রুমকি জিগ্যেস করলে, ‘কী ডাল?’
‘মুসৌরি।’
‘পেঁয়াজ চলবে?
‘লাগাও প্যাঁজ।’
সুবীর পেঁয়াজ ছাড়াচ্ছে আর গাইছে—
জীবনে মরণে সমপরিমাণে
মিলায়ে কেরাঁধে এ জগা-খিচুড়ি!
যারাচাপা ব্রহ্মাণ্ড-ভাণ্ডে
নুনে ঝালে অভাব রাখেনি কিছুরই!
নেপথ্যে হাঁকে কর্তা বাঙ্গাল—
জ্বাল ঠেলে দাও গণ্ডা গণ্ডা ঝাল;
বাকি কোনো দিকে রাখে না খেয়াল–
ঝি-চাকরে করে সকল খিচুড়ি।
সুবীর হঠাৎ নাচতে লাগল—
গুমে গুমে সিজে কাহার জন্য
ভূচর-জলচর-খেচরান,
তলা হতে সরা, সরা হতে তলা
মাথা ঠুকে মরে আছাড়ি বিছুরি!
‘এমন প্রলয় নাচ নাচলে রান্না করা যায়?
সুবীর শান্ত হতে হতে,
‘যে রাঁধুক আর যেই এরে খাক
এ খিচুড়ি নাহি হবে পরিপাক।
দেবতার পেট না হলেও ঢাক
অন্তত ফুলে হবেই কচুরি।’
রান্নাটা খুব জমেছে। সুগন্ধে বাড়ি ভরে গেছে। মা চলে যাওয়ার পর এই প্রথম। রান্না শেষ করে রুমকি বললে, ‘চান করব।’
‘কোনও অসুবিধে নেই। চলে যাও, ওই বাথরুম। সব আছে।’
খাওয়াদাওয়া শেষ হল প্রায় বারোটায়। সুবীরকে খুব খুশি লাগছে। ও সাধারণত খুব ধীর স্থির। ওর মন বোঝা যায় না।
.
৪.
আমাদের সেই সাবেককালের বিরাট খাট। অকারণে কারুকার্য। সেকালে কাঠ সস্তা, বড়লোকদের তহবিলে বাজে খরচ করার মতো অঢেল টাকা। সুবীর শুয়ে পড়েছে। প্রচণ্ড খেয়েছে। আমি আর রুমকি খাটের আর এক পাশে বসেছি।
মা বেঁচে থাকলে এইভাবে একই খাটে তিনজনে বসা যেত কি?
রুমকি সুবীরকে বললে, ‘তুমি শুয়ে শুয়ে শুনবে, তবেই হয়েছে। এক্ষুনি নাক ডাকবে।’
সুবীর বললে, ‘আমার ইনসমনিয়া আছে ভাই। বছরের পর বছর নিদ্রাহীন রাত আমার।’
‘ঘুমোতে পার না কেন? এর পর তো পাগল হয়ে যাবে।’
‘পাগল হতে আর বাকি কি? কত রকমের সমস্যা! জীবন-মরণ সমস্যা। এই প্রতিযোগিতার দুনিয়ায় বেঁচে থাকাটা যেন কুস্তি! আমার কথা থাক, তোমার কথা বলো।’
‘তা হলে শোনো। চিনুদির এই কাকাবাবু আর আমার বাবা, দুজনে হলায়গলায় বন্ধু। পার্টনারশিপে ব্যবসা শুরু হল স্ক্র্যাপ আয়রনের। হাওড়ায় বিরাট গোডাউন। ক্যানিং স্ট্রিটে সাজানো, সুন্দর অফিস। দেখতে দেখতে ব্যবসা জমে উঠল। কত সুখ!
