সুবীর বললে, ‘কেউ ধূপ জ্বালিয়ে পুজোয় বসেছে।’
রুমকি কানে কানে বললে, ‘গন্ধটা চিনতে পারছ?’
‘পারছি।’
‘তোমার কাছে দিদি এসেছিল, আমরা আছি দেখে চলে গেল।’
বোধ হয় একটু আবেগ এসেছিল। বুকের কাছটা কেমন করে উঠল। রুমকি আমাকে তার নরম শরীরে জড়িয়ে ধরে বললে, ‘আমি আছি। আমি তোমাকে যেদিন দেখেছি সেইদিনই ভালোবেসে ফেলেছি।’
সুবীর টয়লেটে গিয়েছিল। দরজা খোলার শব্দ হতেই রুমকি দূরে সরে গেল।
শেষ রাতে যদি কোনও সুন্দরী বলে, ‘ভালোবাসি’, বুকের ভেতরে ভোরের পাখি ডেকে ওঠে।
সুবীর বললে, ‘একটা কথা বলি, রুমকির আত্মকথার দ্বিতীয় পর্বটা আমরা কাল শুনব। আজ আমরা কিছুক্ষণের জন্যে হলেও একটু শুয়েনি। তা না হলে কাল সকালে খুব খারাপ লাগবে। বিরাট খাট, গড়ের মাঠের মতো। তিনজন তিন দিকে। এখন কথা হল, রুমকির যদি আপত্তি থাকে।’
রুমকি বললে, ‘আমি একলা শুতে পারব না। ভয়ে হার্টফেল করব।’
সুবীর ধপাস করে শুয়ে পড়ে বললে, ‘রুমকিকে তোর দিকে নিয়ে নে। গুড নাইট।’
‘একটু আগে বললি, ‘ইনসমনিয়া!’
‘ভোরের দিকে আসে, তিনটে থেকে আটটা।’
সুবীর নেতিয়ে পড়ল। নাক ডাকছে ফুরুর, ফুরুর।
রুমকি আমার পাশে শুয়ে বললে, ‘মনে কোনও পাপ রেখোনা। শরীর আলগা কর।’
মনে পাপ রেখো না। বললেই হল! এ যে আমার কাছে ফুলশয্যার রাত। রুমকি সুন্দরী। চিনুর চেয়ে সুন্দরী। যৌবনের ঢেউ খেলছে শরীরে। সে আমি বর্ণনা করতে পারব না। একাল অনেক এগিয়ে গেছে। সেকাল হলে এমন মেয়েকে মায়েরা চোখে চোখে আগলে রাখত।
দোতলার দালানের আলোটা জ্বেলে রাখা হয়েছে। আলোর আভা জলের ধারার মতো সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে নামছে। ওপাশে সুবীর না থাকলে আমি হয়তো ভীষণ রকমের একটা অন্যায় করে জেলে যেতুম।
রুমকি বললে, ‘ঘুমোলে?
‘না, আসছে না।’
‘আমারও আসছে না। আমার দিকে সরে এসো না।’
আমার একটা হাত টেনে নিয়ে নিজের বুকের ওপর রাখল। শ্বাসপ্রশ্বাসে তার বুক ওঠা-নামা করছে আমার হাতটাকে নিয়ে। এতটা ঘনিষ্ঠতা ভালো লাগছে না। পৃথিবীতে যে-ক-বছর এসেছি। তাতে সার বুঝেছি, আপনার বলতে দুজন, মা আর বাবা, আর সবচেয়ে আপনজন—ভগবান! এসব বাজে—সব ঝুট হ্যায়।
সুবীর ঘুমিয়েছে, না মটকা মেরে পড়ে আছে! আমাদের খানিক ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। ঘি আর আগুন পাশাপাশি। রুমকি আমার খুব কাছে সরে এল। আমার কানের কাছে মুখ। গলায় নরম নিঃশ্বাস। বড়ো এলাচের গন্ধ।
রুমকি ফিশফিশ করে বললে, ‘দিদির মা পাগলের মতো একটা জিনিস খুঁজছে।’
‘কী জিনিস?’
