‘আগুনটা লাগল কী করে?’
সুবীর বললে, ‘গ্যাস খুলে রেখেছিল।’
রুমকি বললে, ‘অত বোকা নয়। গ্যাসের গন্ধ আছে।’
‘তাহলে!’
‘ওই যে বলেছে, অঙ্কটা যদি মেলাতে পারো! ভালো করে শোনো, চোখ বুজিয়ে দেখো। দেশলাই কাঠি জ্বলল, ডান হাত এগোচ্ছে। বাঁ-হাতে ওভেনের নবটা ঘোরানো হল, হঠাৎ আচমকা একগাদা বাসন পড়ল। চমকে উঠল। জ্বলন্ত কাঠিটা পড়ল নাইটির ওপরে। গ্যাস খোলা। হুহু করে বেরোচ্ছে। সেই গ্যাস আগুনকে দাউদাউ করে বাড়িয়ে দিল। প্রথম চান্সেই হিসেব মিলে গেল।’
আমি আর সুবীর হাঁ করে বসে রইলুম কিছুক্ষণ।
সুবীর বললে, ‘পারফেক্ট মার্ডার। কোনও ভাবেই প্রমাণ করা যাবে না।’
‘একটা কথাও তো বলতে পারল না। বললে কিছু করা যেত হয়তো।’
‘পোস্টমর্টেম?
‘কী পাওয়া যাবে? কিস্যু পাওয়া যাবে না। ভিসেরায় কিছু মিলবে না। যদি এফআইআর করতে হয় কে করবে? এ তো শ্বশুরবাড়িতে বউ পোড়ানো নয়। আমরা তো বাইরের লোক। ঘটনার জায়গায় ছিলুম না। প্রত্যক্ষদর্শী নই। সাক্ষীও হতে পারব না।’
রুমকি বললে, ‘কোনও খুনই কি কেউ দেখিয়ে করে!’
‘তা করে না, তবে কিছু না কিছু প্রমাণ ফেলে যায়। এখানে তো কিছুই নেই।’
রুমকি বললে, ‘কেন এই কাগজটা।’
‘এটা পেলে কোথায়?
‘দিদির মায়ের মাথার বালিশের তলায়। বিছানা করতে গিয়ে পেয়েছি।’
সুবীর বললে, ‘আমার প্রথম প্রশ্ন, এটা যদি নির্দেশ হয়, পড়ে ছিঁড়ে ফেললেই হত। যত্ন করে বালিশের তলায় রাখা কেন? প্রমাণ তো লোপাট করারই কথা।’
‘অসাবধানতা। ভুলে গেছে। আমার ধারণা, যেই আনুক এটা এসেছিল রাত্তিরবেলা। পড়ার সময় দিদি হঠাৎ ঘরে ঢুকে পড়েছিল। তাড়াতাড়ি বালিশের তলায় ঢোকাতে গিয়ে ঢুকিয়ে ফেলেছিল ওয়াড়ের ভেতর। পরে আর খুঁজে পায়নি।’
‘ঠিক আছে, এটা ধরে রাখা যাক, পরের প্রশ্ন, যাদের দু-বেলা দেখা হচ্ছে, এত ঘনিষ্ঠ, তাদের একজন আর একজনকে চিরকুট দেবে কেন, কায়দার কথা লিখে! কানে কানে ফিশফিশ করে বললেই তো হয়।’
রুমকি একটু চিন্তিত হল।
‘এই জায়গায় আমরা একটা কর্মাশিয়াল ব্রেক নি।’
সুবীর বললে। ‘কচুরিদের যথাস্থানে পাঠানো দরকার, বিলম্বে আরও শীতল হয়ে যাবে। তোর জায়গা-জমি বের কর।’
উঠে রান্নাঘরে গেলুম। রুমকি আমার পাশে এসে দাঁড়াল, ‘তুমি যাও। আমি ব্যবস্থা করছি।’
আমাদের সামনে কচুরি আর তরকারির প্লেট ধরে দিল।
‘তোমার?’
‘আনছি? হাত তো দুটো।’
সুবীর বললে, ‘তাও তো বটে।’
রুমকি এসে বসল।
‘সমান ভাগ করেছ তো!’
‘আমার একটা কম।’
‘কেন? বারোটা এনেছি তো!’
