করছে মানবদেহ। প্রবেশে পুলকিত আনন্দ, নিমণে কুঁকড়ে যাওয়া যন্ত্রণা। বিরাট জগতের ঝলসে যাওয়া আলোয় ক্রন্দনের ভূমিকায় ভূমিষ্ঠের জীবনকাব্যের শুরু। ঘড়ির টিকটিক। ষাট, সত্তর, আশি।
জানালা খুলে গেল। দরজা উন্মুক্ত। দালানের মেঝেতে খবরের কাগজ। ছুড়ে ফেলে দিয়ে গেছে রবিদা। রুমকি ঝিনুকের মতো দাঁত বের করে হাসছে। সাদা সালোয়ার, সাদা কামিজ। নরম। সাদা ওড়না।
‘তোমার মুক্তি নেই। অজগরে ধরেছে। তুমি এত বোকা কেন?’
‘এ কথা বললে?’
‘কাকে বিশ্বাস করে বসে আছো? এই তো সেই তৃতীয় ব্যক্তি!’
‘কী বলছ তুমি?’
‘সাচ বাত। কম্বল চাপা দিয়ে আগুন নেভাবার চেষ্টা করছি। দূর থেকে সব হইহই করে আসছে। দিদি একটা কথাই বলতে পেরেছিল—বাঁচাস। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, বাঁচাও বলতে গিয়ে বাঁচাস বলেছে; কিন্তু না; পড়ো এইটা, তোমাকে লিখছিল, শেষ করে ডাকে দেওয়ার সময় পায়নি।’
অসমাপ্ত সেই চিঠি—’শুভ্র, সাবধানে থেকো। যেভাবেই হোক ওরা জেনেছে বেহালার বাক্সটা তোমাদের বাড়িতে আছে। আইনজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে জেনেছে আমি মরলে বিষয়-সম্পত্তি ওই মা নামধারিণী মহিলাটি পাবেন। তোমাকে একটা অদ্ভুত কথা শোনাতে চাই, সুবীর একজন নয় দুজন আমি হয়তো—’ চিঠি আর এগোয়নি।
‘এর মানে?’
‘মানে এই হতে পারে, আইডেন্টিক্যাল টুইন। এক সুবীর যেমন ভালো, আর সুবীর সেইরকম খারাপ। উত্তর মেরু, দক্ষিণ মেরু। এইবার ধরো কাল রাতের সুবীর বদলে যদি আর এক সুবীর আসে।’
‘কেন আসবে?’
‘বেহালা উদ্ধারে। সত্তর থেকে আশি লক্ষ টাকার গয়না। সতেরোখানা হিরে, পনেরোখানা রুবি। প্লাস সোনা।’
‘তুমি কী করে জানলে?’
‘এই যে, এই কাগজখানা।’
লম্বা একটা পার্চমেন্ট। গয়নার লিস্ট।
‘তুমি কোথায় পেলে?’
‘চোরের ওপর বাটপারি। এই দ্বিতীয় সুবীর আর কাকাবাবু—এদের একটা ঘাঁটি আছে, নারকেলডাঙার বাগানে।’
‘তুমি কী করে জানলে?’
‘এক সেকেন্ড। আমি আসছি।’
রুমকি বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। মিনিট পনেরো পর একটি মেয়ে ঘরে এসে বললে ‘হাই।’
চোখে সানগ্লাস, চুল অন্যরকম। জিন্স, টিশার্ট। রুমকি বলে চেনার উপায় নেই।
বললে, ‘বসতে পারি?’
‘হ্যাঁ বসুন।‘
বসেই একটা রিভলভার বের করে আমার দিকে নিশানা করে বললে, ‘যা আছে বের করে দাও।’
ভয় পেয়ে গেছি। ইয়ারকি না সত্যি! দুই সুবীরের গল্প, সত্যি না গল্প!
রুমকি কি ওদের দলের!
‘ভিতু, ভিতু’, হেসে উঠল রুমকি, ‘এটা টয় রিভলভার।’
সানগ্লাসটা চোখ থেকে সরিয়ে বললে, ‘তোমাকে মানুষ করতে আমার অনেক সময় লাগবে। তোমাকে আমার বর করব, না ছেলে করব, বউ হব, না মা হব!’
ধর্মের জগতে একটা কথা—সমর্পণ। রুমকির এই একটি কথায় মনে মনে নিজেকে তার কাছে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে দিলুম—কিন্তু, আমি যে তোমাকে চাই, এই একটু আগে যেভাবে পেয়েছিলুম।’
‘থামো, ওটাও আমাকে শেখাতে হবে। আনাড়ি কোথাকার।’
‘তুমি এই মেকআপে কী করো?’
‘ফলো করি। গোয়েন্দাগিরি করি।’
‘এই সাজ নিশ্চয় ওই বাড়িতে বসে করো না?’
‘অবশ্যই না। এজেন্সিতে বসে করি।’
‘অ্যাঁ, সে আবার কী?’
‘দিদি এক ডিটেকটিভ এজেন্সিকে দায়িত্ব দিয়েছিল তার মায়ের রহস্য বের করার জন্যে। চুপিচুপি আমাকে পাঠাত খবর নেওয়ার জন্যে। কর্নেল মুখার্জি একদিন আমাকে বললেন, ঘরের। শত্রু হবে। পারব আমি? নিশ্চয় পারবে। একটাই কায়দা, খুব সহজ হতে হবে। চোখে-মুখে যেন কোনও উদ্বেগ, উত্তেজনা না থাকে। এই ড্রেস তাঁরই দেওয়া। নারকেলডাঙার একটা পোড়ো বাগানে এদের ঘাঁটি। কারবার হল ব্ল্যাকমেল। দিদি মেঝেতে লিখেছিল বিনাশ, ওটা হবে অবিনাশ। ‘অ’টা ঠিকমতো ফোটেনি। এই অবিনাশই দ্বিতীয় সুবীর।’
‘কী কাণ্ড! এখন কোন সুবীর এল বুঝব কী করে?’
‘দেখো, এইরকম যদি হয় প্রথম সুবীর আর এলই না। বেমালুম উধাও করে দিল। তুমি কি জানো এই বাড়ির ওপর নজরদারি আছে? ওয়াচ করছে? তোমাদের আউটহাউসে তাকে ভয় দেখাবার জন্যে যা-তা কাণ্ড করছে। দূর থেকে বেহালার শব্দ ছুঁড়ছে।’
