সুবীর বললে, ‘অল রাইট! তুমি যদি খিচুড়ি খাওয়াও তাহলে থেকে যেতে পারি।’
রুমকি বললে, ‘খিচুড়ি আর পাঁপড় ভাজা।’
সুবীর আমাকে জিগ্যেস করলে, ‘কিরে কাঁচামাল সব আছে তো? পাঁপড় আনতে হবে?
‘আমি যাচ্ছি। ভালো করে দেখ, চাল, ডাল, আলু সব আছে তো? ঘি আছে? খিচুড়ি কিন্তু ঘি চাইবে।’
ঘি আছে।’
রুমকি বললে, ‘খিচুড়ির সঙ্গে ডিমের ওমলেট?’
‘ওঃ! ভেরি ইন্টারেস্টিং। ফাটাফাটি।‘
সুবীর বেরিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এল।
‘কী হল রে?’
‘শোন শুভ্র, তোদের ওই আউটহাউসে কেউ থাকে?’
‘না তো, ওটা তো প্রায় ভেঙে পড়েছে। সাপ-খোপের আচ্ছা।’
‘বিশ্বাস কর, একটা দেশলাই কাঠি জ্বলেই নিবে গেল।’
‘সে কী রে?’
রুমকি আমার গায়ের সঙ্গে সেঁটে গেছে।
সুবীর বললে, ‘সামওয়ান ইজ দেয়ার, আই অ্যাম সিওর। একবার দেখা দরকার।’
রুমকি বললে, ‘আমাকে মারবে।’
‘তোমাকে মারবে কেন?’
‘আমার মন বলছে। আমি একটা বিরাট চক্রর সন্ধান পেয়েছি।’
সুবীর বললে, ‘টর্চ আছে?’
ঝোপ-জঙ্গল মাড়িয়ে, বুনো গাছের ডালপালার খোঁচা সহ্য করে অতীতের সেই কুঠিটায় দুজনে পৌঁছোলুম। আমার মাতামহ যখন জীবিত ছিলেন তখন এই ঘরে একটি দাতব্য হোমিও চিকিৎসালয় করেছিলেন। আউটহাউসের পরেই বাউন্ডারি ওয়াল। তারপরেই বিরাট স্কুলবিল্ডিং। খাড়া দেয়াল ওপর দিকে উঠে গেছে। মাঝখানে ছোট্ট একটা গলি। পাক মেরে পৌঁছে গেছে শ্মশানে। গঙ্গা। প্রাচীন ঘাট। লঞ্চ সার্ভিস, জেটি।
সুবীর ঘরে আলো ফেলল। কেউ নেই। বাতাসে সিগারেটের গন্ধ। মেঝেতে দুটো সিগারেটেরে টুকরো। তিন-চারটে পোড়া দেশলাই কাঠি। টর্চের আলো ঘোরাতে ঘোরাতে দেয়ালের একটা জায়গায় একটা লেখা চোখে পড়ল। কাঠকয়লা দিয়ে কেউ লিখেছে,
নাক গলালেই বিপদ
লেখাটার পাশে একটা ত্রিশূল চিহ্ন। মেঝেতে আরও একটা কী পড়ে আছে। টর্চের আলো ফেলে দেখা গেল, চিবিয়ে চিবিয়ে প্রায় বিধ্বস্ত করে একটা মুরগির ঠ্যাং কেউ ফেলে গেছে।
ঘরের কোণে হঠাৎ আলোয় কী একটা ঝলমল করে উঠল। সুবীর ভালো করে দেখে একটা শব্দ করল ‘হুঁ’।
ওপাশে অনেক কালের ভাঙাচোরা টেবিল পড়েছিল। সুবীর তার তলায় একটা বাজে জিনিস আবিষ্কার করল।
‘তুই খুব বিপদে পড়ে যাবি শুভ্র। এই ঘরে ড্রাগ-অ্যাডিক্টরা আসে। মেয়েরাও আসে। তোর কোনও নজর নেই। এই ঘরে খুন করে কারওকে ফেলে গেলে তোকেই তো জেল খাটতে হবে।’
‘দেয়ালে লেখাটা?’