‘তুমি বারোটার দাম দিয়েছ, কচুরি দিয়েছে এগারোটা।’
‘আমাদের থেকে হাফ হাফ নাও।’
‘খাও তো। আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে। সকাল থেকে উপোস, ও বাড়িতে শোকের নকশা চলছে। এর পর চা খাবে তো?’
‘যদি করো।’
‘যন্ত্রপাতি দেখিয়ে দাও।’
আমার মা খুব গোছানো ছিলেন। সংসারটাকে করে রেখেছিলেন ছবির মতো। বড় ঘরের মেয়ে ছিলেন তো।
‘এই নাও কেটলি!’
‘কেটলি তো দেখতেই পাচ্ছি, কত বছর ধোওয়া হয়নি!’
‘রোজ চা করি, সপ্তাহে একদিন আচ্ছাসে ধোলাই করি।’
‘চা কোথায়, চিনি কোথায়, দুধ কোথায়?’
‘সব আছে।’
সুবীর চায়ে চুমুক দিয়ে বললে, ‘কাকাবাবু নয়, তৃতীয় আর একজন কেউ আছে। চিরকুটটার সঙ্গে এই মৃত্যুর যদি যোগ থাকে, তাহলে কাকাবাবু এর মধ্যে নেই।’
রুমকি বললে, ‘হতে পারে। কাকাবাবু আজ তিন মাস কলকাতার বাইরে।’
‘তাহলে, এই তৃতীয় লোকটা কে? তার সঙ্গে চিনুর মায়ের কী সম্পর্ক? তুমি কী আর কোনও লোককে বাড়িতে আসতে দেখেছ?’
‘না।’
‘তা হলে?
আমি বললুম, ‘সুবীর, এই সমস্যার সমাধান আমাদের দিয়ে হবে না। আমাদের সঙ্গে পড়ত প্রশান্ত, মনে আছে তোর?’
‘বারুইপুরে আমবাগান, আমরা পিকনিক করেছিলুম।’
‘প্রশান্ত পুলিশের বড়ো অফিসার। চল, কাল আমরা তার কাছে যাই।’
রুমকি বললে, ‘আমিও যাব। রান্নাঘর, যেখানে আগুন লেগেছিল, দিদি মেঝেতে পড়ে গড়াগড়ি দিয়েছিল, সেই মেঝেতে পোড়া আঙুল দিয়ে কিছু একটা লেখার চেষ্টা করেছিল। চারটে অক্ষর। প্রথমটা মুছে গিয়েছিল। অক্ষর তিনটে যা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল, বিনাশ।’
‘বিনাশ মানে, শেষ করে দেওয়া, হত্যা।’
‘আগে আর একটা অক্ষর ছিল। ছিলই ছিল।’
সুবীর বললে, ‘আজকের মতো এই পর্যন্ত থাক। কাল তো আমরা প্রোন্তর কাছে যাবই। একটা ফোন কর না।’
‘নম্বর জানি না।’
‘আমি তা হলে আজকের মতো ছুটি নিচ্ছি।’
রুমকি বললে, ‘আমি কোথায় যাব?’
‘কেন? ও বাড়িতে!’
‘আজ সকালে আমাকে ওরা ছুটি করে দিয়েছে।’
‘সে কী!’
‘গম্ভীর গলায় বললে, দরকার নেই।’
‘তোমার মালপত্র?’
‘ওই যে, দুটো স্যুটকেস।’
সুবীর বললে, ‘কী ব্যাপার বল তো? এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফাঁকা!’
‘মনে হয়, রুমকিকে সন্দেহ করছে।’
রুমকি বললে, ‘কিছু কাগজপত্র কাল ছাতের ঘরে পোড়াচ্ছিল। আমি জিগ্যেস করলুম, কী পোড়াচ্ছ? তা আমার দিকে কটমট করে তাকাল।’
‘কী পোড়াচ্ছিল মনে হল? ‘অনেক খাতা-মাতা, চিঠিপত্তর।’
সুবীর বললে, ‘এই রে, আগুনের নেশা ধরেছে। আগুনের একটা বিশ্রী নেশা আছে। তাহলে রুমকির কী হবে?’
রুমকি করুণ গলায় বললে, ‘সুবীরদা আজ তুমি থেকে যাও না। আমি কে, সেটা তোমার জানা হয়নি। তোমরা দুজনেই জানো না। কাল সকালে আমি কোথায় না কোথায় চলে যাব, আর তো দেখা নাও হতে পারে।