‘কোথা থেকে শুনেছে, পারিবারিক যত গয়না শ্বশুরমশাই এই সবই কারও কাছে গচ্ছিত রেখে। গেছেন। বেহালার বাক্সে ভরে। তিনি খুব বড় ওস্তাদ ছিলেন। বেহালাটা ওই বাড়িতে পড়ে আছে। বাক্সটা নেই।’
সুবীর আচমকা ‘উঃ’ বলে লাফিয়ে উঠল ‘আলো জ্বাল, আলো জ্বাল।’
‘কী হল রে!’
‘কামড়েছে। মনে হয় কাঁকড়াবিছে!’
নিমেষে সব লণ্ডভণ্ড। বালিশ-চাদর মেঝেতে গড়াগড়ি। সুবীর বাইরে বেরিয়ে গেছে। আকাশে ভোরের আলো ফুটছে। সুবীর বাইরে থেকে ডাকছে, ‘শুভ্র! একবার আয় না।’
অনেকটা দূরে একপাশে টেনে নিয়ে গিয়ে বলল, ‘কিছু কামড়ায়নি। পাছে তুই গচ্ছিত গয়নার কথা বলে ফেলিস! আমি ঘুমোইনি। মটকা মেরে পড়েছিলুম। মেয়েটাকে স্টাডি করছিলুম। সব কিছু বাজিয়ে নিতে হয়। তোকে একটা কঠিন কাজ সুবীর থেমে গেল। রুমকি আসছে। ভীষণ উত্তেজিত। ‘এই দেখো কী বেরিয়েছে।’
এত বড় একটা ধুতরো ফল। ভোরের আলোয় স্পষ্ট।
অবাক কাণ্ড। ধুতরো এল কোথা থেকে!
রুমকি চা বসাতে রান্নাঘরে চলে গেল।
ধুতরো ফলটা আমার হাতে। মা সারা জীবন শিবপূজা করে গেছেন। বিছানায় ধুতরো রেখেছিলেন সুরক্ষার জন্যে। রুমকি চলে যেতেই সুবীর বললে, ‘তোকে লম্পট প্রেমিক হতে হবে।’
‘মানে?’
‘তোকে দেখতে হবে, রুমকির জঘনে ক্ষতচিহ্ন আছে কি না?’
‘সে কী করে সম্ভব!’
‘সম্ভব! রুমকি ভীষণভাবে তোর প্রেমে পড়েছে। ঘরে তুলতে হলে যাচাই করে নিতে হবে। কে সে! সে কোন দলের! হঠাৎ গয়নার কথা উঠল কেন?’
‘কোন দলের মানে?’
‘ওই ভদ্রমহিলার দলের কি না? হঠাৎ এল? কেন এল?’
‘তুই মানুষকে ভীষণ সন্দেহ করিস।’
‘আমাকে ব্যবসা করে খেতে হয় ভাই। আমি এখন যাচ্ছি। রাত্তিরে আসব।’ ফিশফিশের বললে, ‘চুটিয়ে প্রেম কর। জায়গাটা দেখে নে। গল্প না সত্যি।’
.
৫.
চা, বিস্কুট খেয়ে সুবীর বেরিয়ে গেল। একবার বললে, চানটা সেরে নি, তারপর বললে, থাক সময় নেই। খুব তাড়াহুড়ো করে চলে গেল।
রুমকি বললে, ‘ঘরে এসো।’
খাটের ধারে আমাকে ঠেলে বসিয়ে দিল। গায়ে খুব জোর আছে। ছাত্রজীবন থেকেই আমি ব্যায়াম করি। এখনও সপ্তাহে তিন দিন জিমনাসিয়ামে যাই। তবুও মনে হল রুমকির সঙ্গে লড়াই হলে আমি হেরে যাব।
রুমকি একে একে সব জানালা বন্ধ করে, দরজায় ছিটকিনি তুলে দিল।
ব্যাপারটা কী! বেশ ভয় পেয়ে গেলুম। আমাকে খুন করবে নাকি! মনে মনে আত্মরক্ষার জন্যে প্রস্তুত আমি। আমার সামনে দাঁড়িয়ে একে একে সব পোশাক খুলে ফেলে বললে, ‘নাও, দেখে নাও। যাচাই করে নাও। মাথা নীচু করে আছ কেন? যেদিকে তাকাবার তাকাও সে দিকে।’
জীবনের আমি কখনও নগ্ন নারী দেখিনি। ছবিতে না, সিনেমাতেও না। সামনে দাঁড়িয়ে সুঠাম এক দেবী। যবের মতো গায়ের রং। সিল্কের মতো ত্বক।