‘ওটা কোনও নাবালকের কাজ। পাশেই স্কুল। বাউন্ডারিটা তেমন উঁচু নয়। টপকে চলে এসেছিল, রোজই হয়তো আসে। ডিটেকটিভ উপন্যাস পড়ার ফল। হয়তো তাদেরই কেউ এসে ব্রাউন-সুগার নেয়। রাংতাটা তারই সাক্ষী। কাল সকালে আমার ফার্স্ট কাজ হবে, এই ঘরটাকে। ভেঙে মাঠ করে দেওয়া।’
পাঁচিলের পাশের সরু পথ দিয়ে মৃতদেহ নিয়ে যাচ্ছে শ্মশানে। পায়ের দুপদাপ শব্দ। মাঝে মাঝে ভারী গলায়, বলহরি হরি বোল। গা ছম ছম। সুবীর বললে, ‘চল, এর পর দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে যাবে।’
রাত হয়েছে। বাজারে তেমন লোকজন নেই। কোনও কোনও দোকান বন্ধ হওয়ার মুখে। সবচেয়ে বড় কাপড়ের দোকান, বসাক স্টোর্স। দোকানের মালিক সারাদিন পা মুড়ে গদিতে বসে থাকেন। দোকান বন্ধ হওয়ার আগে কাপড় মাপার গজকাঠিটা মেঝেতে দাঁড় করিয়ে দুহাত দিয়ে ধরে ওঠবোস করছেন। পয়সা প্রচুর কিন্তু গৃহসুখ আর দেহসুখের অভাব। বড় মেয়েটি একের পর এক প্রেম করতে করতে শেষ প্রেমের প্রেমিকের সঙ্গে হাওয়া। কোন দেশে গেছে কেউ জানে না।
বাজারের পেছন দিকে ছোট্ট একটি গণিকাপল্লি। রাত্তিরে বেশ জমজমাট হয়। একটা লাল বিরাট মোটর সাইকেল একপাশে খাড়া। মালিক কোনও একটা ঘরে আয়েস করছি। মালিককে আমরা সবাই চিনি। রায়বাহাদুরের নাতি। তোলাবাজ। খুনটুনও করে।
ছোট ছোট খুপরি খুপরি ঘর। করুণ চেহারার একটি মেয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে। সুবীরকে বললে, ‘এসো না আমীর।’
সুবীর কেঁদে ফেলেছে। ‘শুভ্র! মেয়েদের এই পরিণতি সহ্য করতে পারি না।’
মেয়েটার হাতে একশো টাকার একটা নোট গুঁজে দিতে গেল।
মেয়েটা পরিষ্কার বলছে কানে এল, ‘কাজ না করে পয়সা নিতে পারব না। আমাদের নিয়ম নেই।’
সুবীর বললে, ‘তুমি আমার বোন।’
মেয়েটা কাটা কাটা উত্তর, ‘বোন, তা বাড়ি নিয়ে চলোনা।’
খদ্দের এসে গেল। একটা আধবুড়ো। কাঁধে একটা ব্যাগ। মদের গন্ধ। মেয়ের বয়সি মেয়েটার হাত খামচে ধরে ভেতরে চলে গেল। দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
লোকটি আমার চেনা। বাজারে ইলেকট্রিক্যাল গুডসের চালু দোকান। বউ আছে, ছেলেমেয়ে আছে।
সুবীর ফেরার পথে, সারাটা পথ একটা কবিতা আবৃত্তি করতে করতে এল—
ধরণী তোমার প্রমোদপ্রবাস,
বাঁধনিকো হেথা ঘর,
বিশ্বসুদ্ধ বুকে টেনে, বল
সবাই আমার পর।
পুণ্য তোমারে করে না লুব্ধ,
পাপে নাকি কাঁপে বুক!
নহ মা ঘৃণ্য কৃপার পাত্র,
আজ যে বুঝেছি খাঁটি—
মায়ের পুজোয় কেন লাগে তোর
চরণে দলিত মাটি!
বাড়িতে ঢোকার মুখে সুবীর আমার একটা হাত ধরে বললে, ‘আয় আজ রাতে আমরা শপথ করি—মেয়েদের আমরা খুব যত্ন করব।’
রুমকি ভয়ে সিঁটিয়ে আছে।
‘কীসের ভয়?’
‘এত বড় একটা বাড়িতে আমাকে একলা ফেলে চলে গেলে। গেলে তো গেলেই। কত রকমের শব্দ!’
‘ভয় পেলেই ভয় মানুষকে পেয়ে বসবে। এখন চলো রান্নাঘরে। শুরু হোক আমাদের সমবেত রন্ধনযজ্ঞ।’