‘এইবার শুরু হল কাকাবাবুর খেলা। বাবাকে মদ আর মেয়েছেলে ধরাল। আমার এত সুন্দর মা জীবন থেকে ভেসে গেল। প্রথমে লুকিয়ে লুকিয়ে তারপর খোলাখুলি। জলের বদলে মদ। মাকে ধরে পেটানো। একজন নিভাঁজ নিপাট ভদ্রলোক—চোখের সামনে একটা কুৎসিত ছোটলোক হয়ে গেল। এইবার হল সিফিলিস। লোকটা কী ভয়ংকর শয়তান, ওই বিশ্রী রোগটা আমার নিরীহ মাকে ধরাবে বলে রোজ রাতে আমাদের চোখের সামনে আঁচড়া-আঁচড়ি, কামড়া-কামড়ি। মা চিৎকার করছে। একদিন দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকতে হল। সে দৃশ্য ভাবা যায় না! মদের ঘোরে বেহেড। মদের বোতলটাকে ভেঙে হাতে নিয়েছে। মায়ের পোশাক ছিন্নভিন্ন। লোকটার মুখ। বীভৎস রাক্ষসের মতো। সম্পূর্ণ উলঙ্গ। জানোয়ারের মতো শব্দ করছে।
‘মারলুম তলপেটে এক লাথি। কোঁক করে উঠল। আচমকা ভাঙা বোতলটা ঢুকিয়ে দিল আমার দুই উরুর মাঝখানে। সে রাতে নির্ঘাৎ আমার মৃত্যু হত। অথবা আমার হাতেই জানোয়ারটার মৃত্যু হত। ঝুঁঝিয়ে রক্ত পড়ছে। এই দৃশ্য দেখে মা আর স্থির থাকতে পারল না। তখন মা আমার মা দুর্গা। জানোয়ারটাকে মারতে মারতে সিঁড়ি দিয়ে ফেলে দিল। গড়াতে গড়াতে দোতলা থেকে একতলায়।
‘সুবীরদা বিরক্ত হচ্ছে! বই বন্ধ করব?
সুবীর উঠে বসল, ‘চা খাব।’
রুমকি উঠে দাঁড়াল, ‘জানো তো, সোজা হয়ে দাঁড়াতে গেলে এখনও শিরায় টান ধরে।’
সুবীর বললে, ‘তোমরা বোসো, আমি চা করে আনছি’, রুমকি বললে, ‘আমি কি করতে আছি। একটাই সমস্যা, ওদিকে একা যেতে ভয় করছে।’
‘চলো, আমরা তিনজনে যাই। শুভ্র! গুমটি ঘরটা একবার দেখে এলে কেমন হয়!’
‘অসম্ভব! আমার যাওয়ার সাহস নেই। চুপ, চুপ একদম চুপ। সেই বেহালা। শুনতে পাচ্ছিস? কে বাজায়!’
রুমকি, ‘ওরে বাবারে’,বলে দু’হাতে জড়িয়ে ধরল।
ঠিক এইভাবেই অনেক দিন আগে কুকুরের তাড়া খেয়ে চিনু আমাকে পথের মাঝে জড়িয়ে ধরেছিল। এ মেয়ে আলাদা মেয়ে, আলাদা শরীর, কিন্তু মনটা সেই এক।
সুবীর বললে, ‘ভয় কীসের, একটি কবিতা শোনো,
আমি বোধ হয় কোন জীবনে,
দূর অতীতের কোন ভুবনে,
ছিলাম কোন গুণীর হাতে বেহালা
অকারণে কান্না-হাসি
মুখে যে মোর উঠছে ভাসি
এ বুঝি সেই পুবজনমের দেয়ালা।’
‘তোমার ভয় করে না সুবীরদা?
‘ভয় করবে কেন, কেউ তো আমাকে মেরে ফেলতে আসছে না। সাধু-সন্তরা বলে গেছেন, রাতের পৃথিবীতে অনেক রকম শব্দ ওঠে, আকাশে অনেক কিছু দেখা যায়। মানুষ ঘুমোয় তাই জানতে পারে না। পাশেই আবার গঙ্গা, মহাশ্মশান। চল না, ছাদটা একটু ঘুরে আসি। খুব ভালো। লাগবে।’
‘সে সাহস নেই ভাই।’
‘কী আশ্চর্য! তোর বাড়ির ছাদ, তুই ভয় পাচ্ছিস যেতে!’
বেহালার শব্দ ক্রমশ দূর থেকে দূরে চলে গেল। কে যেন বাজাতে বাজাতে মহাকাশে মিলিয়ে গেল।
এক রাউন্ড চা হল। বাইরের বাগানের ঝোপঝাড়ের মধ্যে একটা ঝটাপটির আওয়াজ হল। একটা বেড়াল একবার মাত্র ‘ম্যাও’ করে থেমে গেল। একটা ছায়া বাইরের দালান অতিক্রম করে চলে গেল। আমরা তিনজনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। রান্নাঘরে একটা স্টিলের গেলাস কোনও কারণ নেই ভীষণ শব্দ করে তাক থেকে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। একটা পরিচিত সুগন্ধ নাকে এল।
